প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

স্বপ্না রেজা: মাস্ক গল্পগুচ্ছ

স্বপ্না রেজা:  গল্প-এক

হাসপাতালের করোনা ইউনিটের সামনে দাঁড়িয়ে এক ভদ্রলোক ফোনে কথা বলছেন। বামহাতে মাস্ক ধরা। ডান হাতে মোবাইল এবং সেটা ডান কানে ধরা। ভদ্রলোকের সামনে এসে দাঁড়ালেন একটি প্রাইভেট চ্যানেলের রিপোর্টার ক্যামেরাসহ। ভদ্রলোকের সেইদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। ফোনে কথা বলেই যাচ্ছেন। রিপোর্টার তার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বেশ কাছে এসে দাঁড়ালেন। ফোনে আলাপরত ভদ্রলোক রিপোর্টারকে দেখা মাত্রই বামহাতে ধরা মাস্ক দ্রুত পরতে চেষ্টা করলেন। রীতিমত ভীতসন্ত্রস্থ তিনি। অবস্থা দেখে রিপোর্টার প্রশ্ন করলেন,
ভাই, ভয় পেলেন ? আপনি করোনাকে নয় ক্যামেরাকে ভয় পান, তাই না ?
ভদ্রলোক লজ্জিত হলেন। না না বলে প্রশ্নটাকে উড়িয়ে দিলেন। মোবাইল সংযোগ কেটে দুইহাত দিয়ে সুস্থির হয়ে মাস্ক পরলেন। রীতিমতন করোনা সচেতন হয়ে উঠা।

গল্প-দুই

হাসপাতালের করোনা ইউনিট। গায়ের সাথে গা মিশে গেছে দর্শণার্থীদের। কেউ হেঁটে যাচ্ছেন। কেউ কেউ সিড়িতে লাইন ধরে বসে। সিড়িতে বসা গল্পরত কারোর মুখে মাস্ক নেই। গল্পের বিষয়বস্তু নিখাদ আনন্দের সেটা তাদের মুখায়ব দেখে মনে হচ্ছিল। একটি প্রাইভেট চ্যানেলের রিপোর্টার তাদের কাছে আসলেন। প্রশ্ন করলেন,
হ্যালো ভাই, করোনা ইউনিটের ভেতর বসে গল্প করছেন, মুখে মাস্ক নেই কেনো ?
ওদের মাঝ থেকে একজন বলে উঠলেন, এতোক্ষণ পরেছিলাম। এই তো খুলে রাখলাম ভাই। কতোক্ষণ পওে ্রথাকা যায়। রিপোর্টার প্রশ্ন করলেন,
কোথায় রেখেছেন মাস্ক ?
ওদের একজন বেশ বিরক্ত হলেন প্রশ্নে। বললেন,
সরি ভাই, আপনি আপনার কাজ করুন !
আমি তো আমার কাজই করতে এসেছি। আপনারা মাস্ক পরছেন না সেই সংবাদই তো তুলে নিচ্ছি। মাস্ক কোথায় রেখেছেন, একটু বলবেন ? বিরক্তবোধ করা করা লোকটি জবাব দিলেন,
পকেটে আছে। সময় হলে পরবো। যান !

গল্প-তিন

রাস্তার পাশের ফুটপাতে বসা এক ফল বিক্রেতা। ক্রেতাদের সাথে তার কথাবার্তা, দর কষাকষি চলছে। মুখের মাস্ক লুঙ্গির কোঁচায় রাখা। খেয়াল করলো পুলিশ আসছে তার দিকে। ফলবিক্রেতা ফলের ঝুড়ি মাথায় নিয়ে হাঁটা শুরু করে। মাস্ক পরে থাকে রাস্তায়। পুলিশ বাঁশি বাজিয়ে তাকে থামায়। এতো পথচারী, ফেরিওয়ালার মাঝে তাকে থামতে বলার কারণ কী ভেবে ফলবিক্রেতা দিশেহারা। হৃদস্পন্দন বেড়ে গেছে ততক্ষণে।
কই যাও মিয়া ? মোটা স্বর পুলিশ সদস্যের।
সকাল থেকে এখনো পর্যন্ত পরিবারে বাজার করবার মতো ফল বিক্রয় করতে পারি নাই বাবা ! ফলবিক্রেতা তার অসহায়ত্বের কথা প্রকাশ করলেন। বুঝাতে চাইলেন পুলিশ সদস্যকে নজরানা দেবার সামর্থ আজ তার হয়নি। অবাক করে দিলেন ফলবিক্রেতাকে পুলিশ সদস্য,
করোনার চাইতেও ঘুষ শক্তিশালী তোমার কাছে ? মাস্ক কই ? পুলিশ সদস্যের কথায় হৃদয়ে ভালোবাসার ঢেউ জেগে ওঠে ফলবিক্রেতার। কী শুনছে সে, নিজের কানকেও বিশ^াস করতে পারছে না। স্নেহের সুরে বলেন,
ঐটা পরলে দম নিয়ে কথা বলতে পারিনা বাবা !

গল্প-চার

অভিজাত সুপারমল। কয়েকজন তরুণী কালারফুল মাস্ক খুঁজছেন। অথচ কারোর মুখে মাস্ক নেই। ড্রেসের সাথে তাদের ম্যাচিং মাস্ক চাই।
একজন সেলসম্যান তাদেরকে অনুরোধ করলেন মাস্ক পরতে। সবাই যেন আকাশ থেকে পরলেন। সাথে বিরক্ত হলেন। সমস্বরে বললেন,
আমরা তো মাস্ক কিনে পরতে এখানে এসেছি ! আমাদের ম্যাচিং মাস্ক চাই। এখন তো উইন্টার সিজন। মোটা কালারফুল মাস্ক দেখান ! অবশ্যই তা ডিফারেন্ট এবং লেটেস্ট হতে হবে !
সেলসম্যান আপত্তি করলেন মাস্ক পরা ছাড়া সুপারমলে তাদের অবস্থান নিয়ে। সুপারমলে তাদের পছন্দমত কিছুই নেই এমন ভাব প্রকাশ করে তরুণীর দল বেরিয়ে গেলো।

গল্প-পাঁচ

রমনা পার্ক। প্রেমিক-প্রেমিকা অবিচ্ছিন্ন অবস্থায় হেঁটে যাচ্ছে। অনেকটা দৃষ্টিকটু তাদের আচরণ। উন্মুক্ত অবস্থায় এমন দৃশ্য অনেকের কৌতুহল বাড়িয়ে দিয়েছে। পার্কের নিরাপত্তা বিধানে কর্তব্যরত পুলিশ বাধ্য হলেন দ্রুত পা চালিয়ে প্রেমিক-প্রেমিকার কাছে আসতে। জানতে চাইলেন,
আপনাদের পরিচয় ?
প্রেমিকের উত্তর, আমার গার্লফ্রেন্ড সে।
ঘরে বসে এসব করলে তো পারেন। পথেঘাটে কেনো ? উল্টো প্রেমিক জানতে চাইলেন, এমন কোন আইন আছে কিনা।
পরিবেশ নষ্ট করলে তো শাস্তির বিধান আছে।
কোথায় পরিবেশ নষ্ট করলাম ! পুলিশ সদস্য বললেন,
আপনারা কেউই মাস্ক পরেননি। চলুন থানায়। প্রেমিক বিচলিত।
প্লিজ দেখুন ! মাস্ক আমাদের কাছেই আছে। ঘনিষ্ট হতে গিয়ে খুলে রেখেছি। পকেট থেকে বের করে প্রেমিক মাস্ক দেখালেন পুলিশ সদস্যকে। নাছোড়বান্দা পুলিশ সদস্য।
থানায় গিয়ে মুচলেকা দিয়ে আসুন।
প্রেমিক-প্রেমিকার ছবি আশেপাশের কৌতুহলীদের মোবাইলে ততক্ষণে ধারন হয়ে গেছে।

গল্প-ছয়

টি-স্টল। শীতের রাত। চা পান আর আড্ডা চলছে মহল্লার বাসিন্দাদের। একটি টিভি চ্যানেলের অনুসন্ধানী ক্যামেরা সেখানে গিয়ে পৌঁছায়। সাংবাদিক জানতে চান, কারোর মুখে মাস্ক নেই কেনো। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ চলছে এখন সারাদেশে।
আড্ডাবাজরা উল্টো সাংবাদিককে চা পানে আমন্ত্রণ জানায়। সকলের ঠোঁটজুড়ে হাসি। হাসি নিয়ে একজন বললেন, ভাই এই মহল্লায় করোনার প্রথম ঢেউই আসেনি। দ্বিতীয় ঢেউ আসবে কী করে! নো চান্স । এই দেখুন আমরা সকলেই সুস্থ।
সাংবাদিক বললেন, সরকার জরিমানা করছে। মাস্ক না পরলে জেল খাটতে হতে পারে। আড্ডাবাজদের মধ্য থেকে একজন বলে উঠলেন, এই দেশের আইন করোনাকে ভয় পায়। নো টেনশন।

গল্প-সাত

ভদ্রলোক গার্মেন্টস ব্যবসায়ী। দারুন ধরা খেয়েছেন করোনাকালে। লোকসান মানতে পারছেন না। মাথা নষ্ট। বিদেশে টি-শার্ট ও নারীর পোশাক আইটেম রপ্তানী করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ, অর্ডার নেই। ভাবছেন মাস্ক তৈরি করবেন। কিন্ত মাস্ক কোথায় রপ্তানী করবেন মহাদুশ্চিন্তা তার। একজন বুদ্ধি দিলেন মাস্ক তৈরি করে নিজের কারখানার শ্রমিকদের মাঝে বিতরণ করা যায়। কিছুটা ক্ষতি এতে পুষিয়ে নেয়া যাবে। কিন্ত মাস্কের দাম আর কতো। ওতে খুব লাভ হবে না।
পরামর্শক জোর দিয়ে বললেন, হবে। শুরু করুন আগে। তারপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাবে গ্রামগঞ্জে। প্রচারণা জরুরি মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ায়। সুরক্ষিত মাস্কের প্রচারণা চালাতে হবে। প্রচারণা চললো ধুমসে মাস্ক তৈরির আগে। তারপর শুরু হলো মাস্ক তৈরি। দেখতে আধুনিক মাস্ক। গুনটা চাপা থাকলো। কিন্তু এই চাপা বেশিদিন থাকলো না।

গল্প-আট

করোনাকালে সব বন্ধ। প্রাইভেট পড়ানো, রাজনৈতিক পরিচয়ে টেন্ডার পাওয়া, আয়োজন-অনুষ্ঠান থেকে টুপাইস কামানো সব বন্ধ। কী করা যায় একটি বিশ^বিদ্যালয়ের হল প্রোভেস্ট ভাবতে শুরু করলেন। কারণ, টাকা প্রয়োজন। মাস্ক সরবরাহ করার লোভনীয় চিন্তাটা মাথায় এলো। ব্যস, রাজনৈতিক দাপটে হাসপাতালে মাস্ক সরবরাহের কাজটা পেয়ে গেলেন। সরবরাহ করলেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আবিস্কার করলেন যে, এই মাস্ক চিকিৎসকদের জন্যও নিরাপদ নয়। বেচারা হল প্রভোস্টকে শেষ অব্দি কারাগারে যেতে হলো। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কারাগার, নতুন এক ইতিহাস !

পাঠক, মাস্ক নিয়ে আরও নানান গল্প, কেচ্ছা নিশ্চয়ই আছে পথেঘাটে, অলিতেগলিতে। আমার বলা গল্পগুলো কিছুটা নিজের দেখা ও শোনা এবং বাকিটা অন্যদের কাছ থেকে বিনামূল্যে পাওয়া। গল্পগুলো বলে দেয়, করোনাকে নয়, মানুষ ভয় পায় টিভির ক্যামেরা, ব্যবসায়ের লোকসান আর প্রেমিকার স্পর্শহীনতাকে।

স্বপ্না রেজা: কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক

 

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত