প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কমলা ভাসিন: আমরা পুরুষবিরোধী নই, আমরা পুরুষতন্ত্রের বিরোধী

কমলা ভাসিন: আমি নারীবাদীদের নিয়ে কথা বলি না। আমি কথা বলি নারীবাদ নিয়ে। ইসলাম তো শুধু এক ধরনের নয়। সেখানে শিয়া আছে, সুন্নি আছে। খ্রিস্টান ধর্মও সবখানে এক নয়। ক্যাথলিক আছে, প্রোটেস্ট্যান্ট আছে। সমাজতন্ত্রেরও কোনো একক রূপ নেই, শুধু এক ধরনের সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলও নেই। একইভাবে, নারীবাদও একেক জায়গায় একেক রকম। আমার মতে, নারীবাদ হওয়া উচিৎ পানির মতো। পানি তো সবখানেই H2O, কিন্তু একে যখন যে পাত্রে রাখা হয়, এটি সেই পাত্রের আকার ধারণ করে। তাই ঢাকার বাঙালি নারীদের জন্য নারীবাদ যা, তার তুলনায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীদের জন্য নারীবাদ ভিন্ন। প্রত্যন্ত অঞ্চলে একজন নারীর সংগ্রাম হয়তো ব্র্যাক পরিচালিত লিটারেসি ক্লাসে যাওয়া নিয়ে। কিন্তু আপনার জন্য, এটি হয়তো হোস্টেলে যাওয়া, সেখানে থাকা, এমনকি দেশের বাইরে যাওয়া নিয়ে। তাহলে নারীবাদীদের নিয়ে কেন বিতর্ক থাকবে না? যখনই আমি কোনো নারীবাদীর সাথে বিতর্ক করতে যাই, অনারীবাদীরা বলে ওঠেন, “আহ! নারীবাদীরাও বিতর্ক করছে!’ সব রাজনৈতিক দলই বিতর্ক করে। সাংবাদিকরা বিতর্ক করেন। সব সাংবাদিকের চিন্তা কি এক? সব মুসলিম কি একইভাবে চিন্তা করেন? না।

নারীবাদ হলো পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে। শহুরে সমাজে এটি পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে, গ্রামীণ সমাজে এটি পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে, যুক্তরাষ্ট্রেও এটি পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে তাদেরকে যৌতুকের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয় না। আসলে নারীবাদ হলো পুরুষতন্ত্রের পাল্টা জবাব, এবং পুরুষতন্ত্রও স্থানভেদে ভিন্ন। তবে, সবখানেই পুরুষতন্ত্রের কিছু অভিন্ন রূপ রয়েছে। যেমন ধরুন, ধর্ষণ পৃথিবীর সব জায়গাতেই হয়। তাই বিশ্বব্যাপী সব নারীকেই এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হয়। নারীবাদ হলো পুরুষতন্ত্রের নির্দিষ্ট কিছু রূপের বিরুদ্ধে পাল্টা জবাব, এবং পাল্টা জবাব পুরুষতন্ত্র সম্পর্কে আমাদের ধারণার বিরুদ্ধেও।

নারীবাদের বিভিন্ন রূপের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে, এবং আমি মনে করি সেটি বেশ স্বাস্থ্যকর। যেমন ধরুন, সেক্স ওয়ার্ক নিয়ে অনেক বড় বিতর্ক রয়েছে। কিছু নারীবাদী বলেন, যৌনতা বিক্রি করা কোনো কাজ হতে পারে না। এটি বেশ্যাবৃত্তি। কিছু নারীবাদী আবার বলেন, এটি অন্য যেকোনো কাজের মতোই। এছাড়া নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন নিয়েও আলোচনা হয়। কিছু নারীবাদী বলেন নারীদের এই সংরক্ষিত আসনের প্রয়োজন। আবার কিছু নারীবাদী বলেন এগুলোর কোনো প্রয়োজন নেই।

আমরা কোনো লিঙ্গের বিরুদ্ধে নই। আমরা নির্দিষ্ট কিছু কাজ ও ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। আমি নিজেও একটি পুরুষতন্ত্রের মধ্যে জন্ম নিয়েছি। আমি নিজেও একটি নির্দিষ্ট ধর্মে জন্মগ্রহণ করেছি। কোনো কোনোদিন আমার মনে হয় আমার নিজের কিছু কাজ বা কথাও এখনো পুরুষতান্ত্রিক রয়ে গেছে। সুতরাং এটি একটি দীর্ঘ যাত্রা, এবং আমার চোখে কেউই পারফেক্ট নারীবাদী নন।

না, আমরা পুরুষবিরোধী নই। আমরা পুরুষতন্ত্রের বিরোধী। আপনি যদি পুরুষতান্ত্রিক হন, আমি আপনার বিরুদ্ধে। আমি যদি পুরুষতান্ত্রিক হই, তবে আমি নিজের সমালোচনাও করবো। সব পুরুষই পুরুষতান্ত্রিক নন। সব পুরুষই বলেন না যে পুরুষতন্ত্র ভালো। এবং সব নারীও বলেন না যে পুরুষতন্ত্র খারাপ। নারীরাও পুরুষতান্ত্রিক হয়। আমার দেশে, জোর করেই হোক কিংবা সম্মতির মাধ্যমে, নারীদেরকে গর্ভের কন্যা শিশুর ভ্রুণ নষ্ট করতে হয়। কারণ সমাজ পুত্র সন্তান চায়, কন্যা সন্তান নয়। নারীরা তাদের কন্যাদের যৌতুক দেন। হতে পারে তারা এটি করতে বাধ্য হন, কিংবা তারা হয়তো এটি করেন কেননা তারাও এতে বিশ্বাসী।

আমরা হলাম সেইসব মানুষের বিরুদ্ধে, যারা নারী ও পুরুষের সমতার বিরুদ্ধে।

একজন নারীবাদীর প্রথম যার সমালোচনা করা উচিৎ, সে হলো তার নিজের সত্তা। আমরা নারীরাও অনেক খেলা খেলি। যখন আমাদের ভালো লাগে, আমরা নারীসুলভ হয়ে যাই। যখন আমাদের ভালো লাগে, আমরা নারীবাদী হয়ে যাই। আমরা চাই আমাদের পুরুষ সহকর্মীরা আমাদের চায়ের বিলটা মেটাক। আমরা চাই তারা আমাদের জন্য তাদের আসনটি ছেড়ে দিক। কিন্তু কেন? আমরা যদি দুর্বল হই, তাহলে ঠিক আছে। কিন্তু যদি ওই পুরুষটি দুর্বল হন, তাহলে আপনার উচিৎ আপনার আসনটি তাকে ছেড়ে দেয়া।

ধর্ষণের শিকার নারীরা এখন আগের চেয়ে বেশি রিপোর্ট করছে, কেননা আমরা এই বার্তাটি ছড়িয়ে দিয়েছি যে একজন নারীর ‘ইজ্জত’ কখনো খোয়া যায় না। যার সেটি খোয়া যায়, সে হলো ধর্ষক। আজকাল গণমাধ্যম এটি নিয়ে বেশি সংবাদ প্রচার করছে কারণ আজকাল নারীরা বেশি বেশি পুলিশ স্টেশনে যাচ্ছেন এবং অভিযোগ দায়ের করছেন। কিন্তু যদি কোনো নারী তার অফিসের ভেতর বস কর্তৃক ধর্ষণের শিকার হণ, তাহলে এখনো একটি সম্ভাবনা আছে যে তিনি হয়তো চুপ করে যাবেন।

তারপরও অনেক নারীই মুখ খুলছেন, কেননা তাদের জন্য আইন আছে, এবং নারীদের আন্দোলনের মাধ্যমেই আইনগুলো প্রণীত হয়েছে। আপনাকে কেউ নিজে থেকে আপনার অধিকার দেবে না। তবে, একদিকে যেমন পুলিশের কাছে বেশি রিপোর্ট হচ্ছে, অন্যদিকে কিন্তু সমাজে রাগ-ক্রোধ-হতাশাও বেড়ে যাচ্ছে। সহিংসতা আজকাল বেশি হচ্ছে, আর তাই সেগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগও উঠছে। আমাদের আন্দোলন যতই বড় হবে, এর বিরুদ্ধে ‘ব্যাকল্যাশ’ আসার সম্ভাবনাও তত জোরালো হবে। এখন হাজার হাজার নারীর চাকরি আছে। তারা শাড়ি পরছেন না, তারা তথাকথিত সামাজিক প্রথা ভেঙে পাঞ্জাবি পরছেন। এজন্য পুরুষরা অখুশি। তাদের বৈধ যৌনতার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের পুরুষরা কোথায় যাবেন বৈধ যৌনতার জন্য? আমাদের সমাজ এটিকে গ্রহণ করে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের বিয়ে হচ্ছে। একজন পুরুষ কোনো নারীর সাথে কথা বলেন। নারীটি তার সাথে ভদ্রভাবে কথা বলেন। আর তখনই তিনি ভেবে নেন, “এখন তার (ওই নারীর) উচিৎ হবে আমার সাথে শোয়ার বা আমাকে বিয়ে করার।” আর যখন ওই নারী না বলে দেন, তখন তিনি আর এটিকে মানতে পারেণ না। কারণ পুরুষ মানেই তো ‘রাজাবেটা’।

তখন ওই পুরুষ এসিড কেনেন, তারপর সেটি ছুঁড়ে দেন নারীটির মুখে। এমনটি ঘটে থাকে অধিকারবোধ আর হতাশার কারণে। আবেগিক বুদ্ধিমত্তা না থাকার ফলে। পরিবার থেকে এ ব্যাপারে কোনো শিক্ষা দেয়া হয় না। যখন ছেলেরা কাঁদে আমরা তাদের বলি, “তুমি ছেলে, তুমি কাঁদবে না।” তাই আমরা তাদের আবেগ প্রকাশের পথ বন্ধ করে দিই। পুরুষরা তাই তাদের নিজেদের ছাড়া অন্য কারোর সাথে কথা বলতে পারেন না। তারা বলতে পারেন না, “আমি সুখী নই, আমি ডিপ্রেসড।” কারণ পুরুষ হিসেবে তাদেরকে সবসময় শক্তিশালী হতে হবে। কিন্তু কোনো মানবসন্তানের পক্ষেই তো সবসময় শক্তিশালী হওয়া সম্ভব না। উইমেন চ্যাপ্টার থেকে সংকলিত

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত