প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মানবর্দ্ধন পাল: শব্দবিন্দু আনন্দসিন্ধু

মানবর্দ্ধন পাল: বর্তমান বিশ্বের সকল দেশের সব মানুষের মুখে উচ্চারিত শব্দটি হচ্ছে টিকা বা ভ্যাকসিন। যে দেশের বা যে ভাষার মানুষই আমরা হই না কেন, সেই শব্দটিই আমরা স্বভাষায় উচ্চারণ করছি। ‘কোভিড নাইনটিন’ বা ‘করোনাভাইরাস’ এবং ‘মহামারি’ শব্দ দুটিও সেরকম- ইংরেজিতে যাকে বলে ‘পেন্ডামিক’। চীনের উহান প্রদেশের নাম এক ভূগোলবিদ ছাড়া আমাদের মতো সাধারণ মানুষ কে জানতো? বিগত প্রায় দুবছরে এই শব্দগুলো প্রায় প্রতিদিন আমরা একাধিকবার উচ্চারণ করছি। বৈশ্বিক মহামারি অনিবার্যভাবে এই শব্দগুলো আমাদের মুখে তুলে দিয়েছে। যা শুনিনি জীবনেও, যে শব্দ মুখে আনার প্রয়োজন পড়েনি বছরে একবারও- বন্দী ছিলো অভিধানের পাতার শৃঙ্খলে- তা উঠে এসেছে আবাল, বৃদ্ধ, বনিতার প্রতিদিনের বাক্যবিন্যাসে।

একুশ শতকের এই অতিমারির করালকালে মৃত্যুমথিত হয়েছে মানবজাতি। দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছে মৃতদেহের মিছিল। পঞ্চাশ লক্ষাধিক মানুষের প্রাণ বিগত দুই বছরে কেড়ে নিয়েছে কোভিড উনিশ নামক অণুজীব। বাংলাদেশেও সরকারি হিসেবে প্রায় ৩০ হাজারের কাছাকাছি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে করোনা। এর কোনো ওষুধ ছিলো না, সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা ছিলো না- ছিলো না কোনো প্রতিকার বা প্রতিরোধ। কতো পূজার্চনা, ঝাড়-ফুঁক, তাবিজ-কবচ, হোমিওপ্যাথি, ইউনানি, আয়ুর্বেদী চিকিৎসার ব্যর্থ চেষ্টা। চাতকের মতো ঊর্ধ্বমুখে উদ্বাহু হয়ে থাকা, সংস্কার-কুসংস্কারে উটপাখির মতো মিথ্যার বালুতে মুখ গুঁজে রাখা- কিছুতেই পরিত্রাণ মিলেনি। কিন্তু মানবজাতি এই অদৃশ্য প্রাণঘাতী শত্রুর হাত থেকে বাঁচতে চায়। তাই প্রতিকার চাই, প্রতিরোধ চাই, ওষুধ চাই। পৃথিবী থেকে এখনো নির্মূল হয়নি কোভিড উনিশ। প্রতিনিয়ত রূপ বদলের রোগ এটি। তাই করোনামুক্ত পৃথিবীর প্রত্যাশায় টিকা চাই, টিকা চাই। মানবজাতিব এই প্রত্যাশা থেকে প্রাপ্তি অদূরেই ছিলো। অবশেষে আবার প্রমাণিত হলো, মানুষ পরাজিত হয় না। এক বছরের মধ্যেই চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করলেন প্রতিষেধক টিকা। যদিও আলফা, বিটা, গামা, ডেল্টা- এরকম নানান ধরনের নামের পর এখন আবার করোনার নতুন ধরন ‘ওমিক্রন’- আতঙ্ক বিশ্বজুড়ে।

যেকোনো মহামারিতেই সর্বোত্তম প্রতিষেধক টিকা। কিন্তু এই ‘টিকা’ শব্দটিও একার্থক নয়- এরও আছে বিচিত্র অর্থের সমাহার। তাই টিকা নিয়ে এ পর্বে যৎসামান্য টিকাভাষ্য। রোগ-বালাইয়ের প্রতিষেধক অর্থে টিকা তো আছেই- এর অন্যান্য অর্থ: বটিকা, গুটিকা, স্থির হওয়া, স্থায়ী হওয়া, চুক্তি, রাজচিহ্ন, ফোঁটা ইত্যাদি। নমস্য লেখকদের রচনা থেকে ঋণ করে কয়েকটি উদাহরণ দিই। তবে তার আগে বলে নেওয়া ভালো, শব্দটি সংস্কৃতপ্রসূত, তৎসম শব্দ। উপরোল্লিখিত সব অর্থেই ‘টিকা’ এবং ‘টীকা’ দুটি বানানই অভিধানে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে ইদানীং কেবল ‘ব্যাখ্যা-বিবরণ’ অর্থে ‘টীকা’ লেখা হচ্ছে দীর্ঘ-ঈ-কার (ী) দিয়ে। আর অন্যান্য অর্থে ‘টিকা’ সুপ্রচলিত।

‘সিংহ তুমি মহাতেজা পশু মধ্যে হও রাজা/টিকা দিলা ভবানী ললাটে।’ (রাজচিহ্ন অর্থে, কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তী)। ‘ভালে টীকা দিয়া মাতা কৈলে মৃগরাজ।’ (তিলক অর্থে, ঐ)। ‘শীতলা মায়েরে করে হেলা, বসন্তের টিকা নেয়।’ (প্রতিষেধক অর্থে, রবীন্দ্রনাথ)। সংস্কৃত ‘বটিকা’ থেকে ওষ্ঠ্যবর্ণ ‘ব’ লুপ্ত হয়ে ‘টিকা’। ‘টিকায় ফুঁ দাও।’ (মীর মশাররফ হোসেন)। সন্দেশের মতো গোলাকার কালো বস্তু। অঙ্গারের গুঁড়ার সঙ্গে গোবর মিশিয়ে প্রস্তুত করা হয়। হুঁকো বা কল্কিতে তামাক জ্বালাবার সময় ব্যবহার করা হয়। তাছাড়া টিকা সান্ধ্যকালীন ধূপধুনো জ্বালাবার সময় ব্যবহার করা হয়। এটি তামাক সেবনের প্রাচীন লৌকিক সংস্কৃতির প্রায়লুপ্ত উপাদান। মানিকের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসে মাছ ধরার সময় প্রবল বাতাসের মধ্যে কুবেরের টিকা দিয়ে হুঁকো জ্বালানোর চমৎকার বর্ণনা আছে। ‘মশার জ্বালায় এখন টিকা দায়।’ (স্থায়ী থাকা রাখা তিষ্ঠানো অর্থে, বর্তমান লেখক)। ‘তিলেক টিকিয়া মোর সনে কহ কথা।’ (স্থির হয়ে অর্থে, গরীবুল্লাহ)। ‘নিরন্তর টিকে থাকার থেকে ওকে দিলুম মুক্তি।’ (অস্তিত্ব বজায় রাখা অর্থে, রবীন্দ্রনাথ)। স্থায়িত্বকালের ব্যাপ্তি বোঝাতে ‘টিকসই’ বা ‘টেকসই’ শব্দের সৃষ্টি এখান থেকেই। প্রাচীনকালে এবং বাংলা গদ্যের প্রাথমিক যুগে ‘টিকা’ ও ‘টীকা’ সমার্থক বিকল্প শব্দ হিসেবে ব্যবহার হলেও একালে দীর্ঘ-ঈ-কারযুক্ত ‘টীকা’ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নির্ণায়ক সহায়ক বইপুস্তকাদি বোঝায়। ‘অ’ প্রত্যয়যোগে সংস্কৃত ‘টীক্’ ধাতুর অর্থ- গমন করা। এর সঙ্গে ‘আ’ প্রত্যয়যোগে ‘টীকা’ স্ত্রীলিঙ্গার্থক শব্দ। এর অর্থ- যা দিয়ে কোনো বিষয়ের ভেতরে সহজে প্রবেশ করা যায় এবং তা বোধগম্য হয়। এজন্যই গবেষণা গ্রন্থের মধ্যে প্রচুর টীকা-ভাষ্য থাকে। ‘সাত মাসে সাত টীকা পড়াল্য গোসাঞি।’ রূপরাম চক্রবর্তীর এই উক্তি থেকে শব্দটির অর্থ সুস্পষ্ট হয়।

যিনি টীকা রচনা বা ব্যাখ্যা করেন তাকে বলা হয় টীকাকার। কিন্তু টীকাদার টিকাদাতা বা টীকাব্যাখ্যাতা নন। প্রাচীনকালে গ্রামের প্রধান ব্যক্তির উপাধি ছিলো ‘টীকাদার’। ‘টীকাটিপ্পনী’ শব্দের অর্থ কিন্তু আবার ভিন্নতর। এর অর্থ নেতিবাচক- বিরূপ মন্তব্য বা বিদ্রƒপাত্মক কথা। যেমন- ‘তোমার টীকাটিপ্পনী রাখো তো ঘোষাল।’ (প্রমথ চৌধুরী)। ‘টিপ্পনী’ শব্দের অর্থ- ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ। পরপদের অর্থপ্রাধান্যে শব্দটি নেতিবাচক রূপ লাভ করেছে। টিপ্পনীতে কথার ঝাঁঝ ও ঝাল থাকে- থাকে হাস্যরস এবং আদিরসও। তাতে থাকে শ্লেষ ও খোঁচা। তেমন একটি চুটকি দিয়ে এ পর্ব শেষ করি: দুই বন্ধু ব্যাকরণ কথা বলছে। একজন বাংলা ব্যাকরণে স্বঘোষিত পণ্ডিত। নিজেকে পাণিনির দাদা মনে করেন। অন্যজন আইনজীবী। আইনজীবী ব্যাকরণবিদকে প্রশ্ন করলেন- আচ্ছা, বলুন তো- আইন কোন লিঙ্গ? এটা আবার কোনো প্রশ্ন হলো নাকি? কেন নয়? জানো না সেটা বলো। আইন হলো স্ত্রীলিঙ্গ। কীভাবে? জানো না, আইনের ফাঁক আছে। লেখক : প্রাবন্ধিক ও গ্রন্থকার

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত