প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে নতুন প্রণোদনা প্যাকেজ: আড়াই হাজার টাকা করে পাবে ৫০ লাখ পরিবার

নিউজ ডেস্ক: মহামারীর দ্বিতীয় প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে আনতে কঠোর লকডাউন শুরু হচ্ছে আজ। এ লকডাউনে ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র পরিবারগুলোকে সহায়তা দিতে নতুন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করতে যাচ্ছে সরকার। এ প্যাকেজের আওতায় ৫০ লাখ দরিদ্র পরিবারকে নগদ সহায়তা হিসেবে আড়াই হাজার টাকা করে দেয়া হবে। ১ হাজার ২৫৮ কোটি টাকার নতুন এ প্রণোদনা প্যাকেজের ঘোষণা শিগগিরই আসতে পারে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রণোদনার অর্থ বিতরণ হবে গভর্নমেন্ট টু পাবলিক (জিটুপি) পদ্ধতিতে। এক্ষেত্রে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে সরাসরি উপকারভোগীদের কাছে অর্থ পাঠানো হবে।

এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রকোপ রোধে কঠোর লকডাউন ঘোষণা করেছে সরকার। এতে করে দিন এনে দিন খাওয়া পরিবারগুলোর আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তাই তাদের জীবনযাপন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। তাদের কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব করতে সরকার আবারো আড়াই হাজার টাকা করে নগদ সহায়তা দেবে।

এর আগে গত বছরও করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য সমান অংকের প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছিল। যদিও এর পুরোটা বণ্টন করা যায়নি। এ বিষয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, গত বছর করোনা শুরুর পরই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত অথচ অন্য কোনো সরকারি সহায়তা পায়নি এমন ৫০ হাজার পরিবারকে আড়াই হাজার করে টাকা দেয়া শুরু হয়। এর আওতায় এ পর্যন্ত ৩৬ লাখ ৭ হাজার ৮৭২ পরিবারের কাছে টাকা পৌঁছানো হয়েছে। এমএফএস সেবাদাতাদের মাধ্যমে উপকারভোগীদের মোবাইল নম্বরে টাকা দেয়া হয়েছে। এভাবে শেষ পর্যন্ত ৮১১ কোটি টাকা বিতরণ করা সম্ভব হয়েছে। তালিকায় ত্রুটি ও মোবাইল নম্বর অকার্যকর থাকায় ৪৪৭ কোটি টাকা দিতে পারেনি সরকার। আগেরবার যেসব পরিবার নগদ সহায়তা পেয়েছে, সেগুলোর তালিকা অর্থ মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। এ তালিকাসহ মোট ৫০ লাখ গরিব পরিবারকে এ টাকা দেয়া হবে। মোবাইল ব্যাংকিং সার্ভিস ফি যোগ করে এতে সরকারের মোট ব্যয় হবে ১ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম বলেন, লকডাউন শুরু হলে এসব দরিদ্র পরিবারের আয়-রোজগার থাকে না। আবার যারা অপ্রাতিষ্ঠানিক চাকরি করে তাদেরও কর্মসংস্থান থাকে না। তাদের সহায়তা না করলে পরিবারগুলো অত্যন্ত দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে যাবে। এ কারণে লকডাউনে এ প্রণোদনা প্যাকেজ সময়োচিত।

তিনি আরো বলেন, তবে প্রণোদনা প্যাকেজের উপকারভোগীদের তালিকা তৈরিতে স্বচ্ছতা আনতে হবে। আমাদের দেশে এসব তালিকা প্রস্তুতের সঙ্গে যুক্তরা স্বজনপ্রীতির পাশাপাশি দুর্নীতিতেও যুক্ত থাকে। স্বজনপ্রীতির কারণে অনেক সময় তালিকায় বেশ ধনাঢ্য ব্যক্তিদের নামও ঢুকিয়ে দেয়া হয়। আবার অনেক নাম দিয়ে দেয়া হয়, বাস্তবে যার কোনো অস্তিত্ব থাকে না। অস্তিত্বহীনদের টাকা জনপ্রতিনিধিরা নিজেরাই খেয়ে ফেলেন। এক্ষেত্রে প্রযুক্তির মাধ্যমে একটি নির্ভেজাল তালিকা তৈরি করা সম্ভব। ভারতসহ বিভিন্ন দেশ দুর্নীতিমুক্ত এ ধরনের তালিকা করেছে। তাদের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা একটি গ্রহণযোগ্য তালিকা করতে পারি।

৫০ লাখ দরিদ্র পরিবারের মধ্যে নগদ সহায়তা বিতরণের এ কার্যক্রম প্রথমবারের মতো শুরু হয় গত বছরের মে মাসে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। এর আগে দেশের বিভিন্ন জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), ইউনিয়ন

পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা মিলে ক্ষতিগ্রস্ত ৫০ লাখ পরিবারের তালিকা তৈরি করেন। অর্থ বিতরণ শুরুর পর দেখা যায়, তালিকায় অনেক ত্রুটি রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবস্থাপন্ন ও সচ্ছল পরিবারকেও এ তালিকার অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ পাওয়া যায়।

তালিকা যাচাই করতে গিয়ে এ অনিয়ম ধরা পড়ে বলে অর্থ বিভাগের গত বছরের আগস্টে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়। এরপর ৫০ লাখের তালিকা থেকে ১৪ লাখ ৩৩ হাজার পরিবারকে বাদ দেয় সরকার। এ তালিকা তৈরির সঙ্গে যুক্ত ছিল সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ। তাদের দেয়া তালিকা পরীক্ষা করে দেখা যায়, এতে অন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থেকে সুবিধা নেয়া পরিবার রয়েছে এক লাখের বেশি। একাধিকবার তালিকাভুক্ত হয়েছে প্রায় তিন লাখ পরিবার। আবার ৬ লাখ ৯০ হাজার ৪৬৪ পরিবারের অর্থগ্রহীতার জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) বিপরীতে নিবন্ধিত মোবাইল সিম ছিল না। এছাড়া সরকারের পেনশনভোগী, সরকারি কর্মচারী ও ৫ লাখ টাকার বেশি মূল্যের সঞ্চয়পত্রের মালিকরাও ছিলেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব অভিযোগের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে পরবর্তী প্রণোদনা প্যাকেজের তালিকায় আরো বেশি স্বচ্ছতা আনতে হবে। এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে কর্মরত সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোকে কাজে লাগিয়েও গ্রহণযোগ্য একটি তালিকা তৈরি করা সম্ভব।

এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা, পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী সভাপতি ও বেসরকারি সেবা সংস্থা ব্র্যাকের চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, উদ্দেশ্যটা ভালো ও প্রয়োজনীয়। কিন্তু উপকারভোগীর তালিকা তৈরিতে আমলা ও দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদদের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না। তাই তালিকা তৈরির প্রক্রিয়াটিকে ঢেলে সাজাতে হবে। এক্ষেত্রে আলোচনাভিত্তিক সমাধান সম্ভব। তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে তৃণমূল পর্যায়ে অনেক সংস্থা বা এনজিও কাজ করে, তাদের সহযোগিতা নেয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে নগর ও স্থানীয় সরকারের অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে এসবের সহযোগিতা নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য তালিকা প্রণয়ন সম্ভব।

তিনি আরো বলেন, এক্ষেত্রে সারা দেশকে ঢালাওভাবে না রেখে যেসব অঞ্চল বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, বিশেষ করে নগর দরিদ্রদের অগ্রাধিকার দেয়া দরকার। মূল কথা হচ্ছে গতবার বাস্তবায়নে যে ভুলগুলো ছিল সেগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন তালিকা করে সঠিকভাবে বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য মনোভাব ও পদ্ধতিগত পরিবর্তনও দরকার।

অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বিকাশ, নগদ, রকেট ও শিউরক্যাশ—প্রধানত এ চার এমএফএস সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উপকারভোগীদের মধ্যে প্রণোদনার অর্থ বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে পৌঁছেছে প্রায় ৯০ হাজার পরিবারের কাছে। এ প্যাকেজ থেকে অর্থসহায়তা পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছে দিনমজুর, কৃষক, শ্রমিক, গৃহকর্মী, মোটর শ্রমিক। আশি-ঊর্ধ্ব ২৪ হাজার দরিদ্র বয়স্কও এ প্যাকেজের আওতায় টাকা পেয়েছেন। এছাড়া অন্যান্য পেশার মানুষও ছিল প্রায় সোয়া পাঁচ লাখ।

এ প্রসঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোহসীন বলেন, গত বছরে যে আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়েছিল, সেখানে প্রায় ৩৮ লাখ পরিবারের তালিকা রয়েছে। আবার যদি নতুন করে তালিকা করতে হয়, তাহলেও আমরা প্রস্তুত। সরকারের এ ধরনের উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা লকডাউনের মধ্যেও কাজ করে যাচ্ছেন। -বণিক বার্তা

সর্বাধিক পঠিত