প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ভিকটর কে. রোজারিও: একজন বাগানপ্রেমী শিক্ষক সুকুমার রায় ও আমাদের আশার আলো

ভিকটর কে. রোজারিও : কয়েক দিন আগে জাগোনিউজ.কমে একটা খবর পড়ার পর শিক্ষা এবং পরিসংখ্যাণ সংক্রান্ত সরকারী দপ্তরগুলোর ওয়েব সাইট ঘেঁটে জানার চেষ্টা করেছি দেশে কতগুলো প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চ বিদ্যালয় আছে।
আসলে আমার জানার বিষয় কতগুলো বিদ্যালয়ে ছাদঅলা ভবন আছে। বলাই বাহুল্য, যোগ্যতার অভাবেই তা খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়েছি!

ব্যর্থ হলেও, চলতে গিয়ে রাস্তার পাশে যত বিদ্যালয় দেখি, তাতে অনুমান করে নিতে চাই দেশে কয়েক হাজার বিদ্যালয় আছে, যেগুলোর কয়েক লক্ষ বর্গফুট ছাদ আছে। দুনিয়ার এত কিছু থাকতে বিদ্যালয়ের ছাদের হিসাব কেন?

জাগোনিউজ.কমের সংবাদ শিরোনাম ছিলো : ‘স্কুলের ছাদে বাগান করে চমকে দিলেন শিক্ষক’। তাতে সংযুক্ত খবর ছিলো এমন, ‘শিক্ষক যখন প্রকৃতিপ্রেমী তখন স্কুলে একটি বাগান না থাকলে তা বেশ বেমানান! এমনটাই করেছেন নীলফামারীর ডোমার উপজেলার পাঙ্গা বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের কৃষি শিক্ষক সুকুমার রায়।

খবরটা পড়তে পড়তে কবি কুসুম কুমারী দাশ-এর আদর্শ ছেলে কবিতাটি মনে পড়ছে :

‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে
কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।’

দেশজুড়ে কত কত স্কুল, কত তার শিক্ষক। শহরে কত স্কুলের কত নাম-ডাক! আনুষ্ঠানিকতা রক্ষায় অনেক স্কুলের মাঠেই আছে ফুল বাগান। তাতে ফোটে বাহারী ফুল। সব স্কুল এক রকম নয়, অনেক বিদ্যালয় চত্ত্বরে ফুল বাগানের গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জেনেই বাগান করেছে। কিন্তু ছাত্র-ছাত্রীদের গাছ চেনাতে, প্রকৃতির প্রেমিক বানাতে স্কুলের ছাদে বাগান গড়ে তুলেছে এমন নজীর দ্বিতীয়টি নেই। তাও নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে। প্রতি মাসে বেতনের পর যোগ হয়েছে নতুন গাছ।

খবরে পাচ্ছি: ‘সুকুমার রায় নিজের একান্ত প্রচেষ্টায় গড়ে তুলেছেন স্কুলের একাডেমিক ভবনে একটি ছাদ বাগান। প্রায় চার হাজার স্কয়ার ফিটের ওই ছাদে স্থান পেয়েছে প্রায় কয়েশত প্রাজাতির গাছপালা। সেখানে রয়েছে ফুল গাছসহ বনজ, ফলদ এবং বিভিন্ন সবজির গাছ।’

আহা এমন খবরে মন ভরে ওঠে। মনের ভেতরে আশারা চারা গজায়। প্রতিবেদকের সরেজমিন বয়ানে পাই, ‘স্কুল শিক্ষকের ওই ছাদ বাগানে ঠাঁই পেয়েছে অসংখ্য প্রজাতির সবজি গাছ। পরম যত্নে সেখানে বেড়ে উঠেছে কলাগাছও। রয়েছে পেয়ারা, আম, আতা, কমলা, বাতাবি লেবু, মালটা, পেঁপেসহ আরও অনেক।

ফুলের মধ্যে, গোলাপ, রঙ্গন, গন্ধরাজ, দোলন চাঁপা, কাঠ গোলাপ, মাধবী লতা, বিভিন্ন প্রজাতির জবা, চেরি, এলমুন্ড, টগরসহ নানা প্রজাতির মৌসুমী ফুল।’

শুধু ফুল গাছ লাগিয়ে ক্ষান্ত দেননি আমাদের গাছপাগল মডেল শিক্ষক। বাগানে যোগ করেছেন, ‘ভেষজ গাছের মধ্যে অ্যালোভেরা, তুলসী, থানকুনি, পাথরকুচিসহ আরও অনেক গাছ। শিক্ষক সুকুমার রায় জানান, প্রতিনিয়তই তার বাগানে বেড়েই চলছে গাছের সংখ্যা। সেখান থেকে শিক্ষার্থীসহ অনেক দর্শনার্থীই তার থেকে গাছের প্রজাতি নিয়ে যান।’

খবরটা পড়তে পড়তে সুকুমার রায় স্যারের প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়। অবাক হই ভেবে, একজন মানুষের স্বপ্ন কত বড় হতে পারে! তিনি ভাবেন, স্কুলের ভেতরে বাগান নয়। বরং বাগানের ভেতওে একটা স্কুল। আহা এমন স্বপ্ন দেখার সাহস আছে আমাদেও ক’জনার। তিনি বলেন, ‘সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ফুলে ফলে সাজাতে চান স্কুলের চারপাশ। গড়ে তুলতে চান বড় আকারের বাগান। তার স্বপ্ন স্কুল ঘিরে বাগান নয় বরং বাগান ঘিরে স্কুল থাকবে।’

শিক্ষক সুকুমার রায় স্কুলে ছাদ বাগান শুরু করেছিলেন ২০১৬ সালে। একটা দু’টো গাছ দিয়ে শুরু। পরম যত্নে তিলে তিলে সাজানোর কাজ চলে। তিনি বলেন, ‘আমার সহকর্মী, শিক্ষার্থীসহ সকলেই এ কাজে আমাকে অনেক সহায়তা করেন।’

ভাবছেন বাহ্ ভালো তো! তিনি শুরু করলেন আর হয়ে গেলো! ডনজের চারপাশে একবার তাকান, বুঝবেন পরিস্থিতিটা। এ দেশে কেউ নতুন কোন কিছু শুরু করলে তার কী হাল হয়, তা আমাদেও জানা। আড়ালে, আবডালে কথা আর সমালোচনার খৈ ফোটে। সামনেও পাগল, তার ছেঁড়া, আরও কত টিপ্পনি! গাছপাগল সুকুমার রায় এ সবের বাইরে নন, ‘আমি যেখানে যে প্রজাতির গাছ পেয়েছি তাই সংগ্রহ করেছি। বিভিন্নস্থানের বন-জঙ্গল থেকে তুলে এনেছি অনেক গাছ। অনেকেই আমার এসব কাজ দেখে প্রথমে হেসেছেন। আমি থেমে থাকিনি। আজকের এ বাগান আমার কাছে সন্তানতুল্য।’

তার পরিশ্রম যে বৃথা যায়নি, বরং গজিয়েছে নতুন আশার চারা তা দেখতে পাই তাঁর কথাতেই। তিনি বলেন, ‘আমরা চাইলে প্রত্যেকেই আমাদের ছাদগুলোকে এভাবে সাজাতে পারি। তাতে প্রাকৃতিকভাবে যেমন আমরা হবো সবল, তেমন অর্থনৈতিকভাবে তৈরি করতে পারি সফলতা। আমার অনেক শিক্ষার্থী তারাও নিজের বাড়িতে ছোট ছোট করে বাগান তৈরি করেছে।’

এখন তাঁর প্রশংসা সবার মুখে মুখে। স্থানীয় লোকেরা দেখতে আসে এ স্কুল বাগান। পাঙ্গা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তরনী কান্ত রায় বলেন, ‘আমাদের ওই সহকারী শিক্ষক একান্ত প্রচেষ্টায় কাজ শুরু করেন। তার চেষ্টায় আমাদের আজকের এই ছাদ বাগান, যা আমাদের জন্য সুনাম ও গর্বের বিষয়।’

ভাবি আহা রে, দেশজুড়ে যদি কয়েক হাজার, না হোক, কয়েক শ’, নিদেন পক্ষে কয়েকজন এমন গাছপাগল, প্রকৃতিপ্রেমী শিক্ষক থাকতেন। হাজার হাজার স্কুলের ছাদগুলো যদি ভরে থাকত ফুল গাছ, ঔষুধি লতা-পাতায়, অক্সিজেনে। সুকুমার রায় নামক বৃক্ষবীজ থেকে লক্ষ লক্ষ গাছপ্রেমী জন্মাক এ দেশে।

আপনার জন্য শুভকামনা সুকুমার রায় স্যার।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত