প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] গ্রামের ঘরে ঘরে গিয়ে মানুষকে টিকা দিতে হবে: ডা. এবিএম আবদুল্লাহ

ভূঁইয়া আশিক রহমান : [২] আমাদের নতুন সময়কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রীর চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, করোনা মানুষের জন্য বড় অভিশাপ হয়ে এসেছে। বিশ^ আজ করোনায় বিপর্যস্ত। সমস্ত কিছু লন্ডভন্ড করে দিয়েছে এই মারণঘাতী ভাইরাস। মানুষ তার মেধার সবটা দিয়ে করোনার বিরুদ্ধে জয়ী হওয়ার চেষ্টা করছে। বিজ্ঞান সেক্ষেত্রে আমাদের জন্য আশার আলো দেখিয়েছে। বিজ্ঞানীরা করোনা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার করেছেন। টিকা আবিষ্কারের মাধ্যমে করোনার পরাজয় অনেকটা নিশ্চিত করেছেন। কিন্তু বৈষম্যে আর পুঁজি নীতি তোষণের পৃথিবীতে গরিবেরা অবহেলিত থেকে যায় সবসময়। টিকা নিয়েও অনেকটা সেরকম হচ্ছে।

[৩] যারা ধনী, প্রভাবশালী রাষ্ট্র, সব টিকা তাদের আওতায়। প্রয়োজন ছাড়াও টিকা নিয়ে মজুত করে রেখেছেন তারা। নিজেরা করোনামুক্ত হলেও টিকা নিয়ে রাজনীতি করছেন। এর শিকার হচ্ছে গরিব ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রসমূহ। কেউ কেউ অর্থের জন্য টিকা পাচ্ছে না, কারও কারও অর্থসংস্থান হলেও হচ্ছেন টিকা রাজনীতির শিকার। যেমন বাংলাদেশ। বাংলাদেশ অর্থের সংস্থান করলেও টিকা রাজনীতির শিকার হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। যদিও এখন পরিস্থিতি অনেকটা অনুকূলে চলে এসেছে। আমরা টিকার ব্যবস্থা করছি। আবারও গণটিকা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আশা করছি যতো দ্রুত সম্ভব টিকার প্রাপ্যতা সাপেক্ষে সকল মানুষকে টিকা দেওয়া যাবে।

[৪] করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় টিকা দেওয়া। সরকার চেষ্টা করছে সকলকে টিকার আওতায় নিয়ে আসতে। কিন্তু তার আগে আমাদের কিছু বিষয় মেনে চলতে হবে। স্বাস্থ্যবিধিনিষেধগুলো অনুসরণ করে চলতে, সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে। মানুষের সহযোগিতা না পেলে সরকরের পক্ষে করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যাবে।

[৫] করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি রোধে লকডাউন মূল পন্থা নয়। কারণ দীর্ঘমেয়াদী লকডাউনে নানান অসুবিধা আছে। মানুষ কর্মহীন, ঘরে থেকে থেকে অস্থির হয়ে গেছে। দরিদ্রদের কষ্ট বেড়েছে। তারা কষ্টে আছেন। খেয়ে-না খেয়ে জীবন অতিবাহিত করছেন। দোকানপাট বন্ধ। এতে বহু লোক কর্মহীন। তাদের জীবনে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তাদের বেতন-ভাতা নেই। জীবনে গতি আনতে, মানুষকে একটু স্বস্তি দিতে লকডাউন কিছুটা শিথিল হওয়া দরকার। লকডাউন শিথিলতায় করোনার গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করবো আমরা। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নতুন করে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।

[৬] সরকার তার দায়িত্ব পালন করবে, তবে মানুষকেও সচেতন হতে হবে। নাগরিক দায়িত্ব পালন করতে হবে। করোনা থেকে বাঁচতে হলে স্বাস্থ্যবিধি মানতেই হবে। মাস্ক পরতে হবে। সেনিটাইজার বা সাবান দিয়ে কিছুক্ষণ পর পর হাতও ধুতে হবে। শারীরিক দূরত্ব মেনে চললে করোনা সংক্রমণের লাগাম টানা যাবে। মানুষ যাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে, এ ব্যাপারে সরকারকেও কঠোর হতে হবে। নজরদারি বাড়াতে হবে, কেউ যেন মাস্ক ছাড়া ঘুরাফেরা করতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

[৭] ঈদ আসছে। পশুর হাট বসবে। মানুষের ভিড় বাড়বে। পশু বেচা-কেনা হবে। ক্রেতা, বিক্রেতা, ইজাদার, দর্শনার্থীদের ভিড় হবে। পশুর হাটগুলো মানুষে ভরপুর থাকবে। স্থানীয় সরকার, জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সমাজের বিভিন্ন স্তরের লোকজনের সঙ্গে সমন্বয় করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর জোর দিতে হবে। পশুর হাটগুলোতে যেন লোকজন মাস্ক ছাড়া চলাফেরা না করে। এটা নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে করোনা পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, বলা যায় না। এখনকার চেয়ে খারাপ কিছু হওয়া অসম্ভব নয়।

[৮] চলমান কঠোর বিধিনিষেধের ফল আগামী সপ্তাহে বোঝা যাবে। এক সপ্তাহ দেখলে বোঝা যাবে করোনা সংক্রমণ কোন দিকে যাচ্ছে।

[৯] করোনা থেকে বাঁচার দুটি রাস্তা খোলা আছে। এক. স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, দুই. অবশ্যই টিকা গ্রহণ। নিবন্ধন করে টিকা নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। টিকা নেওয়ার সুযোগ এলে নিয়ে নিতে হবে। টিকাই করোনা থেকে বাঁচাতে পারে আমাদের। গণহারে টিকা দিতে হবে। প্রয়োজনে গ্রামের ঘরে ঘরে গিয়ে টিকা দিতে হবে টিকাপ্রাপ্তি সাপেক্ষে। আমাদের অন্য অনেক টিকা তো গ্রামে গ্রামে গিয়েই দেওয়া হয়। করোনা টিকা এখন না পারলেও ভবিষ্যতে হয়তো ঘরে ঘরে গিয়ে টিকা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

[১০] টিকার দুই ডোজ করোনা থেকে অনেক বেশি সুরক্ষা দেয়। করোনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এক ডোজও অনেকটা সুরক্ষা দিয়ে থাকে। তবে এখনো পর্যন্ত জনসন অ্যান্ড জনসনের টিকা ব্যতীত সকল টিকারই দুই ডোজ নিতে হবে। এতে শরীরে এন্টিবডি তৈরি হয়। করোনা আর সুবিধা করতে পারে না। দ্বিতীয় ডোজ বন্ধ রেখে টিকার এক ডোজ দেওয়ার পলিসিতে কানাডা সাফল্য পেতে পারে। কারণ তাদের জনসংখ্যা খুবই কম। তাদের টিকা প্রাপ্তিও অনেক বেশি। ফলে কানাডা যেকোনো কৌশল গ্রহণ করতে পারে অনেকটা সহজে। কিন্তু আমাদের পক্ষে একই কৌশল গ্রহণ ও বাস্তবায়ন এতোটা সহজ নয়। কারণ সতেরো কোটির মানুষের দেশ বাংলাদেশ।

[১১] কানাডার আড়াই কোটি, অস্ট্রেলিয়ার জনসংখ্যাও অনেক কম। আমেরিকার ৩৫ কোটি লোক, ৫০টি রাজ্য। তাদের অর্থবিত্ত সবই আছে। তুলনা করে লাভ নেই। এছাড়া টিকা নিয়ে বাণিজ্য আছে, রাজনীতিও আছে। বড় বড় অনেক দেশের টিকা দরকার নেই, কিন্তু মজুদ করে রেখেছে! নানামুখী সংকট আছে টিকা নিয়ে। এতো সংকটের মধ্যেও টিকা কূটনীতিতে এখন বাংলাদেশ ভালো করছে। গণটিকা কার্যক্রম আবারও শুরু হয়েছে।

[১২] টিকার কার্যক্রম আমরা জোরেসোরে চালাতে পারছি না। যদি টিকা প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়, তাহলে দ্রুত সময়ের মধ্যে উপজেলা বা গ্রামে গ্রামে গিয়ে দেওয়া গেলে সমস্যা সংকট কাটবে। সংসদীয় স্থায়ী কমিটি টিকার বর্তমান প্রাপ্যতা বিশ্লেষণ করে বলেছে, ৮০ শতাংশ লোককে টিকা দিতে চার বছর লাগতে পারে। আর টিকা কার্যক্রম তো একটা চলমান প্রক্রিয়া। দেখা যাবে এর মধ্যে আরও ভালো টিকা এসেছে। আরও অনেক বেশি টিকার প্রাপ্যতা নিশ্চিত হয়েছে। তখন টিকা কার্যক্রম আরও ব্যাপকভাবে পরিচালনা করা যাবে।

[১৩] প্রয়োজন সাপেক্ষে ফিল্ড হাসপাতাল করা যায়। সেবার উদ্দেশ্যে কাজ করলে স্বাগতম জানানো উচিত। সহযোগিতা করা দরকার। সৎ উদ্দেশ্য থাকলে যে কেউ ফিল্ড হাসপাতাল করতে চাইলে সমর্থন করা দরকার। তবে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে লোকজন অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পরে। সরকারকে মনিটর করতে হবে, যাতে মানুষ কোনোভাবে প্রতারণা শিকার না হয়। কারণ সমাজে দুর্নীতি এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি আমাদের ঢুকেছে, তাতে শঙ্কা জাগায় ফিল্ড হাসপাতাল করতে গিয়ে ব্যবসা শুরু করে কিনা। আমাদের সবকিছুতেই ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি কাজ করে।

[১৪] ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি পরিহার করে সেবার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। চারদিকে যে হারে অপকর্ম চলছে, ফিল্ড হাসপাতাল করতে গিয়ে যাতে কেউ অপকর্ম না করে। সৎভাবে, সিনসিয়ারলি করতে পারলে ভালো। দুর্নীতি যাতে কোনোভাবেই প্রশ্রয় না পায়। দুর্নীতি আমাদের ভেতর থেকে খেয়ে ফেলছে। অনিয়মের ব্যাপারে কঠোর হতে পারলে আমরা আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে পারবো।

[১৫] চীনের সঙ্গে যৌথভাবে টিকা উৎপাদনে যাবে কিনা এটা সরকারের সিদ্ধান্ত। তবে আমি মনে করি, এদেশে টিকা উৎপাদনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। তাহলে আমরা আমাদের চাহিদা মেটাতে পারবো সহজে। যৌথ উদ্যোগ ছাড়া তো টিকা উৎপাদন সম্ভব নয়। কারণ আমাদের টেকনোলজি লাগবে। কাঁচামাল লাগবে। কীভাবে কোন পদ্ধতিতে যৌথ টিকা উৎপাদনে যাবে সরকার, এটা তাদের পলিসি।

[১৬] করোনা পরিস্থিতি খারাপ, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে কয়েকদিনের মধ্যেই বোঝা যাবেÑসংক্রমণ কমবে নাকি বাড়বে। শুধু আমরাই কেন, বিশ^ই এখন করোনায় বিপর্যস্ত। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের পরিস্থিতিও তো কয়েকদিন আগে খুব খারাপ ছিলো। আমাদের এখানে এখন খারাপ পরিস্থিতি। আশা করছি সংক্রমণ কমতে শুরু করবে। কেননা আমরা গণটিকা কার্যক্রম শুরু করেছি। একইসঙ্গে যদি আমরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলি, পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে। সবাইকে টিকার আওতায় আনতে হবে, তাহলে করোনা থেকে আমরা রক্ষা পাবো।

[১৭] করোনা মোকাবেলায় আমাদের নানান সীমাবদ্ধতা চোখে পড়েছে। হাসপাতাল কিংবা আইসিও’র সংকট আছে। দক্ষ জনবলেরও সংকট রয়েছে। অপর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্সও নয়। টেকনিশিয়ানেরও সংকট আছে। অনেক সময় চাইলেও রাতারাতি সবকিছু পাওয়া যাবে না। তবুও আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

 

 

সর্বাধিক পঠিত