শিরোনাম

প্রকাশিত : ২৫ জানুয়ারী, ২০২২, ১২:৫০ দুপুর
আপডেট : ২৫ জানুয়ারী, ২০২২, ০১:৩১ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

দীপক চৌধুরী : কাফনের কাপড় পরে মিছিল কারা করে? কেন করে? লক্ষণটা কী শুভ নাকি অশুভ?

দীপক চৌধুরী: ভিসি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে কাফন মিছিল করেছেন। শনিবার দুপুর ৩টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলচত্বর থেকে দুই শতাধিক শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে মিছিলটি শুরু হয়, পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে। অবশ্য এর আগে অনশন শুরু হয়েছে। উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে শিক্ষার্থীদের অনশন। অবস্থা ভয়ংকর পর্যায়ে। এখানে আন্দোলন চলছে প্রায় ১২ দিন ধরে।

উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগসহ বিভিন্ন দাবিতে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর বাইরে তৃতীয় একটি পক্ষ ‘ফায়দা হাসিলের অপচেষ্টায়’ লিপ্ত বলে মনে করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে অবিলম্বে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে শিক্ষার সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা। সোমবার বিকেলে গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে এ আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক মো. রহমত উল্লাহ ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মো. নিজামুল হক ভূঁইয়া।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তারা বলেছেন, চলমান পরিস্থিতিতে গত রোববার আন্দোলনকারীরা হঠাৎ উপাচার্যের বাসার পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছেন, যা অমানবিক এবং শিক্ষাঙ্গনের আন্দোলনে একটি অনাকাক্সিক্ষত মাত্রা যুক্ত করেছে। শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে যেকোনো সমস্যা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করাই বাঞ্ছনীয়।

ঢাবি শিক্ষক সমিতি বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘শিক্ষার্থীদের মূল দাবি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী হলের প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগ পূরণ হওয়া সত্ত্বেও আন্দোলনটি উপাচার্যের পদত্যাগের আন্দোলনে রূপ নেয়। আন্দোলনের এই রূপান্তরের বিষয়টি অত্যন্ত অনভিপ্রেত এবং উদ্বেগের, যা খতিয়ে দেখার দাবি রাখে।’

সোমবার রাতে একাত্তর টিভির জার্নালে দেখলাম, উপস্থাপিকার এক প্রশ্নে শাবিপ্রবির আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মুখপাত্র সাদিয়া আরেফিন যা বলেছেন এর অর্থ দাঁড়ায়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকও নেই যে, এই সংকট নিয়ে তারা আলোচনায় বসতে পারেন।
বিষয়টি সাংঘাতিক। অবস্থা কতটা ভয়াবহ! শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক এরকম স্তরে চলে গেছে?

আমরা জানি, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেগম সিরাজুন্নেছা চৌধুরী মহিলা হলের একজন প্রাধ্যক্ষকে অপসারণের দাবীতে ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে প্রশাসনের অনভিপ্রেত ঘটনার প্রেক্ষাপটে ছাত্র-ছাত্রী, পুলিশ ও শিক্ষক যারা আহত হয়েছেন তা অনাকাক্সিক্ষত। এটা দুঃখজনক। ইতোমধ্যে বেগম সিরাজুন্নেছা চৌধুরী হলে একজন নতুন প্রাধ্যক্ষ নিয়োগ দেওয়া হলেও উপাচার্যসহ তার পরিবারের সদস্যদের অবরুদ্ধ করে রাখার মাধ্যমে বর্তমানে যে জটিল পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে তা অনেককেই ভাবিয়ে তুলছে। উপাচার্যের বাসভবনের বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন, পানির লাইন বন্ধ করার মানে কী? বাইরে থেকে খাবার সরবরাহ বন্ধ। মানে কী? এতো এক্সিট্রিম পর্যায়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি কেন হয়েছে? আমাদের সবাইকে অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে যে, যেকোনো সমস্যা, তা যত বড়ই হোক না কেন, যত জটিলই হোক না কেন, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে অবশ্যই সমাধান করা সম্ভব। একদফা মুখে বললে আন্দোলন ‘চাঙ্গা’ হতে পারে, এটা হয়তো কৌশলও হতে পারে। আমাকে ভীষণ কৌতূহলী করে তুলেছে আন্দোলনের ধরন। কাফনের কাপড় পরে মিছিল, ভিসির বাসভবনের বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন, পানির লাইন বিচ্ছিন্ন করা কী কোনোভাবেই সময়োপযোগী? ভিসির বাসায় খাবার সরবরাহে বাধা দিয়েছে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। এটা কী ছাত্র আন্দোলন নাকি রাজনৈতিক আন্দোলন! ধরে নিলাম কারো দোষ নেই কেবলই উপাচার্যের দোষ। উপাচার্যের বাসায় থাকা অন্যদের অপরাধ কোথায়? ভিসির পদত্যাগ চেয়ে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করা, পানির লাইন বিচ্ছিন্ন করার কারণে অন্যরা বাসায় অবস্থানের ফলে বিনাদোষে অপরাধী হলো! এটাকে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দিপুমনি বলেছেন ‘নাশকতা’।
এই মুহূর্তে অনেকগুলো বিষয় আমাদের খতিয়ে দেখা দরকার হয়ে পড়েছে। এভাবে ভিসির পদত্যাগের দাবিতে ক্রমশ যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সৃষ্টি হচ্ছে তা সমগ্র পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে অস্থিতিশীল করে তোলার মাধ্যমে দেশের উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে ফেলার একটি চক্রান্তের অংশ কিনা তা জরুরি ভিত্তিতে দেখা দরকার। শিক্ষকদের কাছে অর্থাৎ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যকার সম্পর্কটি পারস্পরিক সম্মানবোধের, শ্রদ্ধার ও স্নেহের । দিন যত যাচ্ছে ততই সেটি যেন ক্ষুন্ন হচ্ছে। অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারি এবং এটা সত্য যে, এখন পর্যন্ত পুলিশের লাঠিপেটায় কিছুই সমাধান হয় না, আলোচনা ছাড়া সমাধান হয়নি, আলোচনার মাধ্যমেই সব সমাধান হয়েছে। হিসেব করে দেখা যায়, সিলেটে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম ৩১ বছর ধরে চলছে। কিন্তু এমন জটিল পরিস্থিতি কখনো হয়নি। এই আন্দোলনটা কিন্তু ছাত্রদের এবং তা উপাচার্যের বিরুদ্ধে। এখানে কেন পুলিশ এলো তা বের করা দরকার। শিক্ষার্থীদের ওপর এভাবে পুলিশের লাঠিপেটা করা এবং পরবর্তী পর্যায়ে ছাত্রদেরও ইটপাটকেল মারা, পুলিশও আহত হয়েছে, ছাত্ররাও আহত হয়েছে, শিক্ষকেরাও আহত হয়েছেন। ভিসির বাসভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, পানির লাইন বন্ধ করার মতো ঘটনা নানানরকম প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। নানারকম সন্দেহ ও উদ্বেগ।

সোমবার শাবিপ্রবির উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. ফারজানা ইসলামকে ফোনে জাবির নারী শিক্ষার্থীদের বিষয়ে যে মন্তব্য করেছিলেন এর জন্য দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা চেয়েছেন। কলাম লিখতে বসে জাবির উপাচার্যের প্রসঙ্গটি মনে পড়লো। সরকার অনেকটা চ্যালেঞ্জ নিয়েই দেশে প্রথম নারী উপাচার্য দিলেন সেখানে।

এই নারী উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের বিরুদ্ধেও পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করা হয়েছিল। দুবছর আগের কথা। আন্দোলন কিংবা আল্টিমেটামে পদত্যাগ করবেন না বলে গণমাধ্যমকে ড. ফারজানা বলেছিলেন এবং মন্তব্য করেছিলেন, ‘আমি কোনো আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করব না। আমাকে যারা এই পদে বসিয়েছেন, তারা চাইলে পদ ছেড়ে দেব। তাছাড়া এই বিশ্ববিদ্যালয় তো শুধু আন্দোলনকারীদের নয় আরও অনেকে তো আছে।’ ওই বিশ^বিদ্যালয়ে কিন্তু দু-আড়াই দশকে আটজন উপাচার্য আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করেছেন। আওয়ামী লীগ সরকার বিশ^বিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবিরকে নিয়োগ দেয়। তার আমলে শিক্ষক নিয়োগ, ভর্তি এবং অবকাঠামো নির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। দুর্নীতির অভিযোগে তিনি সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছিলেন। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ২০১২ সালে তিনি ক্যাম্পাস ত্যাগ করতে বাধ্য হন। নিজ বিশ^বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষককে উপাচার্য না করে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেনকে এই পদে নিয়োগ দেয় সরকার। তিনিও তার মেয়াদ পূরণ করতে পারেননি। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর আন্দোলনের মুখে উপাচার্য পদ থেকে সরে দাঁড়ান অধ্যাপক আনোয়ার। এরপর জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের ভিসির দায়িত্বে আসা ড. ফারজানা ইসলামের বিরুদ্ধেও পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন হয়েছিল।
আমাদের সবারই বোঝা দরকার, পদত্যাগই একমাত্র সমাধানের পথ নয়। শাবিপ্রবির আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন পদত্যাগ করবেন কি করবেন না এটা তাঁর বিষয়। কিন্তু একটি প্রশ্ন তো থেকেই যায়, আসলে সমাধান কার হাতে! ওই সমস্যা নিয়ে সম্প্রতি শিক্ষক সমিতির প্রতিনিধিরা ঢাকায় শিক্ষামন্ত্রী ডা. দিপুমনির বাসায় এসে বৈঠক করলেন কিন্তু আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীর প্রতিনিধিরা ঢাকায় এসে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করতে পারলেন না কেন? কোথায় বাধা ছিল? কেন শিক্ষামন্ত্রীকে সিলেট যেতে হবে? যাক, এখন আর সে কথায় না যাই। এখন সমাধানের একমাত্র পথ আলোচনা। এই অচলাবস্থার নিরসন হোক। আমরা শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারি না। এটা আমাদের সবারই অনুধাবন জরুরি। একই সঙ্গে এটাও বলি যে, আলোচনার মাধ্যমেই সব সমাধান হয়ে থাকে।

লেখক : উপসম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি, সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়