প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ড. হাসান মাহমুদ : উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে গবেষণায় গলদটা কোথায়?

ড. হাসান মাহমুদ : গত ১ সেপ্টেম্বরে টাইমস হায়ার এডুকেশনের বৈশ্বিক র্যাংকিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান বিগত বছরগুলোর ধারাবাহিকতায় আবারো পিছিয়ে পড়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ গণমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা এবং বিতর্ক দেখা গেছে। টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা ক্ষেত্রে অবদানের জন্য ১০০-এর মধ্যে পেয়েছে মাত্র ৭ দশমিক ৭, যা আগের বছরে প্রাপ্ত নম্বরের (৮.৮) চেয়ে কম। অর্থাৎ গবেষণা খাতের অবস্থা মৃৃতপ্রায় এবং তা উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে। এই হতাশাজনক অবস্থা দেশীয় সংস্থার অনুসন্ধানেও পাওয়া যায়। যেমন ২০১৭ সালের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের সাতটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি গবেষণাও পরিচালিত হয়নি। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বরাদ্দ গবেষণা বাজেটের ৪০ শতাংশ অব্যবহূত থেকে গেছে। রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি, অভ্যন্তরীণ দলাদলি, প্রয়োজনীয় আর্থিক ও অন্যান্য সহযোগিতার অভাব ইত্যাদিকে গবেষণার এরূপ অগস্ত্যযাত্রার কারণ হিসেবে সাধারণভাবে মনে করলেও সুনির্দিষ্টভাবে কে বা কারা এসবের জন্য সরাসরি দায়ী, তা ধোঁয়াশার মধ্যেই থেকে যায়। ফলে এ অবস্থার উন্নয়নের জন্য কার্যকরী কোনো পদক্ষেপও নেয়া হয় না। এ নিবন্ধে আমি গবেষণার বেহালের একটা সুনির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করছি।

সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন ২০২০-২১ সালের জন্য পোস্ট ডক্টরাল ফেলোশিপের জন্য মনোনীত প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করেছে। দেখা যাচ্ছে, এ তালিকার সবাই কোনো না কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। এই নিয়ে খুব বেশি উচ্চবাচ্য করতে দেখলাম না পত্রিকায় বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। অথচ উচ্চতর শিক্ষা ক্ষেত্রে গবেষণায় সর্বোচ্চ জাতীয় সংস্থা কর্তৃক প্রদত্ত এই ফেলোশিপ নিয়ে বেশ উৎসাহ-উদ্দীপনা আশা করেছিলাম। বিশেষ করে জাতীয় প্রচারমাধ্যমে এশিয়ার সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বাংলাদেশী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্রমাবনতির পরিপ্রেক্ষিতে এই ফেলোশিপ নিয়ে আলাপ হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল।

আমি নিজে শিক্ষকতায় এসেছি ২০১৫ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করার পর। আজ থেকে পাঁচ বছর হয়ে কয়েক মাস বেশি। সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ উল্লেখ করলাম একটা বিশেষ কারণে। আর তা হলো এই যে পোস্ট ডক্টরাল ফেলোশিপে আবেদন করার যোগ্যতা আমেরিকাসহ অন্যান্য দেশে পিএইচডি শেষ করার পাঁচ বছরের মধ্যে। এটা বিজ্ঞান, কলা ও সামাজিক বিজ্ঞানের প্রায় সব বিষয়ের জন্য প্রযোজ্য। পোস্ট ডক্টরাল ফেলোশিপ শেষ হলে তারা সহকারী অধ্যাপক হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে অথবা বিশেষায়িত গবেষণা প্রতিষ্ঠানে সমপর্যায়ের পদে যোগ দেন। গত বছর পর্যন্ত আমি আমেরিকা ও কানাডার সুপরিচিত কিছু পোস্ট ডক্টরাল ফেলোশিপের দিকে লক্ষ রেখেছিলাম। এ বছর থেকে সেসব দেখা ছেড়ে দিতে হলো। কারণ আমি আর পোস্ট ডক্টরাল ফেলোশিপের আবেদনের যোগ্য নই।

গত বছর পিএইচডি অর্জন করা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পরিচিত সহকারী অধ্যাপককে আমি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের পোস্ট ডক্টরাল ফেলোশিপে আবেদন করতে উৎসাহিত করেছিলাম। তার প্রকাশনার সংখ্যা ও মানের ভিত্তিতে আমার বিশ্বাস ছিল যে তাকে মনোনীতদের চূড়ান্ত তালিকায় আরো কিছু সম্ভাবনাময় সহকারী বা সহযোগী অধ্যাপকের সঙ্গে দেখতে পাব। কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম যে মনোনীত সবাই অধ্যাপক! দু-একজন পিএইচডি অর্জন করেছেন প্রায় ২০ বছর আগে, যাদের এখন পোস্ট ডক্টরাল ফেলোদের গাইড বা সুপারভাইজার হওয়ার কথা।

পোস্ট ডক্টরাল ফেলোশিপ আসলে কী? আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের মতে, A postdoctoral fellowship is a temporary period of mentored or supervised training to acquire the skills necessary for your chosen career path. অর্থাৎ এই ফেলোশিপ উচ্চশিক্ষা বা গবেষণা ক্ষেত্রে পছন্দের পেশার জন্য আবশ্যিক দক্ষতা অর্জনের লক্ষ্যে একজন তত্ত্বাবধায়ক বা সুপারভাইজারের অধীনে স্বল্পকালীন একটা পদ। স্বভাবতই এ পদে মনোনীত হয় সদ্য পিএইচডি সমাপ্ত করা বা সহকারী অধ্যাপকের পদে থাকা জুনিয়র স্কলার হিসেবে বিবেচিত প্রার্থীরা। তাদেরকে উচ্চতর গবেষণায় সহায়তাদানের মাধ্যমে চৌকস করে গড়ে তোলাই এর মূল লক্ষ্য।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের প্রকাশিত পোস্ট ডক্টরাল ফেলোদের এই তালিকা উচ্চশিক্ষায় নেতৃত্বস্থানীয়দের প্রশাসনিক অদক্ষতা ও দুর্নীতিকে প্রকটভাবে প্রকাশ করে। দুটি বিষয়ের বিবেচনায় আমি এমনটি মনে করি—

প্রথমত, চূড়ান্তভাবে মনোনীত এসব ফেলোর সবাই অধ্যাপক এবং কমপক্ষে এক যুগ আগে তারা পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে যে এত দিনেও তারা নিজ নিজ পেশায় সাফল্যের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা কেন অর্জন করতে পারেননি, যেজন্য তাদেরকে পোস্ট ডক্টরাল ফেলোশিপের পদ দিতে হবে? আর সেই দক্ষতা না-থাকার জন্যই যেহেতু তাদেরকে এই ফেলোশিপ দেয়া হচ্ছে, তাহলে কীভাবে তারা পদোন্নতি পেয়ে অধ্যাপক পদে আসীন হলেন?

দ্বিতীয়ত, প্রকাশিত তালিকায় মনোনীতদের মধ্যে কয়েকজন গবেষক ও অধ্যাপক হিসেবে বেশ সুপরিচিত। জাতীয় দৈনিকে গবেষণামূলক লেখালেখি এবং টেলিভিশনের টকশোয় বিশেষজ্ঞ হিসেবে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তারা নিজ নিজ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। আরো অবাক করা বিষয় হলো, এদের মধ্যে বেশ কয়েকজন নিয়মিতভাবে গবেষণা সুপারভাইজার হিসেবে এমফিল ও পিএইচডি শিক্ষার্থীদের ভর্তি করেন এবং ডিগ্রি প্রদান করেন। অর্থাৎ মঞ্জুরী কমিশনের এই পোস্ট ডক্টরাল ফেলোশিপের সুযোগটা তারা নিজেরাই কুক্ষিগত করে সম্ভাবনাময় জুনিয়র স্কলারদের বঞ্চিত করলেন মাত্র।

২. বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে বিদ্যমান নানা সমস্যার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা হলো গবেষণায়। অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ক্ষেত্রে অবস্থা এতটাই শোচনীয় যে তারা বার্ষিক বাজেটের যে সামান্য কিছু টাকা গবেষণায় বরাদ্দ করে, তা-ও খরচ করতে পারে না। অবস্থাটা আরো ভালোভাবে বোঝা যায় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তুলনা করলে। প্রথম সারির সব প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার পদে থাকতে হলে ক্লাসে পড়ানোর পাশাপাশি গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক পিয়ার রিভিউ জার্নালে প্রকাশনা বাধ্যতামূলক। অথচ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এসবের কোনো প্রয়োজনই হয় না। একবার প্রভাষক পদে যোগ দিতে পারলে কালক্রমে অধ্যাপক পর্যন্ত পদোন্নতি পাওয়া যায় কোনো গবেষণা না করেই। কিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কতিপয় বিভাগে যে দু-চারজন গবেষক যাদের দেখা যায়, তারা নিজেদের গরজেই গবেষণা ও প্রকাশনা করেন।

উন্নত বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা পদের নিয়মিত মূল্যায়ন হয়। পাঠদানে দক্ষতার মূল্যায়নে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং সেই সঙ্গে ছাত্রছাত্রীরাও সরাসরি অংশগ্রহণ করে। পাশাপাশি অধ্যাপকের গবেষণা ও প্রকাশনার ভিত্তিতেও মূল্যায়ন হয়। এর সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনিক এবং পেশাগত নানা ক্ষেত্রে সক্রিয় অংশগ্রহণ। আমার বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় নর্থওয়েস্টার্নে এই মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার ৪০ শতাংশ ক্লাসে পড়ানোয়, ৫০ শতাংশ গবেষণা ও প্রকাশনায় এবং বাকি ১০ শতাংশ পেশাগত নানা দায়িত্ব পালনের জন্য থাকে। বার্ষিক মূল্যায়নের প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে অধ্যাপকদের বোনাস ও পদোন্নতি নির্ধারিত হয়। কারো প্রাপ্ত নম্বর গ্রহণযোগ্য মানের নিচে হলে তাকে অভিজ্ঞ এবং জ্যেষ্ঠ একজন অধ্যাপকের তত্ত্বাবধানে প্রথমত গবেষণা ও প্রকাশনায় সহায়তা করা হয়।

গবেষণাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার জন্য প্রধানতম যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনার যুক্তি হলো, অধ্যাপকরা নতুন নতুন জ্ঞান আবিষ্কার করেন এবং বিদ্যমান জ্ঞানকে যাচাই-বাছাই করে জ্ঞানের অগ্রগতি নিশ্চিত করেন। আর গবেষণায় রত থাকলে ক্লাসে পড়ানোও অনেক বেশি আকর্ষণীয় এবং বাস্তবসম্মত হয়। আমার নিজের অভিজ্ঞতা দিয়েই এ ধারণার সত্যতা উপলব্ধি করি। শুধু ক্লাসে পড়ানোই নয়, গবেষণা করতে থাকলে অধ্যাপকের চিন্তা-ধারণাও চলমান বাস্তবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উদ্ভূত সমস্যার যথাযথ সমাধান প্রস্তাব করা সম্ভব হয়। উদাহরণস্বরূপ বাংলাদেশে নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের কথা বলা যায়। এ বিভাগের প্রত্যেক শিক্ষক কোনো না কোনো গবেষণায় নিয়োজিত। ফলে তারা নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। পাশাপাশি এ বিভাগের শিক্ষকরা জাতীয় দৈনিকে যত নিয়মিতভাবে নিবন্ধ প্রকাশ করেন, তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সামাজিক বিজ্ঞানের সব বিভাগের শিক্ষকদের দ্বারা প্রকাশিত নিবন্ধের মোট সংখ্যার চেয়েও বেশি!

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দক্ষতা বা যোগ্যতার ঘাটতি নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে গবেষণাকে যথাযথ গুরুত্ব না দেয়া এবং সেই সঙ্গে নেতৃত্বের উচ্চপর্যায়ে অদক্ষতা ও দুর্নীতির জন্যই উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে গবেষণার অবস্থা ক্রমে ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে এবং পরবর্তী সময়ে সমাজবিজ্ঞানে সারা বিশ্বে নামকরা একটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করে আরেকটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচ বছর ধরে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই আমার এই দাবি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রাবস্থায় দেখেছি আমাদের কয়েকজন শিক্ষক আমেরিকা, কানাডা আর অস্ট্রেলিয়া থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে ফিরে এসেছেন। নিঃসন্দেহে তারা গবেষণার যথাযথ ট্রেনিং পেয়েছেন এবং যথেষ্ট যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে তবেই সেই ডিগ্রি অর্জন করেছেন। কিন্তু তাদের প্রায় কাউকেই দেশে এসে সেই দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা প্রয়োগের মাধ্যমে নতুন কোনো গবেষণা করতে দেখা যায় না। বিদেশে নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণায় উচ্চতর ট্রেনিং নিয়ে দেশে ফেরার পর কেন তারা সেই দক্ষকতাকে বাস্তবে প্রয়োগ করেন না?

সামাজিক ও গণমাধ্যমের বিতর্কে প্রায়ই দেখি যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অলসতার জন্য গবেষণা করেন না। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তাদের গবেষণায় উৎসাহদানের অভাবকেও দায়ী করা হয়। কিন্তু আমি মনে করি, এসবের চেয়েও বেশি দায়ী উচ্চশিক্ষায় নেতৃস্থানীয়দের অদক্ষতা ও দুর্নীতি, যার সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের এই পোস্ট ডক্টরাল ফেলোশিপ।

সদ্য পিএইচডি অর্জন করা একজন সহকারী অধ্যাপক তার নিজ বিশেষায়ণে সবচেয়ে সাম্প্রতিক বিষয়গুলোয় পাঠ এবং গবেষণায় দক্ষতার ভিত্তিতে নতুন নতুন গবেষণা করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনাময়। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের দুজন অধ্যাপকের কথা, যারা পিএইচডি অর্জন করার তিন বছরের মধ্যে যতগুলো গবেষণা ও প্রবন্ধ আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশ করেছেন, তার সিকি ভাগও সমাজবিজ্ঞানের প্রখ্যাত অধ্যাপকরা তিন দশকেও করতে পারেননি। এসব সম্ভাবনাময় নবীন অধ্যাপকদের বাদ দিয়ে গবেষণায় সক্ষম হয় এমন সিনিয়র অধ্যাপকদের পোস্ট ডক্টরাল ফেলোশিপ দিলে একদিকে যেমন মানসম্মত গবেষণার সুযোগ সীমিত করা হয়, আরেকদিকে যোগ্য গবেষকদের নিরুৎসাহিত করা হয়। দুঃখজনক হলেও এ সত্যটা দেখলাম বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় অন্যতম সর্বোচ্চ প্রশাসনিক নেতৃত্বে থাকা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনে।

৩. ভাবছিলাম সমাধান নিয়ে। মনে হলো, দেশে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা শোধরাতে পারলে আলোচ্য সমস্যার সমাধান সহজ হবে। যেমন দেশে অনেকেই মনে করে যে পোস্ট ডক্টরাল একটা ডিগ্রি এবং এটা পিএইচডির চেয়েও বড়। আর সেজন্য আরো বেশি সম্মানের বিষয়। আদতে পোস্ট ডক্টরাল কোনো ডিগ্রিই নয়। উপরে যেমন উল্লেখ করেছি, এটা পিএইচডি শেষ করা আর অধ্যাপনার পদ পাওয়ার মাঝখানে ‘ঠেকা দেয়া’ একটা অস্থায়ী ও স্বল্পকালীন পর্বমাত্র। পিএইচডি শেষে ঈপ্সিত অধ্যাপনা বা গবেষণা সংস্থার পদ না পেলে সদ্য পিএইচডি সমাপ্ত করা স্কলার পোস্ট ডক্টরাল ফেলোশিপের পদে আবেদন করে এবং দুই কি তিন বছর নিবিড়ভাবে গবেষণা ও প্রকাশনার মাধ্যমে নিজেকে অধ্যাপনার পদের জন্য প্রস্তুত করে। অর্থাৎ হাতেগোনা কয়েকটা তীব্র প্রতিযোগিতামূলক পোস্ট ডক্টরাল ফেলোশিপ বাদে অধিকাংশই প্রকৃতপক্ষে সহকারী অধ্যাপকের পদের তুলনায় মর্যাদায় খাটো।

একইভাবে পোস্ট ডক্টরাল ফেলোশিপ সমাপ্ত করে সহকারী বা সহযোগী অধ্যাপকের পদের জন্য অথবা স্বনামধন্য গবেষণা সংস্থায় আবেদন করাটাই স্বাভাবিক রীতি। কাজেই পূর্ণকালীন অধ্যাপকের পদে থেকেও পোস্ট ডক্টরাল ফেলোশিপে আবেদন করাটা প্রকৃতপক্ষে সম্মানহানিকর। ওই পদে যোগদান করা তো রীতিমতো অকল্পনীয়। অর্থাৎ মঞ্জুরী কমিশনের এই পোস্ট ডক্টরাল ফেলোশিপ দিয়ে যেসব বর্ষীয়ান অধ্যাপককে সম্মানিত করা হলো বলে মনে করা হচ্ছে, আদতে তাদের অসম্মানই করা হয়েছে।

শিক্ষকদের মান-মর্যাদা নিয়ে নানা আলাপ-আলোচনা শুনি। এর বেশির ভাগই নেতিবাচক হলেও কিছু ইতিবাচক খবরও পাওয়া যায়। বিশেষ করে ফেসবুকে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ফোরামের মতো আরো কিছু পরিসরে শিক্ষকদের নতুন নতুন প্রকাশনার সংবাদ নিয়মিত দেখি। এদের সিংহভাগই নবীন অধ্যাপক। যেমন উপরে উল্লেখ করেছি, সদ্য পিএইচডি শেষ করা এবং পিএইচডি অধ্যয়নরত এসব নবীন অধ্যাপককে প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে গবেষণার যথাযথ সুযোগ দিতে হবে। কিন্তু কীভাবে তা সম্ভব হবে?

আমি মনে করি, শিক্ষা ক্ষেত্রে নেতৃত্বের স্থানে গবেষকদের নিয়োগ দিতে হবে। কারণ কেবল একজন দক্ষ গবেষকই উদীয়মান এবং সম্ভাবনাময় তারুণ্যকে উচ্চতর গবেষণায় আগ্রহী করতে পারবেন, সুপারভাইস করতে পারবেন, দিকনির্দেশনা দিতে পারবেন।

যে জানে সে-ই পারে। অতএব, মঞ্জুরী কমিশনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভিসি এবং অন্যান্য প্রশাসনিক পদে স্বীকৃত গবেষকদের নিয়োগ দেয়ার মাধ্যমেই কেবল সম্ভব দেশের উচ্চশিক্ষা গবেষণার অনিবার্য পতন রোধ করা।

ড. হাসান মাহমুদ: কাতারের নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক
সূত্র- বর্ণিকবার্তা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত