প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মঞ্জুরুল হক: দলিত মেয়েটির সঙ্গে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ভারত পুড়েছে!

মঞ্জুরুল হক: বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন বলছেন, ‘বিশ্বের দিকে তাকিয়ে দেখেন কোন জায়গায় ধর্ষণ নেই’ তার পরপরই সরকারের তল্পিবাহকদের ‘কর্তব্য’ হয়ে দাঁড়ায় বিশ্বে কোন কোন দেশে বাংলাদেশের চেয়ে বেশি ধর্ষণ ঘটে তার তথ্য হাজির করা। তারা তা করেছেনও। আর যখন দেখিয়ে দেওয়া যায়-অমুক দেশে বেশি ধর্ষণ ঘটে, তখন এদেশের ধর্ষণ অপরাধ গলে তরল হয়ে যায়। ধর্ষকরাও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ‘সহমত’ জ্ঞাপন করে!

শুধু ধর্ষণ নয়, আমাদের মতো গণতন্ত্রহীন দেশগুলোতে শাসকশ্রেণির নির্মমতা মধ্যযুগ হার মানবে, যে যুগকে বর্বরতার যুগ বলা হয়।
বাবরি মসজিদ ভাঙার কারিগরদের ক্লিনচিট দেওয়া হবে অনুমেয় ছিল। এটা বুঝতে মহাকাশবিদ্যা বুঝতে হয় না। সিম্পল ক্লাস অ্যান্ড ওরিয়েন্টেশন কশাসনেস। এই ঘটনাটা যেমন ‘টক অব দ্য সাবকন্টিনেন্ট’ হয়ে গেলো, ঠিক সেই সময়ে ছাইচাপা পড়ে গেলো এক নির্মম, বর্বর, লোমহর্ষক, বীভৎসতা। ওই ভারতেই। উত্তরপ্রদেশের আগ্রা অঞ্চলের হাতরাশ গ্রামের ১৯ বছরের মণীষাকে ওড়না ধরে ক্ষেতের ভেতরে টেনে নিয়ে যায় ৪ উচ্চবর্ণ যুবক। মণীষা ক্ষেতে কাজ করছিল। শুরু হয় ধর্ষণ। ধর্ষণের বীভৎসতা কতটা মারাত্মক? তরুণীর দাঁত চেপে সহ্য করতে করতে তার জিভ পুরো কেটে যায়। তাকে উন্মত্ত ষাড়ের শক্তিতে মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। গ্রামবাসীরা হাসপাতালে নিয়ে গেলে এক সপ্তাহ চিকিৎসার পর কথা বলতে পারে। পুলিশের কাছে দায়ের হয় ধর্ষণের অভিযোগ। দুদিন পর তার অবস্থা গুরুতর হলে তাকে দিল্লির সফরজং হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। সেইখানে ২৯ তারিখ ভোরে শেষ নিঃশ^াস ত্যাগ করে মণীষা। ঘটনা এখানে শেষ নয়।

মোদির ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’ বোলচালের জমানায় ১৯ বছরের দলিত তরুণীকে ধর্ষণ করেছে ৪ জন উচ্চবর্ণের জানোয়ার-সন্দীপ, রামু, লভকুশ এবং রভি। ধর্ষকরা নিম্নবর্ণের হলে এতোক্ষণ দেশে আগুন লেগে যেতো। গর্জে উঠতো বিবেকের পাহারাদাররা, কিন্তু এখন সবাই চুপ। মিডিয়া হোক কি কঙ্গনা রনউত। এই ‘রেগুলেশন অব রেপ’-এর রাজনৈতিক বেনিফিট নেই, টিআরপি নেই, তাই মিডিয়া হাইপও নেই। তার ওপর এটা ঘটেছে সেই রাজ্য যেখানে ২০১৮ তে ৩৯৪৬টি রেপ কেস রিপোর্ট করা হয় যার ৪৩২২ জন ভিক্টিমের মধ্যে ১৪১১ জন নাবালিকা!

এরপর কী হলো? গল্প শেষ? না। আরও নির্মমতা বাকি…। ওই দিনই রাত ১০ টার দিকে হাসপাতাল থেকে দেহটি হাইজ্যাক করে নিয়ে যায় পুলিশ। সবাই চুপ। একজন থামেননি। দিল্লির টিভি স্টুডিওর বাইরে এক নারী সাংবাদিক তখন পুলিশের গাড়ির পেছন নিয়েছেন। পরিবারের লোকজন হাসপাতালের সামনে ধর্নাতে বসলে চাপে পড়ে পুলিশ দেহটি মেয়েটির গ্রাম হাথরসে নিয়ে যায়। সাংবাদিক মেয়েটি তখন দূর থেকে সবকিছুই ক্যামেরা বন্দী করছেন। এরপর ওই মৃত ও ধর্ষিতা মেয়েটির পরিবারের লোকজন এবং সাথে অনেক গ্রামবাসীকে তালা দিয়ে ঘরের মধ্যে বন্দী করে রাত ৩ টার দিকে পুলিশ জোর করে দেহ নিয়ে শ্মশানের দিকে রওনা হয়। শেষ পর্যন্ত শ্মশানে না, দেহটি পোড়ানো হয় শস্যক্ষেতে।
দিল্লি থেকে আসা সেই নারীটি দেখেন- কিছু একটা জ্বলছে, কিন্তু পুলিশ কোনোমতেই ওনাকে সামনে যেতে দিচ্ছেন না। নারীটি বারবার পুলিশ অফিসারদের প্রশ্ন করছেন, ‘ইয়ে জ্বল কেয়া রাহা হ্যাঁয়?’ – পুলিশ নির্বিকার। কোনো উত্তর নেই। শুধুই বলছে, বলা যাবে না। ওই সাংবাদিকটির নাম তনুশ্রী পান্ডে। ইন্ডিয়া টুডের সাংবাদিক। উনি না থাকলে কীভাবে সব তথ্য প্রমাণ লুট করে যোগী সরকারের পুলিশ রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে ১৯ বছরের মেয়েটিকে পুড়িয়ে দিলো, তা ঘুণাক্ষরেও জানা যেতো না।

পুলিশ মণীষার লাশটি পোড়ানোর আগে যা যা ঘটেছে তা কেবল অতিরঞ্জিত আবেগী সিনেমার গল্পে ঘটে। অথচ এখানে বাস্তবে ঘটল। মেয়েটির মা শেষ চিহ্ন লাশটি রক্ষার জন্য বারবার পুলিশের গাড়ির সামনে শুয়ে পড়েছে। গ্রামের দলিত গরিব লোকজন গাড়িটি ঘিরে ধরে মাতম করেছে। ঘরের ভেতর খিল দেওয়া বাড়ির অন্য লোকগুলো গগনবিদারি চিৎকার করেছে। আকাশে যেন বজ্র-বিদ্যুতের চমকের মত বারে বারে চমকেছে। মায়ের কান্নায় বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। তারপরও পুলিশের ওই দলটির কারও মনে সামান্যতম করুণার উদ্রেগ করেনি।

দলিত মেয়ে মণীষার যৌনাঙ্গ ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে, দলিত মেয়ে মণীষার মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে, দলিত মেয়ে মণীষার বুকের পাঁজর ভেঙে গেছে, দলিত মেয়েটি হাসপাতালে বাঁচতে বাঁচতে মারা গেছে, দলিত মেয়ে মণীষার দেহটি শ্মশাণের বাইরে পুলিশ পুড়িয়ে দিয়েছে, দলিত মেয়েটির সঙ্গে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ভারত পুড়েছে, দলিত মেয়েটির সঙ্গে গণতন্ত্র, জাত-পাত আর সরকারের ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’ ধাপ্পাবাজীও পুড়েছে। লেখার সহায়তা- [১] দ্য ওয়াল, [২] Md Imtiaz ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত