প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রবীর বিকাশ সরকার :কুমিল্লার গৌরব বিপ্লবী অতীন্দ্রমোহন রায়

প্রবীর বিকাশ সরকার : প্রবাসে থাকি বলেই হয়তোবা কুমিল্লা আমার কাছে কেবলি স্মৃতির শহর। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে মাত্র ২৫টি বছর আমার কেটেছে এই শহরে। তারপর প্রবাসী হয়ে মাঝেমধ্যে ফিরেছি নাতিদীর্ঘ সময়ের জন্য। কৈশোর থেকে যৌবনের উষালগ্ন পর্যন্ত সিকি শতাব্দির স্মৃতিও আদৌ কম নয় আমার। এতো লিখেছি তারপরও কুমিল্লা নিয়ে লেখার যেন তল খুঁজে পাই না। সে এক আশ্চর্য ব্যাপার। আমার সেইসব লেখা নিয়ে একটি বই প্রকাশিত হওয়া দরকার। কেননা, সেইসব লেখায় রয়েছে বিস্তর অজানা তথ্য ও ইতিহাস। যা অনেকেরই কাছে নেই বললে চলে। সেসব যে মূল্যবান তথ্য-উপাত্ত কুমিল্লার সমকালীন সংস্কৃতির ইতিহাস নির্মাণে তা বলাই বাহুল্য। বয়স দুম দুম চলন্ত ঘোড়ার মতো বেড়েই চলেছে। আর কতো যে স্মৃতিময় পথঘাট পেরিয়ে চলেছি সে একমাত্র আমিই জানি। স্মৃতির পেটরা খুললেই কতোকিছু যে বেরিয়ে পড়ে তার হিসেব নেই। আজ আবার চোখের সামনে উঠে এলো এই বিলুপ্ত কাগজটি। ‘পত্রিকা’ নামক এটা এখন কেবলি দুর্লভ একটি কাগজ। সাহিত্য-শিল্পবিষয়ক ট্যাবলয়েড। সম্পাদক আজিজুর রহমান মোমিন। সংযুক্ত সম্পাদক মমিনুল ইসলাম শাহাগীর ও পাখী রহমান। চন্দনা চাকমা সজনী কর্তৃক ৩০, স্টেডিয়াম, কুমিল্লা থেকে প্রকাশিত। মুদ্রণ সিংহ প্রেস, বাদুরতলা। প্রকাশকাল মে-জুন ১৯৭৯। প্রথমবর্ষ প্রথম সংখ্যা। এরপর আর প্রকাশিত হয়েছিল কি না জানি না। তখন আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র। প্রচ্ছদ প্রতিবেদন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে ব্রিটিশ-ভারতের স্বদেশি যুগের দুর্ধর্ষ, দুঃসাহসী বিপ্লবী অতীন্দ্রমোহন রায় চৌধুরীকে। জীবিতকালেই যিনি ছিলেন জীবন্ত কিংবদন্তিতুল্য এক পুরুষ। কুমিল্লার কচি-কাঁচার মেলাসহ শহরের শিশু-কিশোর-কিশোরী-তরুণ-তরুণীদের প্রিয় অতীনদাদু। আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সর্বশেষ ছোট্ট উপন্যাস ‘চার অধ্যায়’ (১৯৩৪) এর নায়ক বিপ্লবী অতীনই হচ্ছেন এই অতীন্দ্রমোহন রায়। আর নায়িকা এলা তিনিও কুমিল্লারই মেয়ে। একসময় মহেশাঙ্গনে যাতায়াত ছিল তার, সেই গত শতাব্দির বিশ-ত্রিশ-চল্লিশ দশকের কথা। বয়স হলে পরে অনেকেরই কাছে এলা মাসিমা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু তার সচিত্র সন্ধান পাইনি আজও আমি। খুঁজেই চলেছি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন ১৯২৬ সালে কুমিল্লায় আসেন এবং মহেশাঙ্গনে সংবর্ধিত হন তখন বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সংবর্ধনার সেই ফলকটি আমি রামমালা গ্রন্থাগারে একদিন দেখেছিলাম ২০১৩ সালে।

সেই সংবর্ধনা সভায় সম্ভবত তরুণী ‘এলা’ এবং বিপ্লবী অতীন্দ্রমোহন রায় উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে কি কোনো হৃদয়ঘটিত সম্পর্ক ছিল? রবীন্দ্রনাথ অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে কি তাদের সেই গোপন সম্পর্কটাকে অবলোকন করেছিলেন? আর তাই প্রতিচ্ছবি উঠে এসেছে ‘চার অধ্যায়’ উপন্যাসে? সেই ইতিহাসটা খুঁজে চলেছি। খুঁজে পাচ্ছি না, যেমন খুঁজে পাচ্ছি না ‘এলা’র পরিচিতি। ২০১২-১৩ সালের দিকে একদিন আমি সাক্ষাৎ করতে যাই বাগিচাগাঁওস্থ কুমিল্লা জজ কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী আমার বাবার ঘনিষ্ঠ সুহৃদ অজিত কুমার চৌধুরীর বাড়িতে। কুমিল্লায় ফিরলেই তার সঙ্গে একবার না একবার দেখা করে গল্পসল্প করি। প্রবীণ কুমিল্লাবাসী হিসেবে অনেক তথ্য, ইতিহাস তিনি জানেন এবং সমকালীন বহু ঘটনার তিনি সাক্ষী। কিন্তু বড়বেশি নিভৃতচারী এই মানুষটির পাণ্ডিত্যও আদৌ কম নয়। তার সঙ্গে কথা না বললে সেটা অনুধাবন করা কঠিন। তার সঙ্গে বসলে কীভাবে যে সময় অতিবাহিত হয়ে যায় টেরই পাওয়া যায় না। কুমিল্লা নামক প্রাচীন এই শহরটির অলিতেগলিতে তার বিচরণ এবং বিস্তর অভিজ্ঞতার এক জীবন্ত জাদুঘরও বলা যায় তাকে। সেই সাক্ষাতের সময় কথা উঠেছিল বিপ্লবী অতীন্দ্রমোহন রায় চৌধুরী (১৮৯৪-১৯৭৯) সম্পর্কে। সেইদিনই আমি প্রথম জেনেছিলাম যে, তিনি তার রক্তের আত্মীয়, আপন ভাগিনা। আমি চমকেই উঠেছিলাম। আমার বাবাও এই শহরের পুরনো মানুষ কিন্তু কোনোদিন আমাকে বলেনি। আলাপকালে তিনি পুরনো ফাইলপত্র খুলে আমাকে এই জরাজীর্ণ কাগজটি এবং একটি দুর্লভ আলোকচিত্র দিলেন। আলোকচিত্রটি আর কারো নয়, বিপ্লবী অতীন রায়ের তরুণকালের।
অজিতকাকা বললেন, পড়ে দেখো। সম্ভব হলে কিছু লেখো, নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে। তুমি তো ইতিহাসের ছাত্র এবং লেখক ও সাংবাদিক তোমারই দায়িত্ব এটা। কাগজটি এবং ছবিটি পেয়ে কী যে আনন্দ হয়েছিল আমার ভাষায় বোঝানো কষ্টকর। কাগজটি পাঠ করে অনেক তথ্য বিপ্লবী অতীন্দ্রমোহন সম্পর্কে জেনেছিলাম এবং সম্ভবত সাপ্তাহিক ‘সাপ্তাহিক’ ম্যাগাজিনে একটি ফিচারও লিখেছিলাম। এরপর ফেসবুকে আরেকবার আমি একটি বিবৃতি দিলে পরে আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু ও সহচর আহাম্মদ আলী মিটন, যে বাগিচাগাঁও এরই বাসিন্দা, আমাকে জানালো যে, অতীনদাদুকে ১৯৭১ সালেই পাক আর্মিরা হত্যা করার চেষ্টা করেছিল, তাকে বাঁচিয়েছিলেন তারই প্রতিবেশী আহাম্মদ আলীর বড়বোন নাজনীন। যাকে অতীতদাদু খুব স্নেহ করতেন। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য। আমাদের সম্প্রীতি ও স্বদেশপ্রেমের এক অনন্য উদাহরণ বলতেই হবে। না-জানার কারণে কতো তথ্য ও ঘটনা যে আমাদের অলক্ষ্যে হারিয়ে যায় এই ঘটনাটিই এর উজ্জ্বল প্রমাণ। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, এই একুশ শতকেও উপমহাদেশখ্যাত কুমিল্লার মতো একটি প্রাচীন শহরে স্থানীয় কোনো আর্কাইভস বা মহাফেজখানা গড়ে উঠল না। মেধাহীন, পশ্চাৎপদ নিজেদের দিকে ঝোল টানাই আমাদের বড় পরিচয় আজ। টোকিও।

নির্বাচিত মন্তব্য : ফখরুল রোচি- দাদুর সাথে অনেক স্মৃতি! একজন সাহসী, রূপান্তরবাদী, সংস্কারকামী, সমাজবাদী মানুষ। কুমিল্লা পৌরসভার সবচেয়ে কার্যকরী প্রশাসক। ওনার নিজের বানানো আদা, লবঙ্গ, এলাচদানা আর জৈষ্ঠমধু মেশানো চা অমৃতসম।ক’জন আর মনে রাখে সৃষ্টিশীল সাহসী মানুষদের, কারন ওনারা নির্বিরোধী নন! অনন্তে শান্তিতে থাকুন দাদু। ফেসবুক থেকে

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত