প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ঝুলে গেছে খালেদা জিয়ার লন্ডন যাত্রা, কিছু নেতাকে দায়ী করছেন স্বজনরা

নিউজ ডেস্ক : সব প্রস্তুতি নিয়েও সমালোচনা এড়াতে আপাতত চিকিৎসার জন্য লন্ডন যাচ্ছেন না বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। কবে যাবেন তাও অনিশ্চিত। দলের কিছু নেতার আপত্তি এবং করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার কারণে তার লন্ডন যাত্রা ঝুলে গেছে। তবে এ পরিস্থিতির জন্য খালেদা জিয়ার স্বজনরা দলের কিছু নেতাকে দায়ী করছেন।

সূত্র জানায়, প্রথম দফায় দেয়া খালেদা জিয়ার ছয় মাস মুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই স্বজনরা মুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর পাশাপাশি তাকে লন্ডন নিয়ে চিকিৎসার প্রস্তুতি শুরু করেন। আর মুক্তির মেয়াদ ছয় মাস শেষ হওয়ার পর যখন সরকার আরও ছয় মাস সময় বাড়িয়ে দেয়, তখন স্বজনরা বিভিন্ন মহলের সঙ্গে যোগাযোগ করে খালেদা জিয়াকে লন্ডনে নিয়ে চিকিৎসার সকল ব্যবস্থা জোরদার করে। কিন্তু বিএনপির কিছু নেতা সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করে খালেদা জিয়ার বিদেশে যাওয়ার বিষয়টিকে ভালভাবে নিতে পারেননি। তাই তারা এ প্রক্রিয়ায় তার লন্ডনে যাওয়ার বিষয়ে বিভিন্নভাবে অনীহা প্রকাশ করতে থাকেন।

এদিকে দলের কিছু নেতার আপত্তির মুখে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া লন্ডনে যাবেন কি যাবেন না এ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যান। এরই মধ্যে দেশে শুরু হয়ে যায় করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ। প্রতিদিনই আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকে। লন্ডনসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশেও করোনা সংক্রমণ আবারও বাড়তে থাকে। এ ছাড়া বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার মুক্তির মেয়াদও বাকি আছে আর মাত্র চার মাস। তাই সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে খালেদা জিয়ার লন্ডন যাত্রা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির একজন কেন্দ্রীয় নেতা জানান, খালেদা জিয়া প্রথম যখন ছয় মাসের জন্য সাময়িক মুক্তি পান তখন দেশে করোনা পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। এ কারণে তিনি তখন বিদেশে চিকিৎসার জন্য যাওয়ার চেষ্টা করেননি। তবে তার মুক্তির মেয়াদ আরও ছয় মাস বাড়ার পর তিনি চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। এ জন্য যাবতীয় প্রস্তুতি নিতে নিতে আবার করোনার দ্বিতীয় দফা সংক্রমণ শুরু হয়ে যায়। তাই তিনি এখন বিদেশে চিকিৎসার জন্য যেতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। এ পরিস্থিতিতে তিনি চিকিৎসার জন্য যাবেন কি না, আর গেলেও কখন যাবেন তা এখন বলা যাচ্ছে না।

খালেদা জিয়ার স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে এমন একটি সূত্র জানিয়েছে, তার বিদেশে চিকিৎসার বিষয়ে সকল প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন ছিল। কিন্তু বিএনপির কিছু নেতা এ বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। তাদের এই নেতিবাচক মনোভাবকে খালেদা জিয়ার স্বজনরা ভালভাবে নেননি। এছাড়া প্রস্তুতি চূড়ান্ত করার আগেই দেশে শুরু হয়ে যায় করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ। এ পরিস্থিতিতে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য লন্ডন যাত্রা অনিশ্চিতই বলা চলে। তবে পরিস্থিতি অনুকুলে এলে হয়তো পরবর্তীতে সুবিধাজনক সময়ে তিনি চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে পারেন।

বিএনপি নেতাদের মধ্যে যারা খালেদা জিয়াকে বিদেশে না নিয়ে দেশে চিকিৎসা করানোর পক্ষে তাদের যুক্তি হচ্ছে- খালেদা জিয়া বিদেশে গেলে দল রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ, দলের চেয়ারপার্সন ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দুজনই দেশের বাইরে থাকলে সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে দলের নেতাকর্মীরা হতাশায় ভুগবে। এছাড়া দলের অন্য যেসব সিনিয়র নেতারা কেউ কাউকে মানতে চাইবেন না। এর ফলে দলে কোন্দল-বিদ্বেষ আরও বৃদ্ধি পাবে। এ পরিস্থিতিতে দলে ভাঙ্গন সৃষ্টি হতে পারে। তাই দলের স্বার্থেই বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে দেশে থাকা অতি জরুরী।

সূত্র জানায়, খালেদা জিয়াকে লন্ডনে চিকিৎসার জন্য নেয়ার বিষয়ে বিএনপির যেসব নেতা অনীহা প্রকাশ করেছেন তাদের মনোভাব ইতিবাচক করার জন্য তার স্বজনরা চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। দলের সেসব নেতা খালেদা জিয়াকে লন্ডনে নিয়ে চিকিৎসার বিষয়ে অতি আগ্রহের বিষয়টিকে সন্দেহের চোখে দেখেছেন। আর এ কারণে বিএনপির এই নেতাদের প্রতি খালেদা জিয়ার স্বজনরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। এ নিয়ে বিএনপির কোন কোন নেতার সঙ্গে খালেদা জিয়ার স্বজনদের কথা কাটাকাটি হয়েছে বলে জানা যায়।

বিএনপি নেতাদের প্রতি খালেদা জিয়ার স্বজনদের ক্ষুব্ধ হওয়ার কারণ হচ্ছে- তার মুক্তির জন্য কিছুদিন দৌড়ঝাঁপ করে দলের নেতারা এক পর্যায়ে থেমে যান। কিন্তু স্বজনরা হাল ছাড়েননি। তারা বিভিন্ন মাধ্যমে সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে যে কোন মূল্যে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার জন্য উঠেপড়ে লাগেন। এ বিষয়টিকে ভাল চোখে দেখেননি দলের কিছু নেতা। তারা খালেদা জিয়ার মুক্তির আগে থেকেই স্বজনদের চিঠি চালাচালি ও দৌড়ঝাঁপ নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করতে থাকেন। তবে তাদের এ আচরণে খালেদা জিয়ার স্বজনরা নাখোশ হলেও প্রকাশ্যে কোন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত না করে ভেতরে ভেতরে তাকে মুক্ত করার চেষ্টা জোরদার করেন। তাদের বিরামহীন চেষ্টায় খালেদা জিয়া প্রথমে ছয়মাস এবং পরে আরও ছয়মাসের জন্য মুক্তি পান। শুধু তাই নয় স্বজনরা খালেদা জিয়াকে লন্ডনে নিয়ে চিকিৎসার বিষয়েও বিভিন্নভাবে তৎপর হয়ে অনেকাংশেই সফল হয়েছিলেন বলে জানা যায়।

বেশ ক’বছর ধরেই বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া অসুস্থ। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে গিয়ে তিনি এক সময় চিকিৎসা নিয়েছেন। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার ৫ বছরের সাজা হয়। ওইদিনই তিনি পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী জীবন শুরু করেন। পরে হাইকোর্ট তার সেই সাজা বাড়িয়ে ১০ বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেয়। একই বছর ২৯ অক্টোবর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার ৭ বছরের সাজা হয়। কারাগারে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকলে প্রথমে একবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে নিয়ে তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আবার কারাগারে নিয়ে চিকিৎসা দেয়া হয়। কিন্তু কারাগারের চিকিৎসা খালেদা জিয়া ও তার স্বজনদের মনোঃপুত হয়নি।

কারাগারে খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের অবস্থা দিন দিন খারাপ হতে থাকলে বিএনপি ও স্বজনদের পক্ষ থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত হাসপাতালে ভর্তির জোর দাবি জানানো হয়। এক পর্যায়ে বিএনপির পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে একটি লিখিত আবেদন করে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করা হয়। এরপর একপর্যায়ে খালেদা জিয়াকে বিএসএমএমইউ হাসপাতালের প্রিজন সেলের কেবিনে রেখে চিকিৎসা দেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসায় খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় স্বজনদের পক্ষ থেকে তাকে মুক্তি দিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেয়ার সুযোগ দেয়ার দাবি জানানো হয়। এক পর্যায়ে কারাবন্দী বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসার জন্য মুক্তি চেয়ে স্বরাষ্ট্র ও আইনমন্ত্রীর কাছে চিঠি দেন খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দার। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাত করেন তার ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দার, বোন সেলিমা ইসলাম ও বোনের জামাই রফিকুল ইসলাম। তারা খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছেও একটি আবেদন করেন। এরপর সরকারের নির্বাহী আদেশে খালেদা জিয়া এ বছর ২৫ মার্চ ছয়মাসের জন্য সাময়িক মুক্তি পান।

বাসায় থেকে চিকিৎসা নিতে হবে এবং বিদেশে যাওয়া যাবে না- এই দুই শর্তে প্রথমে খালেদা জিয়াকে ছয়মাসের জন্য মুক্তি দেয়া হয়। এই ছয়মাস মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই স্বজনদের আবেদনের প্রেক্ষিতে আবারও ছয়মাসের জন্য মুক্তি দেয়া হয় তাকে। তবে স্বজনরা তাকে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসার জন্য চেষ্টা শুরু করলে সংশ্লিষ্ট মহল থেকে তাদের জানানো হয় এ জন্য খালেদা জিয়াকে নিজে স্বাক্ষর করে একটি আবেদন করতে হবে। বিদেশে চিকিৎসার বিষয়ে কিছু শর্ত মানলে তিনি সুযোগ পেতে পারেন।

বিভিন্ন মহলের সঙ্গে স্বজনদের যোগাযোগ বৃদ্ধির পর লন্ডনে চিকিৎসার জন্য সুযোগ পেতে খালেদা জিয়া নিজে স্বাক্ষর করে আবেদন করতে রাজি হন। এ পরিস্থিতিতে তার স্বজনরা সরকারের সঙ্গে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করে তাকে লন্ডনে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। দলের পক্ষ থেকে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়। হাইকমিশন থেকে জানানো হয়, খালেদা জিয়ার লন্ডনে যাওয়ার বিষয়ে কোন সমস্যা নেই। এ পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়ার লন্ডনে যাওয়ার সব প্রস্তুতি যখন শেষ পর্যায়ে তখন দলের কিছু নেতা নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। এ ছাড়া ইতোমধ্যেই দেশে করোনা সংক্রমণ ও এতে মানুষের মৃত্যু সংখ্যা বেড়ে যায়। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় খালেদা জিয়ার লন্ডনে গিয়ে চিকিৎসার বিষয়টিও আপাতত অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। জনকণ্ঠ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত