প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

এম. নজরুল ইসলাম : ইতিহাসের সাহসী নারী

এম. নজরুল ইসলাম : জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনে তাঁর সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ভূমিকা ও অবদান অনস্বীকার্য। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বার বার তুলে এনেছেন তাঁর সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বা তাঁর রেনু প্রসঙ্গ। মহীয়সী এই নারীর আত্মত্যাগ শুধু ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুর প্রতি নয়, দেশের প্রতিও।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আরও লিখছেন, ‘… সামনে আমি এগিয়ে গেলেও কোনদিন আমার স্ত্রী বাধা দেয়নি। এমনও দেখেছি যে অনেকবার আমার জীবনের ১০-১১ বছর আমি জেল খেটেছি। জীবনে কোনদিন মুখ কালা কিংবা আমার ওপর প্রতিবাদ করেনি। তাহলে বোধহয় জীবনে অনেক বাধা আমার আসত। এমন সময় আমি দেখেছি যে আমি যখন জেলে চলে গেছি, আমি একআনা পয়সাও দিয়ে যেতে পারিনি আমার ছেলেমেয়ের কাছে। আমার সংগ্রামে তাঁর দান যথেষ্ট রয়েছে।’

মহীয়সী নারী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা একজন অনুকরণীয় দৃষ্টান্তের মানুষ। তিনি তাঁর সচেতন বোধ এবং নিজস্ব চিন্তাচেতনায় তাঁর সময়কে যেভাবে উপলব্ধি করেছিলেন, তা ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে ভিন্ন মাত্রা লাভ করে নিঃসন্দেহে।

বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৬ সালে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ৮৬তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে তাঁর মাকে নিয়ে যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তাতে তিনি তাঁর মাকে যেন নয়, এক সর্বংসহা মহীয়সী নারীকে তুলে ধরেছেন। ঐ বক্তৃতায় তিনি বলেন, ‘একটার পর একটা ঘাত-প্রতিঘাত এসেছে। কিন্তু একটা জিনিস আমি বলব যে, আমার মাকে আমি কখনও ভেঙে পড়তে দেখিনি। কখনও যত কষ্টই হোক আমার বাবাকে বলেননি যে, তুমি রাজনীতি ছেড়ে দাও বা চলে আস বা সংসার কর বা সংসারের খরচ দাও। কখনও না।

…সংসারটা কিভাবে চলবে সম্পূর্ণভাবে তিনি নিজে করতেন। কোনদিন জীবনে কোন প্রয়োজনে আমার বাবাকে বিরক্ত করেননি। মেয়েদের অনেক আকাক্সক্ষা থাকে স্বামীদের কাছ থেকে পাবার। শাড়ি, গহনা, বাড়ি, গাড়ি, কত কিছু!…এত কষ্ট তিনি করেছেন জীবনে; কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলেননি। চাননি।

…আইয়ুব খান যেদিন মার্শাল ল’ ডিক্লেয়ার করলেন আব্বা করাচিতে ছিলেন। তাড়াতাড়ি চলে এলেন, ঐ দিন রাতে ফিরে এলেন। তারপরই ১১ তারিখ দিবাগত রাতে অর্থাৎ, ১২ তারিখে আব্বাকে গ্রেফতার করা হলো। আমার দাদি আমাদের সঙ্গে ছিলেন। গ্রেফতার করার সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে যে নগদ টাকা ছিল, আমাদের গাড়ি ছিল, সব সিজ করে নিয়ে যাওয়া হলো।

…অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে আমার মাকে দেখেছি সে অবস্থা সামাল দিতে। মাত্র ৬ দিনের নোটিস দিয়ে আমাদের বাড়ি থেকে বের করে দিল। মালপত্তর নিয়ে রাস্তার ওপর আমরা ছোট ছোট ভাইবোন। তখন রেহানা খুবই ছোট। একজন একটা বাসা দিল। দুই কামরার বাসায় আমরা গিয়ে উঠলাম। দিনরাত বাড়ি খোঁজা আর আব্বার বিরুদ্ধে তখন একটার পর একটা মামলা দিচ্ছে। এই মামলা মোকদ্দমা চালানো, কোর্টে যাওয়া এবং বাড়ি খোঁজা, সমস্ত কাজ আমার মা অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে করতেন।…কখনও অভাব কথাটা মায়ের কাছ থেকে শুনিনি। এমনও দিন গেছে বাজার করতে পারেননি। আমাদের কিন্তু কোনদিন বলেননি, আমার টাকা নেই, বাজার করতে পারলাম না।

লন্ডন প্রবাসী সাংবাদিক সাহিত্যিক আবদুল গাফ্্ফার চৌধুরী তাঁর একটি নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন, ‘…জাতির সাহসী ও মমতাময়ী জননী হয়ে সেই রক্তের সঙ্গে নিজের রক্ত মিশিয়েছেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। কৃতজ্ঞ জাতির কাছে তিনি তাই বঙ্গমাতা।… এই মহীয়সী নারীর জীবন পরম গৌরবের। একদিকে তিনি জাতির পিতার পত্নী, শহীদ সন্তানদের জননী এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একজন শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক নেত্রী শেখ হাসিনারও জন্মদাত্রী।

বেগম ফজিলাতুন্নেছা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘রেনু আমার পাশে না থাকলে এবং আমার সব দুঃখকষ্ট, অভাব-অনটন, বার বার কারাবরণ, ছেলেমেয়ে নিয়ে অনিশ্চিত জীবনযাপন হাসিমুখে মেনে নিতে না পারলে আমি আজ বঙ্গবন্ধু হতে পারতাম না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামেও যুক্ত থাকতে পারতাম না। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময় সে আদালতে নিত্য হাজিরা দিয়েছে এবং শুধু আমাকে নয়, মামলায় অভিযুক্ত সবাইকে সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছে। আমি জেলে থাকলে নেপথ্যে থেকে আওয়ামী লীগের হালও ধরেছে।’

শেখ ফরিলাতুন্নেছা মুজিব আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন ইতিহাসের সাহসী মানুষ হয়ে। আজ তাঁর জন্মদিনে প্রণতি জানাই তাঁকে।

লেখক : সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি, [email protected]

সূত্র : জনকণ্ঠ

সর্বাধিক পঠিত