প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মোজাফর হোসেন: একটা ভুল গান দিয়ে বাংলায় শিক্ষাটা শুরু হয়েছে

মোজাফর হোসেন: একটা ভুল গান দিয়ে বাংলায় শিক্ষাটা শুরু হয়েছে। লেখাপড়া করে যে গাড়িঘোড়া চড়ে সে। গ্রামে আমাদের মা-বাবারা বলতেন। শিক্ষক বলতেন। স্কুলের পাঠ্যবই, নীতিশিক্ষার বইয়ে লেখা থাকতো। নিশ্চয়ই শহরে কোটিপতির সন্তানদের এই কথা শুনতে বা পড়তে হয়নি। মানে যাদের গাড়িঘোড়া অলরেডি ছিলো তাদের জন্য শিক্ষার অব্যক্ত গানটা কী ছিলো আমি জানি না। লেখাপড়া করে জ্ঞানী হয়ে লাভ কী এটা আমরা কখনোই বুঝিনি। যে বাবা কোনোদিন শার্ট-প্যান্ট পরেনি, যে মা ভালো করে শাড়ি পরা জানতো না, সেই বাবা-মা এও বলতেন, ছেলে শিক্ষিত হয়ে সাহেব হবে। এটাও একধরনের সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা, নিজেকে ছোট করে জানতে-বুঝতে শেখা। যে জন্য গত পঞ্চাশ বছরে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এদেশে বিরাট কিছু দিতে পারিনি। গ্রামে থাকতে সবসময় চোর-ডাকাতদের মনে করেছি দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা, তাদের চেয়ে অপরাধী এদেশে আর কেউ নেই। কিন্তু একটা চোর চৌদ্দপুরুষ ধরে চুরি করেও একটা গ্রামের ধনী তো দূরে থাক মধ্যবিত্তও হতে পারেনি। তাহলে গ্রামে শহরে দেশে গত চল্লিশ বছরে ধনী হলো কারা?

কিছু ছিলো না, কিন্তু এক প্রজন্মের হাত ধরে দেশের শীর্ষ কোটিপতিদের কাতারে গেছেন কারা? সৎ থেকে কঠোর পরিশ্রম করে সচ্ছল হওয়া যায়, হয়তো ধনী হওয়া যায়, কিন্তু দেশের অন্যতম শীর্ষধনী হওয়া যায় এটা আমি বললে আপনি বিশ্বাস করবেন? তারা কী শিক্ষা দিয়ে হয়েছে? হয়েছে একটা সিস্টেমের মধ্য দিয়ে। সিস্টেমটা তৈরি করেছে শিক্ষিত মানুষরা। শিক্ষিত মানুষরা এই সিস্টেমটা বাঁচিয়ে রেখেছে নিজেদের স্বার্থে। এই কারণে বাড়ি লুটলে চোর/ডাকাত, দেশ লুটলে স্যার। যাদের আমরা বলি করাপ্ট অফিসার, করাপ্ট আমলা। তারা কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী। তারা মানে আমরা। আমরা গাড়িঘোড়া চড়ছি, সাহেব হচ্ছি। আমরা একটা করাপ্ট সিস্টেম চালাচ্ছি। আমাদের সহজ সরল শিক্ষক, বাবা-মাকে দিয়ে সিস্টেম তো এটাই চাইয়ে/বলিয়ে নিয়েছে, নাকি?

দেশের জন্য ক্ষতিকর না তাহলে কারা? অবশ্যই দেশের কৃষক-খেটে খাওয়া মানুষেরা। কিন্তু আশ্চর্য মূর্খ বলতে আমরা তাদেরই বুঝি। আমরা চেতনে অবচেতনে আমাদের চেয়ে সৎ-সরল পিতা-প্রপিতাদের নিয়ত এভাবে গালি দিয়ে যাচ্ছি। আমাদের শিক্ষা (পড়ুন শিক্ষা নামধারী সিস্টেম) আমাদের শিখিয়ে দিয়েছে এটা। সমস্যাটা আজকের নয়। তার প্রমাণ ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে বঙ্গবন্ধু বলছেন: ‘আজকে করাপশনের কথা বলতে হয়। এ বাংলার মাটি থেকে করাপশন উৎখাত করতে হবে। করাপশন আমার বাংলার কৃষকরা করে না। করাপশন আমার বাংলার মজদুর করে না। করাপশন করি আমরা শিক্ষিত সমাজ। যারা আজকে তাদের টাকা দিয়ে লেখাপড়া করেছি। আজ যেখানে যাবেন, করাপশন দেখবেন আমাদের রাস্তা খুঁড়তে যান করাপশন। খাদ্য কিনতে যান করাপশন। জিনিস কিনতে যান করাপশন। বিদেশ গেলে টাকার ওপর করাপশন। তারা কারা? আমরা যে ৫ শতাংশ শিক্ষিত সমাজ, আমরা হলাম দুনিয়ার সবচেয়ে করাপ্ট পিপল, আর আমরাই করি বক্তৃতা।’ লেখক: কথাসাহিত্যিক

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত