প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে করণীয়

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : নির্বাচন কমিশন দেশে অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে করণীয় সম্পর্কে দেশের নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করছে। এ ধরনের আলোচনা আগেও হয়েছে। তাতে কাজের কাজ তেমন একটা হয়নি। এবারো কিছু হবে বলে মনে হয় না। এক্ষেত্রে ফলপ্রসূ কিছু যদি করতে হয় তা হলে যা একান্ত প্রয়োজন তা হলো- এ বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা-বিতর্ক, উন্মুক্ত জাতীয় সংলাপ ও জনগণক সম্পৃক্ত করে এই লক্ষ্যে পরিচালিত গণআন্দোলন। এ বিবেচনায় আগেও এ বিষয়ে আমি লিখে থাকলেও তা নিয়ে আবার লিখছি। নির্বাচন ব্যাপারটি এখন অনেকটাই স্রেফ তামাশা হয়ে ওঠেছে। নির্বাচন নিয়ে তামাশার খেলা এদেশে কম হয়নি। বিশেষত জেনারেল জিয়া, জেনারেল এরশাদ প্রমুখ সামরিক শাসকের আমলে। সে সময় ভোটারবিহীন নির্বাচন, পাতানো নির্বাচন, ব্লুপ্রিন্টের নির্বাচন, ফরমায়েশি ফলাফলের নির্বাচন ইত্যাদি নানা বাহারি নামের নির্বাচন মঞ্চায়িত হতে দেখা গিয়েছিলো। এসবের বিরুদ্ধে ও অর্থপূর্ণ নির্বাচনের জন্য দেশবাসীকে বহুদিন ধরে বুকের রক্ত দিয়ে সংগ্রাম করতে হয়েছিলো।

নব্বইয়ের জানুয়ারিতে ‘আমার ভোট আমি দেবো, যাকে খুশি তাকে দেবো’- এই স্লোগান নিয়ে সিপিবির অন্যান্য নেতা ও কর্মীসহ আমি নিজে ১৯ দিনের পদযাত্রার নেতৃত্ব দিয়ে খুলনা থেকে হেঁটে ঢাকা এসেছিলাম। অন্য অনেকের সঙ্গে বিভিন্ন সময় জেল খেটেছিলাম। অগণিত শহীদ বুকের রক্ত ঢেলেছিলো। স্বেরাচারী এরশাদ শাসনের অবসানের পর নির্বাচনের নামে প্রহসনের অবসান হতে শুরু করেছিলো। কিন্তু এখন সে অর্জনটিকেও ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। দুটি তথাকথিত বড় দলের বদৌলতে ‘নির্বাচন’ আবার অর্থহীন তামাশায় পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি নির্বাচনকে ‘ডবল জালিয়াতি’তে পরিণত করা হয়েছে। চতুর রাজনৈতিক চালবাজির মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে ‘বয়কটের’ ফাঁদে ফেলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন একতরফা নির্বাচনের নতুন ফন্দি এখন চালু হয়েছে। এটি হলো, ‘খালি মাঠে গোল দিয়ে’ জিতে আসার প্রহসন। অনেকটা ‘একজনের মধ্যে ফার্স্ট হওয়ার’ মতো তামাশার ব্যাপার। জনগণ নির্বাচনের ওপর আস্থা প্রায় হারিয়েই ফেলেছে। দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ ও জাতির অস্তিত্বের জন্য এই অবস্থা মারাত্মক বিপজ্জনক।

নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনাটি এখন একটি অগ্রগণ্য কর্তব্য হয়ে ওঠেছে। সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে অবাধ-নিরপেক্ষ, অর্থবহ নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে এবং সে জন্য প্রচলিত নির্বাচন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার সাধন করতে হবে। নির্বাচনকে জালিয়াতির অধঃপতিত অবস্থা থেকে উদ্ধার করতে হলে নির্বাচন ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ করণীয় হলো ‘ভোট অনুপাতে আসন’ তথা সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি চালু করা। বর্তমানে দেশে কনস্টিটুয়েন্সির ভিত্তিতে ‘অনেক প্রার্থীর মধ্যে যিনি সবচেয়ে এগিয়ে থাকবেন, তিনি জয়ী হবেন’ (First Past the Post – FPTP) এই ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এ ব্যবস্থা বদল করতে হবে। তার জায়গায় ‘সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক’ (Proportional Representation-PR) ব্যবস্থা অর্থাৎ ‘প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে আসন সংখ্যা নির্ধারণ’ পদ্ধতি চালু করা প্রয়োজন। এই নতুন ব্যবস্থার মূল উপাদানগুলো হবে নিম্নরূপ-

[এক] সংখ্যানুপাতিক তথা ‘ভোট অনুপাতে আসন’ ব্যবস্থায় জাতীয় সংসদের নিজস্ব এখতিয়ারভুক্ত কাজকর্ম সম্পর্কে প্রস্তাবনা-পরিকল্পনা-কর্মসূচি-নীতি বর্ণনা করে রাজনৈতিক দলগুলো দেশবাসীর সামনে নিজ নিজ ইশতেহার উপস্থিত করবে। এসবের মধ্যে যে দলের ইশতেহারে বিশ্বাসযোগ্যরূপে সে তার ইচ্ছার প্রতিফলন দেখতে পারবে, সেই দলের মার্কায় দেশবাসীকে স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। যে দল যতো শতাংশ ভোট পাবে সেই দল জাতীয় সংসদে ততো শতাংশ সংখ্যক প্রতিনিধি পাঠাবে।

অর্থাৎ ৩০০ আসনের সংসদে কোনো দল ৫০ শতাংশ ভোট পেলে ১৫০ আসন পাবে, কোনো দল ৫ শতাংশ ভোট পেলে ১৫টি আসন পাবে ইত্যাদি।

[দুই] ‘ভোট অনুপাতে আসন’ ব্যবস্থায় প্রতিটি রাজনৈতিক দল তার নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণার পাশাপাশি, সংসদে আসন নেওয়ার জন্য অগ্রাধিকারক্রম অনুসারে তাদের দলের প্রতিনিধিদের তালিকা নির্বাচনের আগেই দেশবাসীকে জানিয়ে দেবে। নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোট অনুসারে যে কয়টি আসন সেই দলের প্রাপ্য, তালিকার ক্রমানুসারে সেই ক’জন ব্যক্তি সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত বলে গণ্য হবেন। এক্ষেত্রে পুরুষ ও নারীদের পৃথক দুটি তালিকা থাকবে। যদি কোনো দলের প্রাপ্য আসন সংখ্যা ৫০ হয় এবং বিধান থাকে যে, সংসদে পুরুষ ও নারীর সংখ্যা হবে সমান-সমান, তা হলে দুই তালিকা থেকে অগ্রাধিকারক্রম অনুযায়ী ২৫ জন করে ব্যক্তি নির্বাচিত বলে গণ্য হবেন।

[তিন] এই ব্যবস্থায় সংসদ সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্তির কাজে দলীয় প্রধানের ‘ডিকটেটরশিপ’ প্রতিষ্ঠার আশঙ্কা রয়েছে। সেই আশঙ্কা রোধ করার জন্য দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চা বিধিবদ্ধভাবে বাধ্যতামূলক করতে হবে। স্বাধীন নির্বাচন কমিশনকে তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করতে হবে।

[চার] ‘ভোট অনুপাতে আসন’ চজ ব্যবস্থা প্রবর্তিত হলে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা স্থানীয় পর্যায়ের উন্নয়ন কাজ, প্রশাসনিক কাজ অথবা অন্য কোনো কাজের সঙ্গে জড়িত থাকবেন না। তারা শুধু জাতীয় নীতিনির্ধারণ, আইন প্রণয়ন, কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের কাজকর্ম তদারক করা ইত্যাদিতে জড়িত থাকবেন। স্থানীয় সব উন্নয়নমূলক ও প্রশাসনিক কাজকর্ম সেই এলাকার নির্বাচিত স্বশাসিত স্থানীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হবে। এই ব্যবস্থার ফলে রাষ্ট্রব্যবস্থা ও প্রশাসনের গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ, স্থানীয় সরকারের প্রকৃত ক্ষমতায়ন এবং রাষ্ট্রীয়ব্যবস্থার ক্ষেত্রে তৃণমূলে জনগণের কার্যকর ক্ষমতায়ন গভীরতর করা সহজ হবে।

[পাঁচ] বর্তমানে নির্বাচন যেভাবে ‘টাকার খেলা’ হয়ে ওঠেছে, ভোট অনুপাতে আসন ব্যবস্থা চালু হলে তা অনেক কমে যাবে। এর প্রধান কারণ হলো, জাতীয় নির্বাচন তখন আর প্রধানত ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও এলাকাভিত্তিক হবে না। এ কারণে এখন যেভাবে নানা সুযোগ-সুবিধার প্রত্যাশায় এমপি জিতিয়ে আনার জন্য নির্বাচনে একধরনের ‘পুঁজি বিনিয়োগ’ ঘটে থাকে, সেই অবস্থা খর্ব করা সহজতর হবে।

[ছয়] প্রচলিত ‘আসনভিত্তিক FPTP’ ব্যবস্থায় সংসদে প্রাপ্ত আসনের সঙ্গে মোট প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতের কোনো সামঞ্জস্য থাকে না। ২০০১ সালের নির্বাচনের ফলাফলের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, ৪০.২১ শতাংশ ভোট পেয়েও আওয়ামী লীগ পেয়েছিলো মাত্র ৬২টি আসন অর্থাৎ ২১ শতাংশ আসন। আর বিএনপি-জামায়াত জোট ৪৫.১৫ শতাংশ ভোট পেয়ে আসন পেয়েছিলো ২০৮টি অর্থাৎ ৬৯ শতাংশ আসন। অর্থাৎ তারা মাত্র ৪.৯৪ শতাংশ বেশি ভোট পেয়ে আসন পেয়েছিলো আওয়ামী লীগের প্রাপ্ত আসনের চেয়ে ১৪৬টি বেশি অর্থাৎ ২৩৫ শতাংশ বেশি আসন। জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটানোর বিচারে তা ছিলো আওয়ামী লীগের প্রকৃত শক্তির সঠিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার প্রতিকূলে। ২০০৭ সালের নির্বাচনেও একই রকম অসামঞ্জস্যপূর্ণ ফলাফল ঘটেছিলো। এবার তা ছিলো বিএনপির প্রতিকূলে। এটা খুবই স্পষ্ট যে, আসনভিত্তিক FPTP ব্যবস্থা প্রকৃত জনমতকে সঠিকভাবে প্রতিফলিত করে না।

[সাত] আসনভিত্তিক FPTP ব্যবস্থায় একটি নির্দিষ্ট নির্বাচনী আসনের ক্ষেত্রেও প্রকৃত জনমতের নানা ধরনের অন্যায্য প্রতিফলন ঘটতে পারে। যেমন ধরা যাক, একটি আসনে ৫ জন প্রার্থীর মধ্যে যদি তারা যথাক্রমে ২৭ শতাংশ, ২৬ শতাংশ, ২১ শতাংশ, ১৭ শতাংশ ও ৯ শতাংশ করে ভোট পায় তা হলে যিনি মাত্র ২৭ শতাংশ ভোট পেয়েছেন, তিনিই নির্বাচিত হয়ে ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রতিনিধি’ হিসেবে গণ্য হবেন (যদিও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভোট তিনি মোটেও পাননি)। এসব থেকে স্পষ্ট যে, বর্তমান ব্যবস্থার চেয়ে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা প্রকৃত জনমতকে অনেক বেশি ন্যায্যভাবে প্রতিফলিত করতে সক্ষম হবে।

[আট] তাত্ত্বিকভাবে বিবেচনা করলে, বর্তমান আসনভিত্তিক FPTP ব্যবস্থায় একটি দল ৩০০টি আসনে প্রার্থী দিয়ে প্রত্যেকটিতে ৩০ শতাংশ করে ভোট পেয়েও (অর্থাৎ মোট ভোটের ৩০ শতাংশ পেয়েও) একটি সিটও না পেতে পারে। কিন্তু প্রধান দুটি দল গড়ে ৩৬ শতাংশ ও ৩৪ শতাংশ করে (দুদল মিলে ৭০ শতাংশ ভোট) ভোট পেয়ে সবগুলো আসন নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিতে সক্ষম হতে পারে। তাতে করে উদীয়মান ছোট দলগুলোর প্রকৃত শক্তির প্রতিফলন ও বিকাশ বিঘ্নিত হবে। দ্বিদলীয় রাজনীতির কাঠামোতে দেশকে আবদ্ধ করে রাখা সহজ হবে, যা এখন হচ্ছে। কিংবা ৫ জন প্রার্থী প্রত্যেকে ১৬ শতাংশ করে ভোট পেয়েও সবাই অপর কোনো একজন ২০ শতাংশ ভোট পাওয়া প্রার্থীর কাছে পরাজিত হবে। ফলে ২০ শতাংশ সমর্থন নিয়েই সেই বিজয়ী প্রার্থী নির্বাচনী এলাকার ‘অধিকাংশ ভোটারের প্রতিনিধি’ বলে গণ্য হবে। এরূপ অবস্থা মোটেও জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন নিশ্চিত করে না।

[নয়] ‘ভোট অনুপাতে আসন’ভিত্তিক চজ ব্যবস্থা বড় দলগুলোর বাইরেও উদীয়মান অথচ তুলনামূলকভাবে এখনো ছোট রয়েছে এমন সব দলকে ন্যায্য সুযোগ করে দেওয়ার ফলে গণতন্ত্রের ভিত্তি আরো প্রসারিত হবে, রাজনীতিতে প্লুরালিজমের (pluralism) চর্চা বৃদ্ধি পাবে, রাজনীতি আরো নীতি-আদর্শভিত্তিক হওয়ার সুযোগ পাবে। ঈষৎ সংক্ষেপিত।
লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), [email protected]

সর্বাধিক পঠিত