প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মাতুয়াইল-শ্যামপুর-ফতুল্লায় জলাবদ্ধতা: শ্যামপুরের পানি বুড়িগঙ্গায় না গিয়ে যাচ্ছে শীতলক্ষ্যায়

বণিক বার্তা: কেবল বৃষ্টি কিংবা বর্ষার মৌসুম নয়, বছরের বেশির ভাগ সময়ই জলাবদ্ধতায় ডুবে থাকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) শ্যামপুর, মাতুয়াইল এবং নারায়ণগঞ্জ জেলার পাগলা ও ফতুল্লা অঞ্চল। এসব এলাকার অবস্থান মূল শহর থেকে নিচুতে হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হয় তীব্র জলাবদ্ধতা। ফলে বর্ষা মৌসুম শেষ হলেও দুর্ভোগ শেষ হয় না এসব এলাকার বাসিন্দাদের জীবন থেকে।

বর্তমানে এ চার এলাকার পানি পাগলা, মহম্মদবাগ, শ্যামপুর, জিয়া সরণি, তিতাস, কুতুবখালী, মাতুয়াইল খাল হয়ে পাম্প স্টেশনে শোধনের পর শিমরাইল খাল হয়ে শীতলক্ষ্যায় যাচ্ছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সার্কেলের কর্মকর্তারা বলছেন, শ্যামপুর ও তার আশপাশ এলাকার পানি যদি বুড়িগঙ্গায় নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে মাতুয়াইল থেকে ফতুল্লা পর্যন্ত জলাবদ্ধতা কমে যাবে অবিশ্বাস্যভাবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ফতুল্লা থেকে শিমরাইল পাম্প স্টেশনের দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার। বৃষ্টি হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট এলাকার পানি শীতলক্ষ্যা পর্যন্ত যেতে স্বাভাবিকভাবে ৭-৮ ঘণ্টা সময় লাগার কথা। কিন্তু দখল-দূষণের কারণে পানি যথাযথভাবে পাম্প স্টেশন পর্যন্ত যেতে পারে না। ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে বছরজুড়ে জলাবদ্ধতা লেগেই থাকে। এ কারণে যাতায়াত থেকে শুরু করে নাগরিক সব ধরনের সুবিধা পেতে সমস্যার মুখে পড়তে হয় স্থানীয়দের। মেগাসিটি ঢাকা কিংবা শিল্প এলাকা নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা হয়েও বছরজুড়ে থাকা জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি মেলে না তাদের।

স্থানীয় কয়েকজন জানান, বৃষ্টি হলে ঘরে পানি ঢুকে পড়া এখানকার সাধারণ দৃশ্য। একটু বৃষ্টিতেই মাতুয়াইল মেডিকেল, সারুলিয়া, ডেমরা, বাঘমারা, শনির আখড়ার বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে যায়। এসব ওয়ার্ডে এখন পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় বর্ষার মৌসুমে জলাবদ্ধতার সঙ্গে পয়োনিষ্কাশনের পানিও এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। চলতি বর্ষায় টানা প্রবল বর্ষণের ফলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার পানি এখনো নামেনি অনেক জায়গা থেকে। মাতুয়াইলের একটি বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মাসেরও বেশি সময় ধরে ওই বাড়ির আঙিনায় পানি জমে আছে। বাড়ির মালিক শিকদার হোসেন বলেন, পানি যাতে ঘরে ঢুকতে না পারে, সেজন্য ঘরের দরজা ইট দিয়ে উঁচু করে নিয়েছেন তিনি। তবে প্রবল বর্ষণের সময় এতেও পার পাওয়া যায় না। তখন ঠিকই পানি ঢুকে যায় ঘরে।

সরেজমিনে দেখা যায়, মুরাদপুর, জুরাইন, নামা শ্যামপুরসহ এসব এলাকার প্রতিটি ঘরেই ইট দিয়ে আসবাব উঁচু করা হয়েছে। বৃষ্টি হলে ঘরের ভেতর পানি ঢুকে গেলে সবচেয়ে মুশকিল হয় রান্নার ব্যবস্থা করতে। এসব এলাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকটও সবসময় লেগে থাকে। মাতুয়াইল এলাকার বাসিন্দা রিপন হোসেন বলেন, বৃষ্টি হলে গোটা এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়াটা এক ধরনের নিয়মে পরিণত হয়েছে। তবে এ বছর এলাকার মানুষের ভোগান্তি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। ডেমরা বক্স নগরের বাসিন্দা গার্মেন্টস কর্মী রেশমা খানম বলেন, কয়েকদিন আগের পানি এখনো রাস্তা থেকে নামেনি। অবস্থা এমন হয়েছে যে ঘর থেকে বের হলে সঙ্গে অতিরিক্ত পোশাক নিয়ে বের হতে হয়।

দূষিত পানির কারণে এলাকার মানুষ ডায়রিয়া, আমাশয়সহ নানা রোগে ভুগছে উল্লেখ করে শহীদ নগরের বাসিন্দা রায়হান কবীর বলেন, জলাবদ্ধতায় অসুস্থ ও শিশুদের নিয়ে বেশি কষ্ট হয়। শিশুরা বারবার পানিতে চলে যায়। আর অসুস্থদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াও ভীষণ বিড়ম্বনার।

ডিএসসিসির ৬৩ নং ওয়ার্ডের (মাতুয়াইল উত্তর পাড়া ও শরিফ পাড়া) কাউন্সিলর মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, ৬২, ৬৩, ৬৪, ৬৫ ও ৬৬ নং ওয়ার্ডে বছরের সব সময় জলাবদ্ধতা লেগেই থাকে। কয়েকদিন আগে প্রবল বৃষ্টিপাতের পর যে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে, সে পানি এখনো নামেনি।

এসব অঞ্চলে স্থানীয় নির্বাচনের সময় জনপ্রতিনিধিরা জলাবদ্ধতা নিরসনের ওয়াদা করে নির্বাচিত হলেও এর প্রকৃত সমাধান তাদের হাতে নেই বলে স্বীকার করেছেন খোদ ওয়ার্ড কাউন্সিলররাই। একাধিক ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, তারা এসব অঞ্চল থেকে জনপ্রতিনিধি হওয়ার জন্য নির্বাচনের সময় প্রথম ওয়াদাই করেন জলাবদ্ধতা নিরসনের। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব এলাকা নিচু হওয়ায় এবং ডিঅ্যান্ডডি প্রকল্পের আওতায় হওয়ায় জলাবদ্ধতার কোনো সমাধান কাউন্সিলরদের হাতে থাকে না।

ডিএসসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কর্মকর্তা মো. শফিউল্লাহ সিদ্দিক ভূঁইয়া বলেন, যেসব খাল হয়ে পানি শিমরাইল পাম্প স্টেশনে যায়, ওইসব খাল দখল-দূষণে ধুঁকছে। যদি খালগুলোতে দখল-দূষণ না থাকত, এগুলো যথেষ্ট গভীর ও প্রশস্ত হতো, তার পরও প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ ঘুরে এসব পানির শিমরাইল পাম্প পর্যন্ত যেতে দীর্ঘ সময় লেগে যেত। ফলে একটা বড় সময় সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর মানুষকে জলাবদ্ধতার ভোগান্তি পোহাতে হতো।

সম্প্রতি ডিএসসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সার্কেলের যৌথ উদ্যোগে একটি জরিপ করা হয় বলে জানান এ কর্মকর্তা। সেখানে এ জলাবদ্ধতার বিষয়টি উঠে আসে। তখন মেয়র ফজলে নূর তাপস এ সমস্যা সমাধানে পানিপ্রবাহের দুটি পথ সৃষ্টির জন্য বলেন। এক্ষেত্রে তিনি নির্দেশ দেন, শ্যামপুর থেকে পানি শীতলক্ষ্যায় না ফেলে বুড়িগঙ্গায় ফেলার জন্য নতুন একটি চ্যানেল খোলা যায় কিনা তা খতিয়ে দেখতে। কারণ শ্যামপুর থেকে বুড়িগঙ্গার দূরত্ব মাত্র এক-দেড় কিলোমিটার। এখানকার পানি যদি বুড়িগঙ্গায় ফেলা যায়, তাহলে শ্যামপুর, পাগলা, ফতুল্লার জলাবদ্ধতা যেমন কমে আসবে, একইভাবে মাতুয়াইল, সিদ্ধিরগঞ্জ ও তার আশপাশ এলাকার ওপরও চাপ কমবে। এতে দুই অঞ্চলের জলাবদ্ধতার সমস্যাই সমাধান হবে।

একই কথা বলেছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব। তিনি বলেন, শ্যামপুর অঞ্চল ছিল নিচু এলাকা। এটি মূলত ডিঅ্যান্ডডি প্রকল্পের আওতায় কৃষিকাজের উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সেখানে অপরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর-শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। তখনই পরিকল্পনা ছিল যে এ অঞ্চলের পানি বুড়িগঙ্গায় যাবে।

তিনি বলেন, শীতলক্ষ্যার দিকের পাম্পটি হলেও বুড়িগঙ্গা অংশের পাম্পটি আর হয়ে ওঠেনি। স্বাভাবিকভাবেই অনেকটা পথ ঘুরে পানি যাওয়ায় ব্যাপক দুর্ভোগ হচ্ছে জনসাধারণের। ডিএসসিসি যে পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে, তা অবশ্যই জনকল্যাণমূলক। এখানে নতুন পাম্প স্টেশন করে এ অংশের পানি বুড়িগঙ্গায় ফেললে জনদুর্ভোগ কমে আসবে।

এ প্রসঙ্গে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ বলেন, শ্যামপুর-ফতুল্লা পাশাপাশি এলাকা হওয়ায় শ্যামপুরের জলাবদ্ধতা কমে এলে এর সুফল ফতুল্লাও পাবে। ডিআ্য্যন্ডডি প্রকল্পের বাইরেও নারায়ণগঞ্জ এলাকার দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় বরাবর চিঠি দিয়ে আমরা ইতিবাচক সাড়া পেয়েছি। আমাদের জরিপ চলছে। আশা করি, এসব সমস্যারও দ্রুত সমাধান হবে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত