প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

করোনায় অপহরণেও ঊর্ধ্বগতি

নিউজ ডেস্ক: কুমিল্লার মুরাদনগরে ঘটনাটি ঘটে গত ২৯ মার্চ। মুক্তিপণের ৫০ লাখ টাকা না পেয়ে আবদুর রহমান নামের পাঁচ বছরের একটি শিশুকে হত্যা করে তার আপন ফুফা! অপহরণের ৩৮ দিন পর আসামিদের দেওয়া তথ্য মতে মাটি খুঁড়ে শিশুটির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। আরেকটি ঘটনা, গত ২৩ জানুয়ারি গাজীপুরের গাছা এলাকায় নবম শ্রেণির ছাত্র তানভীর হোসেন সিয়ামকে তুলে নিয়ে ফোনে এক লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। পুলিশ পরে সিয়ামকে উদ্ধার এবং ছয় অপহরণকারীকে গ্রেপ্তার করে। গাজীপুর ডিবির পরিদর্শক এ কে এম কাওসার চৌধুরী জানান, চক্রটি গাজীপুরে ১৭টি ঘটনা ঘটায়। ঢাকা, নরসিংদী, শেরপুর, মুন্সীগঞ্জ ও ময়মনসিংহে আছে একই চক্র। তারা স্কুল বা কোচিংগামী শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে।

এমন ঘটনা ঘটছে প্রায়ই। এসব ঘটনার শিকার বেশির ভাগই শিশু। পরিবারের কাছে মুক্তিপণ আদায় করার চেষ্টা করা হলেও হত্যা করা হচ্ছে শিশুটিকে। তবে প্রাপ্তবয়স্কদের হত্যা করার হার কম। ভুক্তভোগীরা বলছেন, দ্রুত উদ্ধারে অভিযান না হওয়ায় মেরে ফেলার ঘটনা ঘটছে এবং মুক্তিপণ আদায় চলছে। নিরাপত্তার শঙ্কায় দ্রুত পুলিশের কাছে যায় না অপহৃতের পরিবার তবে অভিযোগ পেলে তদন্তে নামে পুলিশ ও র‌্যাব।

kalerkanthoবাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের (বিএসএএফ) পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সাত বছরে শিশু অপহরণ বেড়েছে তিন গুণ। ২০১২ সালে অপহরণের শিকার হয় ৬৭ শিশু এবং ২০১৯ সালে ১৮৭ শিশু। ২০২০ সালের করোনাকালে অপহরণের শিকার হয় ১১৫ শিশু।

অপরাধ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, করোনা মহামারির এই সময়ে ছিনতাই, ডাকাতি, চুরি, দস্যুতাসহ প্রচলিত অপরাধ কমে এলেও অপহরণের ঘটনা তুলনামূলক বেড়েছে। গণমাধ্যমের খবর, পুলিশ ও র‌্যাবের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে চার শতাধিক অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। এই সময়কালে ১১৫টি শিশুকে অপহরণ করা হয়। আর মুক্তিপণ দাবির পর ৩০টি শিশু হত্যার শিকার হয়েছে।

পুলিশের সূত্র জানায়, অনেক ঘটনায় ছেলে-মেয়ে প্রেম করে পালিয়ে গেলেও অভিভাবকরা অপহরণ মামলা করেন। এসব ঘটনা পরে মীমাংসাও হয়ে যায়। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত টাকা লাভের আশায় অপহরণে ঝুঁকছে অনেকে। করোনার দুর্যোগকালে এই অপরাধ তাই বাড়ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অ্যান্টিকিডন্যাপিং টিম থাকলেও দেশে পুলিশে এ ধরনের ইউনিট নেই। অপহরণ কমাতে বিশেষ টিমের দ্রুত অভিযান প্রয়োজন।

র‌্যাবের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের তিন মাসে ৫৯টি অপহরণের ঘটনায় অভিযান চালিয়েছে সংস্থাটি। জঙ্গি, মানবপাচার, হত্যা, প্রতারণা, ধর্ষণের চেয়ে বেশি এসেছে অপহরণের অভিযোগ। ২৮ নারী, ২৪ পুরুষ ও আট শিশুকে উদ্ধার এবং একজনের লাশ উদ্ধার করে র‌্যাব। গত বছর ১৪৫টি ঘটনায় অভিযান চালিয়ে ১৮৫ জনকে উদ্ধার কর হয়। একটি লাশ উদ্ধার করা হয়।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক বলেন, মূলত টাকা পাওয়ার লোভ থেকেই অপহরণ করা হয়। পারিবারিক বা সামাজিক বিরোধ থেকেও প্রভাব দেখাতে অপহরণ করা হয়ে থাকে। আর শিশুদের মেরে ফেলার বিষয়টি অপরাধের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব থেকে হয়। শিশুরা সাধারণত কান্নাকাটি করে। বড়রা কৌশলে চুপ থাকে, সমঝোতায় যায়। তাই ঝামেলা থেকে রেহাই পেতে বা রেগে গিয়ে শিশুদের হত্যা করে অপহরণকারীরা।

ঢাকা মহানগর ডিবি পুলিশ জানুয়ারি মাসে ধারাবাহিক অভিযানে আটজনকে গ্রেপ্তার করে। বিমানবন্দর, উত্তরা, দক্ষিণখান, উত্তরখান, টঙ্গী এলাকায় কয়েকটি চক্র এই অপকর্ম করছে। ডিবির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, ‘অপহরণের অভিযোগ পেলেই ডিবি পুলিশ তদন্ত করে। আমাদের অভিযানে অনেক চক্র ধরা পড়ছে। ভুক্তভোগীদের দ্রুত পুলিশের কাছে আসতে হবে।’

সম্প্রতি ঢাকার উপকণ্ঠ গাজীপুর, টঙ্গী, সাভার ও আশুলিয়ায় শিশু অপহরণ ও হত্যা বেড়েছে। গত ২০ ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের পূর্ব কলমেশ্বর থেকে তিন বছরের শিশু নিহাদকে অপহরণ করা হয়। তিন দিন পর শিশুটির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। গত ৯ মার্চ একই এলাকা থেকে শিশু সুমাইয়া আক্তার সুমু ওরফে রুবা অপহৃত হয়। শিশুটির বাবার কাছে মোবাইল ফোনে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে অপহরণকারীরা। এই দুই ঘটনার পর ১৯ মার্চ আকবর ও আনোয়ার নামে দুই খালাতো ভাইকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। জিএমপির উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ ইলতুৎ মিশ জানান, কান্নাকাটি করায় এবং ধরা পড়ার ভয়ে রুবাকেও হত্যা করে লাশ পুবাইলের বালু নদে ফেলে দেওয়া হয়। – কালের কণ্ঠ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত