প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সাদিয়া নাসরিন: পরকীয়া বিতর্ক ও মনোগ্যামিতার ধাপ্পা

সাদিয়া নাসরিন: পৃথিবীর ইতিহাসে পুরুষতন্ত্র নারীকে সবচেয়ে বড় যে ধাপ্পাটি দিয়েছে তার নাম মনোগ্যামিতা, যেখানে যৌননিষ্ঠার দায় আরোপিত হয়েছে শুধু নারীর উপর। নারীর মনে যৌনতা নিয়ে ট্যাবু তৈরী করে, শিশুকাল থেকে নারীর মগজে ‘বিয়ে’ ঢুকিয়ে দিয়ে তার সামনে প্রতিষ্টিত করেছে মনোগ্যামিতার আদর্শ।

পুরুষতন্ত্র ঠিক করেছে, নারীর বিশ্বস্ততা পুরুষের জন্য বেশী জরুরী। কেননা এখানে সন্তানের মালিকানার প্রশ্ন আছে। সামজিক শৃংখলা রক্ষার দায় আছে। দক্ষীণ এশিয় সমাজে তাই একজন পুরুষের জন্য যৌনকর্মির কাছে যাওয়াটা ‘পরকিয়া’র তুলনায় অনেক লঘু অপরাধ।

কারণ পুরুষতন্ত্র পুরুষকে এই নির্ভরতা দিয়েছে যে,’গণীকাগমণ’ সমাজে বিশৃংখলা তৈরী করেনা, কারণ যৌনকর্মির ‘স্বামী’ নেই, সন্তানের মালিকানার প্রশ্নও নেই, অতএব স্বামীর প্রতি কমিটমেন্ট ভাঙ্গার প্রশ্ন নেই(?)!

অতএব, পরকিয়া নিয়ে এই যে আমাদের পুরুষ সমাজের ত্রাহী ত্রাহী চিৎকার, এতো বিতর্ক সেটা আসলে একজন নারীর তার স্বামীর প্রতি কমিটমেন্ট ভঙ্গ করা নিয়ে, সন্তানের মালিকানার প্রশ্নে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আতঙ্ক।

সমাজ ঠিক করে দিয়েছে একজন নারী তার স্বামীর প্রতি বিশ্বস্ততা ভঙ্গ করলেই সমাজে বিশৃংখলা হয়। তাই সমাজ যতোটা নারীর দ্বারা সমাজের শৃঙ্খলা ভঙ্গ নিয়ে উৎকন্ঠিত হয়েছে তার কানাকড়ি উৎকন্ঠাও দেখায়নি পুরুষের গণিকাগমন বা যৌনতাক্রয়ের খোলামেলা দরকষাকষি নিয়ে।

পুরুষের সমাজ এই প্রশ্ন কখনো তোলেনি, সমাজের শৃঙ্খলা রক্ষার দায় কি নারীর একার ? একজন পুরুষ তার স্ত্রীর প্রতি চুক্তিবদ্ধ অঙ্গীকার ভঙ্গ করে যৌনপল্লিতে না গেলে কি আমরা এই বিপুল সংখ্যক যৌনকর্মিকে এই পেশায় দেখতে পেতাম?

পাশের ঘরে স্ত্রী রেখে কাজের মেয়ের সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা বা কর্মক্ষেত্রে পরনারীদের যৌন আহ্বান জানানো বা যে কোন অবৈবাহিক সম্পর্কের অন্য প্রান্তের স্বামীরা কি তাদের স্ত্রীর প্রতি কমিটেড থাকেন?

প্রতিদিন যে পরিমাণ নারী ঘরে বাইরে পরকিয়ার অপবাদে নিপিড়িত হন, এই সমাজে পুরুষও কি সে পরিমাণ অপদস্থ হন পরকিয়ার অপবাদে? একজন নারীকে প্রতিদিন সতীত্ব আর বিশ্বস্ততা প্রমাণের যে পরাকাষ্ঠা পার হতে হয়, তা কি একজন পুরুষকেও পার হতে হয়?

হয়না। কারণ, পুরুষের এই সমাজ পুরুষের বহুগামিতাকে সবসময়ই স্নেহসুলভ প্রশ্রয় দিয়েছে এবং যুগ যুগ ধরেই নারীর উপর চাপিয়ে দিয়েছে একগামি যৌননিষ্ঠার বাধ্যবাধকতা।

পরকিয়া নিয়ে এইযে সমাজ এতো ছিছিক্কার করে, পরকিয়াকে গালি দিয়ে নিজেদের তুলসি পাতা প্রমাণ করে, সেই সমাজটি প্রকাশ্যই পুরুষের বহুগামিতাকে প্রশ্রয় দেয় বলেই ষোল কোটি মানুষের দেশে ১১ টি রেজিস্টার্ড যৌনপল্লী থাকে যেখানে প্রায় ১ লাখ যৌনকর্মি বৈধভাবে কাজ করেন এবং আরো তিন-চার লাখ ভাসমান যৌনকর্মি আনরেজিস্টার্ড সার্ভিস দিতে বাধ্য হন।

পরকিয়া বিস্তারের ইতিহাস ঘাটলে আপনি দেখবেন, কয়েক যুগ আগেও বহুপত্নিক পরিবার ব্যবস্থা ছিলো, এখনো আছে কম মাত্রায়। সময়ের বিবর্তনে বহুপত্নিক পরিবারের পরিবর্তে ‘এক নারী এক পুরুষের’ যৌননিষ্ঠার ধারনার ভিত্তিতে একগামী পরিবার ব্যবস্থা গড়ে ওঠেছে, একক বিয়ে প্রথা চালু হয়েছে।

কিন্তু যে যৌননিষ্ঠার ধারণার ভিত্তিতে এই একগামী পরিবার ব্যবস্থা গড়ে ওঠেছে, বেশিরভাগ পুরুষই সেই যৌননিষ্ঠা পালন করেনি। বরং একক পরিবার গঠন করার পর পুরুষ ব্যপকহারে শুরু করলো যৌনতাক্রয়ের সংস্কৃতি।

ধীরে ধীরে বসত গড়লো যৌন পল্লী, আবারো স্বীকৃত হতে থাকলো পুরুষের বহুগামিতা, যা আগেও স্বীকৃত ছিলো। একটা সময় যৌনপল্লীতে যেতে পুরুষের বেশিদিন ভালো লাগেনি বলে শুরু হলো ‘পরস্ত্রীগমণ’।

এবং ‘পরস্ত্রীর সাথে প্রেম’ থেকেই শুরু হলো পরকিয়া শব্দটির ঘৃণ্যতা। কারন, ‘পরকিয়া’ শব্দটি উচ্চারণের সাথে সাথে এর একপাশে থাকা নারীটিকে যেভাবে ফোকাসে দেখতে পাওয়া যায়, তেমনটা ফোকাসে আসেনা পুরুষটি।

পরকিয়া বলতেই নারীটিকে যেভাবে ফোকাসে পাওয়া যায়, সেভাবেই যদি ফোকাসটা আরেকপাশের পুরুষটির উপরও সমানভাবে থাকতো তাহলে সেটাও নিশ্চিত “পুরুষমাত্রই বহুগামী” এর মতো স্নেহসুলভ ক্ষমাতে শেষ হতো।

সেই ইতিহাস বিশ্লেষণই আপনাকে পরিষ্কার ধারণা দেবে যে, পরকিয়া হলো পুরুষতন্ত্রের বাই ডিফল্ট রাজনীতি। যে রাজনীতির কুটচালে মনোগ্যামিতার ধাপ্পাবাজি দিয়ে পুরুষতন্ত্র বিয়ের আগের প্রেমকে মহান করেছে, বিয়ের পরের প্রেমকে বহুগামিতা বলে ঘৃণা করেছে। পুরুষতন্ত্র ঠিক করেছে কোন প্রেম বৈধ আর কোন প্রেম অবৈধ।

মূলত, পরকিয়ার সাথে বিয়ে নামক প্রতিষ্টানটির সম্পর্ক সবসময়ই ঋণাত্মক। যেদিন থেকে ‘এক নারী এক পুরুষের’ বিয়ে প্রথা চালু হয়েছে সেদিন থেকেই পুঁজিবাদি-গণতান্ত্রিক-পিতৃতান্ত্রিক সমাজে ঢালপালা ছড়িয়ে জায়গা করে বসেছে অবৈবাহিক সম্পর্ক। এবং বিয়ের মতো একটি নৈতিক (?) প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখার জন্যই পরকিয়ার মতো অনৈতিক(?) সম্পর্ককে জিইয়ে রেখেছে পুরুষতন্ত্র।

এবং যতোদিন বিয়ে নামক পুরুষতান্ত্রিক প্রতিষ্টানটি ধর্মের রক্তচক্ষু দিয়ে মানুষের পছন্দ ও মনস্তত্ত্বকে ‘বৈধ অবৈধ’ বলে নিয়ন্ত্রণ করবে, রাষ্ট্র তার আইন দিয়ে ‘প্রেম’কে স্বামী- স্ত্রীর মধ্যে নির্দিষ্ট করে বাকি সব সম্পর্ককে অবৈধ বলে সিদ্ধান্ত দিবে, নারীর গর্ভ ও গর্ভজাত সন্তানের উত্তরাধিকার নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বিয়ের মতো চুক্তিভিত্তিক একটি সম্পর্ককে ইলাস্টিকের মতো টানতে বাধ্য করবে, ততোদিন পরকিয়ার মত অনৈতিক(?) সম্পর্কে জড়াতে থাকবে মানুষ।

ইউসুফ জুলেখা-লাইলি মজনু-রাধা কৃষ্ণের মিথ থেকে বাস্তবের কেনেডি মনরো-মনিকা ক্লিন্টন, এসবই কিন্তু সেই ‘পরকিয়া’ নামক সম্পর্কের ঐতিহাসিক বাস্তবতা।

এই বাস্তবতা স্বীকার করা বা না করা আপনার স্বাধীন ইচ্ছা। আপনি বড়জোর জাজমেন্টাল হতে পারবেন, পরকিয়া নিয়ে ছিঃছিক্কার করতে পারবেন, আইন তৈরী করতে পারবেন, কিন্তু তাতে সঙ্গীর প্রতি বিশ্বস্ততা রক্ষার বাধ্যবাধকতা তৈরী করতে পারবেননা।

বিশ্বস্ততার বোধ পারষ্পরিক, এটা পারষ্পরিক সম্মান ও মানসিক যোগাযোগ থেকে স্বতস্ফুর্তভাবে আসে। আইন করে বা ধর্ম আর সমাজের কাঁটাতার দিয়ে বিশ্বস্ততার বোধ তৈরী করা যায়না। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত