প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আওয়ামী লীগের পথচলা এবং উন্নয়ন কৌশলে ভিন্নমত

ড.মীজানুর রহমান : বাঙালি জাতির জন্য ২৩ জুন টার্নিং পয়েন্ট। আজকের এই ঐতিহাসিক দিনে রোজ গার্ডেনে আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম হয়। যেটি পরবর্তী সময়ে ১৯৫৫ সালে এসে মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে পরিবর্তন করে আওয়ামী লীগ নামকরণ করা হয়। সম্পূর্ণ নতুন করে ধর্ম নিরপেক্ষ একটি দল ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’ তৈরি করা হয়। তার আগে ১৯৪৮ সালে কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ গঠিত হয়। এই ছাত্রলীগের সংগঠকও ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। ১৯৪৯ সালে পূর্ব পাকিস্তানের আওয়ামী মুসলিম লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বঙ্গবন্ধুর কোনো রাজনৈতিক দলের পদে অধিষ্ঠিত হয়ে যাত্রা শুরু হয়। ১৯৫৩ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে অধিষ্ঠিত ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন।

এই দলটিকে ১৯৫৫ সালে ধর্ম নিরপেক্ষ দল তৈরি করা হয়েছে এবং মুসলিম শব্দটি বাদ দেওয়া হয়েছে । কিন্তু বঙ্গবন্ধুর উদ্যোগেই। ১৯৬৬ সালে তার ৬ দফা ঘোষণা করেছিলেন এবং এই ৬ দফাকে তিনি আখ্যায়িত করেছিলেন বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে। এই ৬ দফার দাবি আদায়ের জন্য সারাদেশ উত্তাল হয়। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করা হয়, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। ৬ দফার ভিত্তিতেই ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ২২ ফেব্রুয়ারি তিনি মুক্তি পান।

২৩ ফেব্রুয়ারি সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি ডাকসুর ভিপি তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যখন সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলো, সামরিকজান্তা ইয়াহিয়া খানের ক্ষমতা হস্তান্তরের টালবাহানা শুরু হয়। তার প্রেক্ষিতেই তিনি দলের প্রধান হিসেবে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। বলা হয় যে দেশে কোনো দলের সরকার প্রতিষ্ঠিত না হয়েও তার কথামতো দেশ চলতো। লন্ডনের দৈনিক ইভেনিং স্ট্যান্ডার্ডস ১২ই মার্চ ১৯৭১ সালে লিখেছে, শেখ মুজিবর রহমানের ধানমন্ডির বাড়িটি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের অনুকরণে ইতোমধ্যেই ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিটের মতো পরিচিতি লাভ করেছে।

তখন কিন্তু বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বা সমপর্যায়ের কেউ না। দোসরা মার্চ থেকে পঁচিশে মার্চ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সবকিছু চলত এবং সবকিছুর নির্দেশ আসত ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি থেকে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু ভাষণ দিলেন, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। এরই প্রেক্ষিতে পঁচিশে মার্চ অপারেশন সার্চলাইট শুরু হয়। পশ্চিম পাকিস্তানিরা পৈশাচিক আক্রমণ শুরু করে। ছাব্বিশে মার্চ প্রত্যুষে পাকিস্তানি সেনা বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে। কিন্তু এর আগেই বঙ্গবন্ধু ইপিআরের ট্রান্সমিশনের মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ঘোষণাটি ছিলো, ‘এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা। … আজ হইতে বাংলাদেশ স্বাধীন।’ এ নিয়েও কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রকম বিকৃতির ঘটনা ঘটেছে। বঙ্গবন্ধুর পক্ষে অনেকে এই ঘোষণা দিয়েছে। এই ছোট বার্তাটি সমগ্র বাংলাদেশে টেলিপ্রিন্টারের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সাতাশে মার্চ বিকালে কালুরঘাট থেকে বেতার কেন্দ্র থেকে এই বার্তাটি পাঠ করেন। এখন এটিকেই তারা স্বাধীনতার ঘোষণা হিসেবে দাবি করে।

পরবর্তী পর্যায়ে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে আমরা যা অর্জন করেছিলাম পঁচাত্তরে সেটি আমরা হারিয়ে ফেলি, ১৫ আগস্ট জাতির জনককে হত্যার মধ্য দিয়ে। পরবর্তী পর্যায়ে সামরিকজান্তা জিয়াউর রহমান তখন একটি দল গঠনের সুযোগ পেলেন। তার উদ্দেশ্য ছিলো মৌলবাদী দলগুলোকে সুসংগঠিত করা এবং চালু করা। কোনো মৃত নেতার নাম নিয়ে দল গঠন করা যাবে না, যাতে করে বঙ্গবন্ধুর নামে কোনো দল গঠন না করা যায়। আওয়ামী লীগ বাধ্য হয়েই এই শর্ত মেনে রেজিস্ট্রেশন করেছিল। পরবর্তী পর্যায়ে নানা ষড়যন্ত্র চক্রান্তের মধ্যে দিয়েও আওয়ামী লীগকে বিভক্ত করা হয় এবং নানা দলে উপদলে ভাগ করা হয়। শেষ পর্যন্ত আসলে ১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হলেন। এটিকে বলা যেতে পারে, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনে আওয়ামী লীগের নতুন জন্ম এমনকি বাংলাদেশেরও নতুন জন্ম হয়েছিলো।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমেই কিন্তু অনেকগুলো জিনিসের মীমাংসা হয়ে গেছে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে সাম্য, স্বাধীনতা, মানবিক মূল্যবোধ, মানুষের অধিকার এবং ধর্মরিপেক্ষ রাষ্ট্র কায়েম হয়েছিলো। কিছু বিচ্যুতির কথা হয়তো বলতে পারেন। কিন্তু মুক্তিযদ্ধের যে চেতনা এখনো সেটি আওয়ামী লীগ বলিষ্ঠভাবেই ধারণ করে। বর্তমানে যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আছি গণতন্ত্র যদি মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলা হয়, মুুক্তিযুদ্ধের বিরোধী মতাদর্শ প্রচার করা সেই গণতন্ত্রকে আমি গণতন্ত্র বলতে চাই না। সকল দেশের উন্নয়ন অগ্রগতি নিয়ে হয়তো বিতর্ক থাকতে পারে কিন্তু এই দেশটি যে লক্ষ্য নিয়ে স্বাধীন হয়েছিলো দেশটি সবার হবে কোনো ব্যক্তি গোষ্ঠী বা ধর্মের হবে না, কোনো ভেদাভেদ থাকবে না। বিশেষ করে ধর্মীয় গোড়ামি থেকে বেরিয়ে একটি উদার ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র আমরা চেয়েছিলাম, এই ধারার পক্ষে আমাদের সবাইকে আসতে হবে। আওয়ামী লীগ এই ধারার প্রধান দল হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের যে সীমাবদ্ধতা আছে, গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার বাঁধা আছে সেগুলো দূর হবে।

প্রতিহিংসাপরায়ণ রাজনীতির বাইরে গিয়ে সবাইকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় কাজ করতে হবে। সামগ্রিক জাতি হিসেবে এগিয়ে যাওয়ার জন্যে ধ্বংসাত্মক রাজনৈতিক পদ্ধতি পরিহার করতে হবে। উন্ন্য়ন কৌশলে ভিন্নমত থাকতে পারে, কিন্তু আদর্শ মুক্তিযুদ্ধের হলে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র আমরা দেখতে পাবো। লেখক : অধ্যাপক, সাবেক উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ব বিদ্যালয়

 

সর্বাধিক পঠিত