প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রিচি বেনো, ব্যাট-বল আর মাইক্রোফোন হাতে মোহ ছড়িয়েছিলেন যিনি

স্পোর্টস ডেস্ক : ‘সিম্পলি মারভেলাস’ ক্রিকইনফোর অন দিস ডে ফিচারে গেলে এমনটাই দেখা যায়। ক্রিকেট যার শিরায় শিরায়, সব ভূমিকাতে নিজেকে সর্বোচ্চ আসনে নিয়ে গেছেন যিনি। তাকে ব্যাখ্যা করতে উপযুক্ত শব্দ পাওয়া যাবে কোথায়? তাই হয়তো তার কণ্ঠে মোহে ফেলে দেয়া এই শব্দ দুইটিই বেছে নেয়া হয়েছে। একাধারে বোলার, ব্যাটসম্যান, ভালো ফিল্ডার, অধিনায়ক, ক্রিকেট সাংবাদিক ও ধারাভাষ্যকার ছিলেন যে রিচি বেনো, গতকাল ছিলো তার জন্মদিন।

জন্মেছেন অস্ট্রেলিয়ার পেনিরাথে, পৃথিবীকে বিদায় বলেছেন একই দেশের সিডনিতে থেকে। মাঝের সময়টায় গড়ে গেছেন অসংখ্য কীর্তি গাঁথা। ব্যাট হাতে, বল হাতে, মাইক্রোফোন হাতেও। অনেকে হয়তো যেকোনো কোনো একটাতে খুব ভালো হন। তিনটিতেই দুর্দান্ত হতে পারেন কজন? যারা হন, রিচি তাদের দলের একজন।

যদিও যত সহজ মনে হচ্ছে ব্যাপারটা, আসলে ততটা ছিল না কখনো। তিনি সহজাত প্রতিভা নিয়ে জন্মাননি, পরিশ্রম করে গেছেন অক্লান্ত। রিচি এর ফলও পেয়েছেন জীবনজুড়ে। দলের সঙ্গে প্রথমে সফরে তিনি ঘুরেছেন, পুরোটা বসে কাটিয়ে দিয়েছেন।

শেষে এসে সুযোগ পেয়েছেন তিনি ১৯৫২ সালে। ব্যাট হাতে নিজের প্রথম ইনিংসে ৩ এরপর দ্বিতীয়বার ব্যাটিংয়ে নেমে করেছেন ১৯ রান। দ্বিতীয় ইনিংসে বল করার আগেই ম্যাচ শেষ হয়ে গেছে, প্রথম ইনিংসেও আহামরি কিছু করতে পারেননি রিচি, পেয়েছেন কেবল এক উইকেট। প্রথম ম্যাচে এমন পারফরম্যান্স যার, তার ভবিষ্যত উজ্জ্বল হওয়ার স্বপ্ন দেখবেন কে?

আর কেউ না দেখলেও রিচি যে দেখেছেন, সেটা পুরোপুরি স্পষ্ট। নিজের ওপর বিশ্বাস না থাকলে এমন সব কীর্তি গড়া যে সম্ভব না। হওয়া সম্ভব না কিংবদন্তি। রিচি তাই নিজে লড়ে গেছেন, ক্ষুধা বাড়িয়েছেন। এরপর নেমেছেন সাফল্যের সন্ধানে। সেটা তিনি পেয়েছেনও।

প্রথম অলরাউন্ডার হিসেবে দুই হাজার রান আর দুইশ উইকেট নিয়ে, নতুন ‘ক্লাব’ খুলেছেন রিচি। ছোট বেলায় বাবার কাছ থেকে শেখা লেগ স্পিনটাকে নিয়ে গেছেন অন্য পর্যায়ে। ক্যারিয়ার শেষে উজ্জ্বল নাম হয়েছেন ক্রিকেটের রেকর্ডবুকে। ৬৩ টেস্টে খেলে করেছেন ২২০১ রান, নিয়েছেন ২৪৮ উইকেট।

রিচি দ্যুতি ছড়িয়েছেন নেতৃত্বেও। অধিনায়কের আর্মব্যান্ড খুলে রাখার সময় হয়ে গেছেন অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাস সেরা অধিনায়কদের একজন। আছেন এখনো, থাকবেন হয়তো ক্রিকেট টিকে থাকার শেষ দিনেও। ২৮ টেস্টের অধিনায়কত্ব জীবনে হেরেছেন কেবল ৪ ম্যাচ। জিতেছেন তার অধীনে খেলা সব সিরিজও।

সব ছাপিয়ে ক্রিকেট পরবর্তী জীবন আরও বেশি রঙিন করেছেন রিচি। কখনো কলম হাতে, কখনো মাইক্রোফোন। রিচি স্বাক্ষর রেখে গেছেন নিজের ক্রিকেট জ্ঞানের। কমেন্ট্রি যে শিল্প, তার প্রমাণ দিয়েছেন তিনি তার প্রতিটি শব্দে, বাক্যে, বর্ণনাতে। প্রথম শ্রেণির ক্যারিয়ার তখনো শেষ করেননি। ডেইলি সানে কাজ শুরু করেছেন যখন। সাংবাদিকতার সঙ্গে ধারাভাষ্যও শুরু করেছিলেন পেশাদার ক্রিকেটের ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাওয়ার আগে। ১৯৬০ সালে বিবিসির হয়ে রেডিওতে ধারাভাষ্য দিয়েছিলেন, তিন বছর পর টেলিভেশনে।

এরপর বাকি সব কিছু আড়ালে চলে গেছে। কমেন্ট্রির মাহাত্ম্যে, কলমের জাদুতে। কথা বলার ভঙ্গি, বর্ণনার ভাষায়, রসবোধ আর ক্রিকেট জ্ঞানে রিচি দর্শকদের কানকে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছেন যুগের পর যুগ। চ্যানেল নাইন, বিবিসি, চ্যানেল ফোর কিংবা যেকোনো কিছু। যেখানেই ক্রিকেট, সেখানেই রিচি বেনোর কমেন্ট্রি যেন হয়ে উঠেছিল নিয়ম।

ওয়ানডে ক্রিকেটকে বদলে দিয়েছে যে ক্যারি প্যাকার সিরিজ। বেনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখছেন সেখানেও। এত গল্প যার জীবনে। তার মৃত্যুটাও খুব জটিল প্রক্রিয়াতে। ক্রিকেট আঁকড়ে ছিলেন সারাজীবন। তবে ঘোড় দৌড় ভালোবাসতেন। বন্ধুর সঙ্গে বাজি ধরতেন। বেশির ভাগ সময় জিতেও যেতেন। শেষ জীবনেও স্ত্রীকে দিয়ে ঘোড় দৌড়ে বাজি লাগিয়েছিলেন সে কারণে।

ক্রিকেট যতটা ভালো বুঝতেন। গাড়ি তার অর্ধেক ভালোও সম্ভবত চালাতে পারতেন না। ২০১৩ সালে একসিডেন্ট করে ফেললেন। গলফ খেলে বাসায় ফেরার পথে মারাত্মক আহত হয়ে বিছানায় গেলেন। আর উঠতেই পারলেন না। তার আগেই জেনে গেলেন মরনব্যাধী ক্যান্সার বাসা বেঁধেছে ত্বকে।
ধীরে ধীরে সেটা শরীরে ছড়ালো। নিঃশ্বেষ হতে থাকলো এক কিংবদন্তির শরীর, ক্রিকেটের, অধিনায়কত্বের, কমেন্ট্রিরও। শেষ মেশ বিদায় বললেন ১০ এপ্রিল, ২০১৫ সালে। বিষণ্নতায় ডুবালেন ক্রিকেটে বিশ্বকে। বুঝিয়ে গেলেন সিম্পলি মারভেলাস শব্দটার কত শক্তি। যার জন্ম হয়েছিল ক্রিকেটের জন্য, সেদিন জীবন অবসান হলো তার। ৬ অক্টোবর ১৯৩০ এ জন্ম হয়েছিল যে তারকার। তিনি পৃথিবীর মায়া কাটালেন আরও ৮৫ বছর পরে। – ক্রিকফ্রেঞ্জি

সর্বাধিক পঠিত