প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কক্সবাজারে এক পাহাড়ের ঢালে ৩০০ ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার (ভিডিও)

নিউজ ডেস্ক: কক্সবাজারে এক পাহাড়ের ঢাল ও পাদদেশে ৩ শতাধিক পরিবার মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। ভারী বর্ষণে এসব পরিবারের ঘরবাড়ির ওপর পাহাড় ধসে বিপর্যয় ঘটতে পারে বলে আশঙ্কায় রয়েছেন স্থানীয়রা। তবে একপ্রকার উপায়হীন হয়েই এভাবে বিপদজনক কায়দায় পাহাড়ের নিচে বসবাস করছে বলে জানিয়েছেন এসব পরিবারের সদস্যরা।

কক্সবাজারের খাঁজা মঞ্জিল এলাকার একটি পাহাড়ের নিচে ৩ শতাধিক পরিবার বসবাস করছে। এদের বেশিরভাগই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ। মৃত্যু ঝুঁকি জেনেও বিকল্প উপায় না পেয়ে বাধ্য হয়ে বছরের পর বছর তারা এখানে বসবাস করে আসছে।

খাঁজা মঞ্জিল পাহাড়ী এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ কাইয়ুম বলেন, ‘প্রায় ৮ বছর ধরে এখানে বসবাস করে আসছি। আমার বাবা স্থানীয় এক ব্যক্তি থেকে ঘর করার জন্য জায়গাটি কিনেছিলেন। সমতল ভূমিতে ঘর করার জন্য অনেক বেশি টাকা প্রয়োজন। আমাদের অতো বেশি টাকা নেই তাই ঝুঁকিপূর্ণ হলেও পাহাড়ের ঢালে বসবাস করছি।’ রাইজিং বিডি

এলাকার নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘এই পাহাড়টির নিচে ৩০০ এর বেশি পরিবার বসবাস করছে। বর্ষা এলে সবাই পাহাড় ধসের আতংকে থাকি। ভারী বর্ষণে অনেকেই আত্মীয় স্বজনের বাসায় চলে যায়। কষ্ট হলেও এখানে বসবাস ছাড়া আমাদের কোনো বিকল্প নেই।’

পাহাড়ে বসবাসকারী রহিমা খাতুন বলেন, ‘বাইরে আমাদের ঘরবাড়ি নেই। কোথাও স্থান তাই সন্তানদের নিয়ে পাহাড়ে বসতবাড়ি করেছি। ছেলে-মেয়ে নিয়ে কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই বলে ঝড়-বৃষ্টি হলেও ভয়-ভীতি নিয়ে পাহাড়ে বসবাস করছি। সরকারি ভাবে কোনো স্থান হলে আমরা পাহাড় থেকে চলে যাবো।’

কক্সবাজারে পাহাড় ধস রোধে নেই টেকসই কোনো ব্যবস্থাপনা বা পরিকল্পনা। ফলে প্রতিবছরই পাহাড় ধস বা পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। বর্ষা এলে এই আতঙ্ক বেড়ে যায়। এ সময় পাহাড় ধস রোধে প্রশাসনও তৎপর হয়ে ওঠে। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে পাহাড় ধসের মোকাবেলা প্রশাসনের ব্যাপক প্রস্তুতি নিলেও তা মূলত সাময়িক।

কক্সবাজার বন বিভাগ সুত্রে জানা যায়, জেলায় মোট বনভূমির পরিমাণ ৭৩ হাজার ৩৫৮ হেক্টর। এরমধ্যে অবৈধ দখলে রয়েছে ৯ হাজার ৬৫৭ হেক্টর বনভূমি। পাহাড়ি জমিতেই বসবাস করছে ১৩ হাজার ৮২৬টি পরিবারের তিন লাখ মানুষ। তারা পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করা এসব লোকজনকে অন্য কোথাও সরে যেতে মাইকিং করে সতর্কমূলক প্রচারণা চালায়। তারা সাময়িক সরে গেলেও পরে আবার এসে আগের জায়গায় বসবাস শুরু করে।

কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা দীপু বলেন, ‘কক্সবাজার সদরে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের সংখ্যা কমপক্ষে ২ হাজারের বেশি। পাহাড়ী অঞ্চলে বসবাসকারীরা যখন পাহাড় কেটে ঘর তৈরী করে তখন প্রশাসন ও বন বিভাগ বাধা দেয় না। যার কারণে পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতির সংখ্যা বেড়ে গেছে। আমি মনে করি তাদের দ্রুত সময়ে অন্যত্রে সরিয়ে ফেলা উচিত। অন্যথায় প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটতে পারে। পাশাপাশি পরিবেশের ব্যাপক বিপর্যয় হবে।’

কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা মো. হুমায়ূন কবির বলেন, ‘কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের পাহাড়ী অঞ্চলে ৩ হাজার ৫২৫ পরিবার অতি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাস করছে। তন্মধ্যে কক্সবাজার শহরে ৯৪৫ পরিবার। আমাদের উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করলেও তারা পুনরায় ওইসব জায়গায় এসে বসবাস করে। গত জুন মাসে দক্ষিণ বন বিভাগের পক্ষ থেকে এসব ঝুঁকিপূর্ণ ও অতি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ১৮ দিন জনসচেতনতামূলক মাইকিং করা হয়েছে। সদরেও মাইকিং করা হয়েছে। এছাড়াও এসব এলাকার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় সচেতন মহলের সমন্বয়ে আলোচনা সভা করা হয়। আমাদের উচ্ছেদ অভিযানও অব্যাহত আছে।’

অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবু সুফিয়ান বলেন, ‘পাহাড়ের পাদদেশে অতি ঝুঁকিতে বসবাস করা পরিবারগুলোকে সরিয়ে আনাটা একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। তারপরও ঝুঁকি এড়াতে কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে জেলা প্রশাসন। এ ব্যাপারে গত ৬ জুন ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের প্রধান করে একটি উপকমিটি গঠন করা হয়।

এডিএম আরও বলেন, ‘ইতোমধ্যে ঝুঁকিতে বসবাসকারী পরিবার গুলো অন্যত্রে সরিয়ে নিতে জায়গা খোঁজার কাজ চলছে। যেহেতু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তাই একটু সময়ের দরকার। জায়গা পেলে তাদের সেখানে পুনর্বাসন করা হবে।’

উল্লেখ্য, প্রায় আড়াই হাজার বর্গকিলোমিটারের কক্সবাজার জেলার একটি বড় অংশ জুড়েই রয়েছে, ছোট বড় কয়েক শ’ পাহাড়। আর সরকারি এসব জমি বেদখল করে বসবাস করছে প্রায় ১০ লাখ মানুষ। তার মধ্যে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকি নিয়ে বাস করছে প্রায় ৩ লাখের বেশি।

পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, গত ১০ বছরে কক্সবাজার জেলায় একাধিক পাহাড় ধ্বসের ঘটনায় প্রায় ৩শ মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত