প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আবারো রেকর্ড দামে এলএনজি ক্রয় বাংলাদেশের

বণিক বার্তা: আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম এখন রেকর্ড সর্বোচ্চ। মূল্যের ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতির কারণে নিয়ন্ত্রিতভাবে পণ্যটি আমদানি করছে সরকার। সর্বশেষ গত মাসে স্পট মার্কেট থেকে তিন কার্গো এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। একটি কার্গো এরই মধ্যে দেশে এসে পৌঁছেছে। এক্ষেত্রে প্রতি এমএমবিটিইউ (মিলিয়ন ব্রিটিশ থারমাল ইউনিট) এলএনজির দাম পড়েছে প্রায় ৩২ ডলার করে। এর আগ পর্যন্ত এত দাম দিয়ে এলএনজি ক্রয়ের রেকর্ড নেই বাংলাদেশের। বাকি দুটি কার্গো চলতি মাসেই দেশে এসে পৌঁছার কথা রয়েছে। এ দুই কার্গোয় এলএনজির দাম পড়েছে আরো বেশি।

বর্তমানে যে দুটি কার্গো আসছে, তার একটি সরবরাহ করছে সিঙ্গাপুরভিত্তিক ভিটল এশিয়া। অন্যটি গানভর। ভিটল থেকে আমদানীকৃত কার্গোয় প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম পড়েছে ৩৫ ডলার ৮৯ সেন্ট (সর্বশেষ বিনিময় হার অনুযায়ী বাংলাদেশী মুদ্রায় ৩ হাজার ৬৯ টাকা) করে। অন্যদিকে গানভরের সরবরাহকৃত কার্গোয় প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ধরা হয়েছে ৩৬ ডলার ৯৫ সেন্ট (৩ হাজার ১৬০ টাকার সমপরিমাণ) করে। সব মিলিয়ে এ তিন কার্গো এলএনজি কিনতে পেট্রোবাংলার ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা।

বর্তমানে এলএনজির আন্তর্জাতিক বাজার অস্বাভাবিক মাত্রায় অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার আকস্মিকভাবে পণ্যটির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ৫৬ ডলার অতিক্রম করে। যদিও তা পরে ৩৫ ডলারের কিছু বেশিতে নেমে আসে। বিকল্প অন্য সব জ্বালানি পণ্যের দামেও এখন এলএনজির এ বাজার অস্থিতিশীলতার ছাপ। আন্তর্জাতিক বাজারের এ টালমাটাল পরিস্থিতিতে শঙ্কিত হয়ে উঠছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, জ্বালানি পণ্যের চাহিদা পূরণের জন্য বাংলাদেশ পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। এসব পণ্যের ক্রমাগত দরবৃদ্ধি দেশের সার্বিক অর্থনীতিতেই বড় ধরনের আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে দেশের ঊর্ধ্বগতি কভিড-পরবর্তী উত্তরণ পর্বকে ক্রমেই হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে জ্বালানি পণ্যের বর্তমান বাজার পরিস্থিতি।

এলএনজির অব্যাহত মূল্যবৃদ্ধির কারণে এরই মধ্যে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমিয়ে জ্বালানি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে। এর পরও বিদ্যুৎ খাতে প্রয়োজনীয় গ্যাসের সরবরাহ সংকুলান করা যাচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে সিএনজি স্টেশনে গ্যাস সরবরাহের সময়সীমা কমিয়ে দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে চাহিদা ও ব্যবহার বাড়ায় বিপিসিকে এখন বার্ষিক আমদানি লক্ষ্যমাত্রার বাইরে গিয়েই অতিরিক্ত জ্বালানি তেল (ফার্নেস অয়েল) কিনতে হচ্ছে।

তবে তাতেও স্বস্তি নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামও এখন লাগামহীনভাবে বাড়ছে। সর্বশেষ গত শুক্রবার সব বাজার আদর্শেই পণ্যটির মূল্য দাঁড়িয়েছে ৮০ ডলারের কাছাকাছি বা এর চেয়েও বেশিতে। সার্বিকভাবে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্যস্তর এখন সাত বছরের মধ্যে সর্বোচ্চে। তবে দ্রুতই এ ঊর্ধ্বগতি থামবে না বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। বাজার পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, কয়েক মাসের মধ্যেই জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বিশ্ববাজারে জ্বালানি পণ্যের এ অস্থিতিশীলতা এখন বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিগুলোকেও বিপাকে ফেলে দিয়েছে। ইউরোপ, চীন এমনকি প্রতিবেশী ভারতেও অর্থনীতিতে বড় ধরনের আতঙ্ক সঞ্চার করেছে জ্বালানি পণ্যের বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি। এসব দেশের প্রতিটিই এখন এ সংকট মোকাবেলা করতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশও এ ধরনের পরিস্থিতিতে পড়বে না, এমন আশঙ্কাকে উড়িয়ে দিতে পারছেন না জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।

তাদের ভাষ্যমতে, জ্বালানিতে অতিমাত্রায় আমদানিনির্ভরতা সংকট প্রকট করে তুলেছে। দেশীয় গ্যাস উৎসের বাইরে সব ধরনের জ্বালানি আমদানি করা হচ্ছে। আমদানীকৃত জ্বালানিতে এতদিন ভর্তুকি দিয়ে সেটির মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখা গেলেও এখন আর সে পরিস্থিতি নেই।

যদিও সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের মূল্য পরিস্থিতিকে সরকার পর্যবেক্ষণ করছে। একই সঙ্গে মিশ্র জ্বালানি ব্যবহারে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। অর্থাৎ যখন যে জ্বালানির দাম কম থাকবে, সেটি দিয়েই দেশীয় জ্বালানি চাহিদা পূরণ করা হবে।

যদিও বাজারের স্বাভাবিক নিয়ম বিবেচনায় নিয়ে এ ধরনের পরিকল্পনাকেও যথার্থ মনে করছেন না জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্যমতে, জ্বালানির মূল্য বিবেচনায় যেকোনো একটির ব্যবহার বাড়ানো হলে সেটির দামও অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। ঠিক একই কারণে এখন আর বিকল্প পথও খোলা নেই। সব ধরনের জ্বালানির দামই বর্তমানে ঊর্ধ্বমুখী। সে হিসেবে মিশ্র জ্বালানি পরিকল্পনা দেশের অর্থনীতিকে বড় ধরনের চাপ থেকে সুরক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রে কার্যকর নাও হতে পারে।

এ মুহূর্তে স্থানীয় পর্যায়ে খনি থেকে জ্বালানি উত্তোলন বৃদ্ধির ওপরই জোর দেয়া হচ্ছে বেশি। যদিও দেশে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের কার্যকর কোনো অনুসন্ধান চলছে না দুই দশক ধরে। ১৯৯৬ সালের পর থেকে গভীর সমুদ্রে সম্ভাবনাময় গ্যাস ব্লকগুলোয় অনুসন্ধান-উত্তোলন চলছে না। অগভীর সাগরের ৯ নম্বর ব্লকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কেয়ার্নস এনার্জি গ্যাস উত্তোলন করলেও দ্রুত মজুদ ফুরিয়ে যাওয়ায় তা বন্ধ ঘোষণা করতে হয়। ১৯৯৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত গভীর সমুদ্রের বেশ কয়েকটি ব্লকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি অনুসন্ধান কোম্পানি কার্যক্রম শুরু করলেও পরবর্তী সময়ে তা গতি হারায়। তবে সম্প্রতি ভারতীয় একটি কোম্পানি মহেশখালীর অদূরে গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করেছে। যদিও তা শুরু হয়েছে এ-সংক্রান্ত চুক্তির অন্তত আট বছর পর।

দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে ২ হাজার ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে এলএনজি সরবরাহ করা হচ্ছে ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। বর্তমানে চাহিদা ও সরবরাহে সংকট রয়েছে এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। যে পরিমাণ গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে তার মধ্যে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। বাকিটা যায় আবাসিকসহ শিল্প-কারখানায়। সরবরাহ সংকট তৈরি হওয়ায় প্রায়ই বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাস সংকটের কারণে বর্তমানে আড়াই হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রাখতে হয়েছে।

 

ডিসেম্বর পরবর্তী সময়ের পরিকল্পনা করছি আমরা

—মো. আনিছুর রহমান

সিনিয়র সচিব, জ্বালানি বিভাগ

বৈশ্বিক জ্বালানিতে যে অস্থিরতা চলছে সেটি আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। তবে কভিড পরিস্থিতিতে এটি একটি বাস্তবতা। জ্বালানির সরবরাহ ঠিক রাখতে এলএনজির দাম বেশি হলেও এ মুহূর্তে আসলে কিছু করার নেই। চাহিদা বিবেচনায় আমদানি করতে হবে।

একটি কার্গো এনেছি। আর দুটি আসবে এ মাসে। এতে ডিসেম্বর পর্যন্ত যে পরিমাণে চাহিদা রয়েছে তা পূরণ করা সম্ভব হবে। ডিসেম্বর থেকে আবার নতুন যে ডেলিভারি প্রয়োজন হবে তা এ মাসেই পরিকল্পনা করছি আমরা। সে অনুযায়ী চুক্তি সম্পন্ন করা হবে। পাশাপাশি এত অস্থিরতাও হয়তো থাকবে না। গতকাল ৫৬ ডলার পর্যন্ত দাম উঠেছিল, যা স্বাভাবিক নয়। অনেক দেশেই রেশনিং, লোডশেডিং হয়েছে। চীনের অবস্থা বেশি খারাপ। অস্ট্রেলিয়া, জাপান, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের আরো কিছু দেশে অবস্থা ভালো নয়। তবে ডিসেম্বর পর্যন্ত আমরা চিন্তিত নই। কারণ আমরা দীর্ঘ সময়ের জন্য পরিকল্পনা করেছি। অনেক দেশের তুলনায় আমরা ভালো অবস্থায় আছি। এখনো আমদানি করা জ্বালানির মূল্য পরিশোধ করে যাচ্ছি। কিন্তু সরকারি ভর্তুকি ছাড়া তা দীর্ঘ সময়ের জন্য হলে কঠিন হয়ে যাবে।

 

 

যে জ্বালানির দাম কম থাকবে সেটি ব্যবহার করব

—মোহাম্মদ হোসাইন

মহাপরিচালক, পাওয়ার সেল

আন্তর্জাতিক বাজারে তেল-গ্যাসের যে অস্থিরতা সেটি নিয়েই আমরা মিশ্র জ্বালানি ব্যবহার নিয়ে একটা পোর্টফোলিও তৈরি করেছি। বিশেষত যখন যে জ্বালানির দাম কম থাকবে সেটি ব্যবহার করব। গ্যাসের দাম বাড়লে তেলভিত্তিক এবং তেলের দাম বাড়লে কয়লা দিয়ে জ্বালানি সংকট মোকাবেলা করা হবে। মূলত মিশ্র জ্বালানি ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে জ্বালানি নিশ্চয়তা বাড়ানোর চেষ্টা করা। বিদ্যুতের সারপ্লাস নিয়ে আমরা কথা বলি। কিন্তু এটি আমরা কেন রাখি? রেখেছি বলেই এখন আমরা ব্যবস্থাপনাটা করতে পারছি। যখন যে জ্বালানি সাশ্রয়ী মূল্যে পাওয়া যাবে, সেটি ব্যবহার করব।

 

 

 

চাহিদা বিবেচনায় দীর্ঘমেয়াদি আরো চুক্তি করা যেত

—ম. তামিম

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক

জ্বালানি নিয়ে বৈশ্বিক যে সংকট তৈরি হয়েছে তা বাস্তবতা। খুব দ্রুত এটার সমাধান নেই। চীন-ইউরোপের মতো দেশগুলো এখন জ্বালানি সংকটে ভুগছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তার প্রভাব পড়বে। কারণ আমরা আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবহার করছি। তেল-গ্যাস নিয়ে বৈশ্বিক এ অস্থিরতায় বাংলাদেশের জন্য কিছুটা উদ্বেগ কম হতো, যদি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান উত্তোলনে মনোযোগ দেয়া যেত। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায় আরো অনেক দেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করা যেত। কারণ আমাদের এলএনজি সরবরাহ সক্ষমতা বিবেচনায় আরো আমদানি চুক্তির সুযোগ ছিল। তবে যে সময় এ চুক্তি করা হয়েছিল, তখন অবশ্য গ্যাসের দাম এত বেশি ছিল না। অন্যদিকে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমছে পাঁচ বছর ধরে। উত্তোলন বৃদ্ধিতে কমপ্রেসার বসানোর সুযোগ থাকলেও তা আমরা করতে পারিনি। অফশোর-অনশোরে অনুসন্ধানেও ছিল শ্লথগতি।

 

 

দাম বেশি হলেও চাহিদা পূরণে গ্যাস আনতেই হবে

— মুহাম্মদ আজিজ খান

চেয়ারম্যান, সামিট গ্রুপ

 

বাংলাদেশে তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের চাহিদা এখন অনেক বেড়েছে। চাহিদা ও মূল্য পরস্পর সম্পর্কিত। বর্তমানে বাংলাদেশের যে জনসংখ্যা সেখানে গ্যাসের দৈনিক ন্যূনতম চাহিদা ৩ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। যে দামেই হোক আনতেই হবে। এটা সরকারকে চিন্তা করতে হবে যে আগামী দিনগুলোর জন্য নীতিগত সিদ্ধান্ত কী। বাংলাদেশে যে পরিমাণ তেল-গ্যাসের চাহিদা সেটা কি কমানো সম্ভব? তারপর প্রশ্ন আসতে পারে বাংলাদেশ সরকার কি দেউলিয়া হয়ে যাবে? বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর আধিক্য, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ও গার্মেন্ট রফতানির ঊর্ধ্বগতি আমাদের অর্থের চাহিদা মেটাবে। এই কভিডের মধ্যেও গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রি চলেছে। পদ্মা ব্রিজ তৈরি হয়েছে। জাতি কিন্তু বসে নেই, কাজ করে যাচ্ছে। অনেক সময় সরকার ঘরে বসে থাকতে বললেও মানুষ কাজ করতে চাইছে।

সর্বশেষ