প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিদেশী কর্মী নিয়োগ আইন শিথিল, সিঙ্গাপুরে কাজের সুযোগ বাড়ছে প্রবাসী কর্মীদের

নিউজ ডেস্ক: মহামারী কভিড-১৯-এর প্রভাবে তীব্র কর্মী সংকটে পড়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ সিঙ্গাপুর। করোনা পরিস্থিতিতে গত বছর থেকেই বিভিন্ন মেয়াদে বাংলাদেশ ও ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি রেখেছে দেশটি। ফলে সিঙ্গাপুরে বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়া থেকে শ্রমিক সরবরাহ প্রায় বন্ধই। এ অবস্থায় অভিবাসী শ্রমিকনির্ভর আবাসন ও শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধির চাকা সচল রাখতে বিদেশী কর্মী নিয়োগের আইনগুলো সাময়িকভাবে শিথিল করেছে দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর মতো যার সুফল পাবেন সিঙ্গাপুরে বর্তমানে কর্মরত ও যেতে আগ্রহী বাংলাদেশী কর্মীরাও। বণিক বার্তা

কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে সীমান্ত বন্ধ থাকায় সিঙ্গাপুরের নির্মাণ ও মেরিন সেক্টরের কোম্পানিগুলো বর্তমানে চরম কর্মী সংকটে ভুগছে। কর্মী সংকটের মধ্যেই দেশটিতে নির্মাণ খাতে কাজ করছেন এমন অনেক অভিজ্ঞ কর্মীর কাজের অনুমতিপত্রের মেয়াদও পেরিয়ে গেছে। সিঙ্গাপুরের মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় ঘোষণা দিয়েছে, কাজের অনুমতিপত্রের মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়া কর্মীরা নতুন চাকরি খুঁজে নিতে আরো অতিরিক্ত ৩০ দিন সময় পাবেন। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী অনুমতিপত্রের মেয়াদ শেষ হওয়া মাত্রই ওই কর্মীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হতো।

শুধু তা-ই নয়, সিঙ্গাপুরের মেরিন শিপইয়ার্ড এবং প্রক্রিয়াজাত সেক্টরে কর্মরত বিদেশী শ্রমিক, যাদের কাজের অনুমতিপত্রের মেয়াদ জুলাই থেকে শুরু করে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হবে; তাদের অনুমতিপত্রের মেয়াদ দুই বছরের জন্য বাড়ানো হবে। এমনকি মেয়াদ বাড়ানোর সময় কর্মীর বয়স ও পূর্ববর্তী কাজের যেসব বিষয় বিবেচনায় নেয়া হতো, তার আর প্রয়োজন হবে না।

সিঙ্গাপুরের মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় ঘোষণা দিয়েছে, নির্মাণ ও প্রক্রিয়াজাত সেক্টরের কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে নতুন বিদেশী কর্মী নিয়োগে ন্যূনতম দক্ষতার বাধ্যবাধকতা ছিল সেটি আর থাকছে না। ফলে এখন থেকে অদক্ষ কর্মীদেরও নিয়োগ দিতে পারবে এসব খাতের কোম্পানিগুলো। বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, ফিলিপাইন ও চীন থেকেই এসব খাতের কর্মীদের নিয়োগ দিতে হবে। অন্যদিকে যেসব কর্মীর সিঙ্গাপুরে কাজের পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাদের নিয়োগ ও কাজের অনুমতিপত্র বরাদ্দের বিষয়ে কোম্পানিগুলোর জন্য আর কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যার সীমা থাকছে না। আগামী ১ অক্টোবর থেকে ২০২২ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত কোম্পানিগুলোকে এ ওয়েভার দিয়েছে সিঙ্গাপুর সরকার।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিঙ্গাপুরের অভিবাসী শ্রমিকনির্ভর আবাসন ও শিল্প খাতে শ্রমিকের ক্রমবর্ধমান চাহিদা এতদিন পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোই পূরণ করে এসেছে। ফলে মহামারীর বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রবৃদ্ধির চাকা সচল রাখাটাই সিঙ্গাপুরের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে সিঙ্গাপুরে আগমনে নিষেধাজ্ঞা জারির পর থেকেই দেশটি শ্রমিক সংকটে ভুগছে। দেশটির অর্থনীতিতেও এরই মধ্যে এর ছাপ পড়তে শুরু করেছে।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৫০ হাজার কর্মী রফতানি হতো সিঙ্গাপুরে। কিন্তু নভেল করোনাভাইরাস মহামারী শুরু হলে গত বছর থেকে কর্মী পাঠানো কমতে শুরু করে। গত বছর (২০২০) বাংলাদেশ থেকে সিঙ্গাপুরে কর্মী গিয়েছিলেন মাত্র ১০ হাজার ৮৫ জন। আর চলতি বছর মে মাস পর্যন্ত গিয়েছেন ১২ হাজার ১৩৯ জন। এর পর থেকেই করোনা সংক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে কর্মী পাঠানো বন্ধ রয়েছে। কভিডের আগে অর্থাৎ ২০১৯ সালে ৪৯ হাজার ৮২৯ বাংলাদেশী বহির্গমন ছাড়পত্র নিয়ে সিঙ্গাপুর যান। এছাড়া ২০১৮ সালে ৪১ হাজার ৩৯৩ জন, ২০১৭ সালে ৪০ হাজার ৪০১, ২০১৬ সালে ৫৪ হাজার ৭৩০ ও ২০১৫ সালে ৫৫ হাজার ৫২৩ জন বাংলাদেশী শ্রমিক দেশটিতে পাড়ি জমান।

সিঙ্গাপুরে নিয়মিত কর্মী পাঠিয়ে আসছে এমন একাধিক রিক্রুটিং এজেন্সির তথ্য বলছে, করোনার কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে কর্মী নিয়োগ বন্ধ করে দেয়ার আগে থেকেই ঘাটতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল সিঙ্গাপুরের শ্রমবাজার। কঠোর ভ্রমণ নীতিমালা এবং অনেক শ্রমিক কর্মস্থল ছেড়ে চলে যাওয়ার কারণে এ সমস্যার উদ্ভব হয়েছিল। এ সমস্যার কারণে দেশটিতে নির্মাণ খাতের অনেক প্রকল্প এখন দীর্ঘায়িত হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব প্রকল্প এক বছর পর্যন্তও বিলম্বিত হয়েছে। এ অবস্থায় বিদেশী কর্মী নিয়োগের বিকল্প নেই দেশটির কাছে, যা বাংলাদেশের বিদেশগামী কর্মীদের জন্য একটি সুযোগ তৈরি করবে।

জনশক্তি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) মহাসচিব (সাবেক) শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান এ প্রসঙ্গেজানান, সিঙ্গাপুরের মোট শ্রমশক্তির এক-তৃতীয়াংশই গড়ে উঠেছে অভিবাসী শ্রমিকদের দিয়ে। বিশেষ করে দেশটির নির্মাণ ও জাহাজ শিল্পের মতো ভারী খাতগুলো বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারত থেকে কম খরচে পাওয়া শ্রমিকদের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। তিনি বলেন, কর্মী সংকটে সিঙ্গাপুর সম্প্রতি কিছু ওয়েভার দিয়েছে। তবে অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, করোনা পরিস্থিতির কারণে আমরা

বর্তমানে সুযোগটি নিতে পারছি না। কারণ দেশটির সীমান্ত আমাদের জন্য বন্ধ রয়েছে। এ অবস্থায় আমাদের করোনা নিয়ন্ত্রণ ছাড়া কোনো উপায় নেই। এজন্য সাধারণ মানুষকে সচেতন হতে এবং সবাইকে টিকার আওতায় আসতে হবে। অন্যথায় বাংলাদেশ নতুন নতুন নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পড়বে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলো নিয়ে নেবে।

সিঙ্গাপুর সরকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটির নির্মাণ প্রকল্প, শিপইয়ার্ড ও বিভিন্ন কলকারখানায় গত বছর অভিবাসী শ্রমিকের সংখ্যা কমেছে ১৬ শতাংশ। বছর শেষে খাতগুলোয় কর্মরত অভিবাসী শ্রমিকের সংখ্যা নেমে এসেছে ৩ লাখ ১১ হাজারে। এ সময় দেশটিতে অভিবাসী শ্রমিকের মোট সংখ্যা কমেছে প্রায় ১৪ শতাংশ।

এদিকে করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে এখনো সিঙ্গাপুরে দক্ষিণ এশিয়া থেকে স্বল্পমেয়াদি ভ্রমণকারী ও দীর্ঘমেয়াদি পাসধারী শ্রমিক আগমনের ওপর নিষেধাজ্ঞা চালু রয়েছে। সম্প্রতি দেশটির শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, সিঙ্গাপুরের নির্মাণ ও জাহাজ শিল্পে বর্তমানে মারাত্মক শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। এ সংকটকে আরো প্রকট করে তুলেছে দক্ষিণ এশিয়া থেকে অভিবাসী শ্রমিকদের আগমনের ওপর জারীকৃত বিধিনিষেধ। গত বছর দেশটির নির্মাণ খাতের সংকোচন হয়েছে ৩৬ শতাংশ। শ্রমিকদের বসবাসস্থলে কভিড-১৯-এর গুচ্ছ সংক্রমণের কারণে নির্মাণ খাতের বিভিন্ন সাইট পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে এ পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হয়ে উঠলেও চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) নির্মাণ খাতের সংকোচন অব্যাহত ছিল। এ সময় খাতটির সংকোচন হয়েছে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৩ শতাংশ।

নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে সিঙ্গাপুরের আবাসন খাতে বিক্রির গতি কমে আসার ঝুঁকি তৈরি করেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন সেবা ফ্যাসিলিটির উদ্বোধনও পিছিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া দেখা দিয়েছে সার্বিক ভোগব্যয় কমে আসার আশঙ্কাও। এ অবস্থায় সিঙ্গাপুরের বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠন এখন দেশটির সরকারের প্রতি দক্ষিণ এশিয়া থেকে শ্রমিক আগমন পুনরায় চালুর আহ্বান জানিয়েছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত