প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বস্তিতে মাদকের সাম্রাজ্য, চোরাচালানিরা বেপরোয়া রাজধানীতে

ডেস্ক রিপোর্ট : করোনায় মৃত্যু আর সংক্রমণের সঙ্গে যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মাদক চোরাচালান। এসব চালানের অধিকাংশই মজুদ করা হচ্ছে ঢাকার বস্তিগুলোতে। করোনা পরিস্থিতি আর ঘনবসতির সুযোগ নিয়ে ঢাকার বস্তিগুলোতে মাদকের সাম্রা জ্য গড়ে তুলেছে চোরাকারবারিরা। চলতি মাসে র‌্যাব, পুলিশ আর মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের চালানো অভিযানে প্রায় পাঁচ লাখ ইয়াবা, সাত হাজার বোতল ফেনসিডিল, প্রায় দুই কেজি হেরোইন ও প্রায় আড়াই শ’ মণ গাঁজা জব্দ হয়েছে। গ্রেফতার হয়েছে প্রায় পাঁচ শ’ মাদক ব্যবসায়ী। এরমধ্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের ভ্রাম্যমাণ আদালত তাৎক্ষণিকভাবে সাজা দিয়েছে ৬০ জনকে। র‌্যাব ও পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলিতে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। তারপরেও বেপরোয়া মাদক ব্যবসায়ীরা। তারা নিত্য নতুন কৌশলে মাদক চোরাচালান অব্যাহত রেখেছে। আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই আবারও কম্বিং অপারেশনে নামছে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ও র‌্যাব। দৈনিক জনকন্ঠ

চলতি মাসেই র‌্যাব সাভারের আশুলিয়ার কুটুরিয়া গ্রামের আলী আকবরের পাঁচ তলা আঁখি ভিলা থেকে ১৯ হাজার ইয়াবা জব্দ করে। গ্রেফতার করা হয় তিন মাদক ব্যবসায়ীকে। যারমধ্যে দুইজনের বাড়ি চট্টগ্রামে। অপরজনের কুষ্টিয়ায়।

র‌্যাব-৩ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মোঃ রাকিবুল হাসান গণমাধ্যম জানান, গ্রেফতারকৃতরা মূলত মাদক সিন্ডিকেটের সদস্য। সারাদেশে তারা মাদক চোরাচালান করে থাকে।

এছাড়া ধানমন্ডি থেকে কুরিয়ার সার্ভিসে করে ফুলের ঝাড়ু মধ্যে আসা ১৫ হাজার ইয়াবাসহ একজনকে, নব্বই কেজি গাঁজা, পাঁচ শ’ ইয়াবা, মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত পিকআপ ও অস্ত্রসহ এক মাদক কারবারি ঢাকার মিরপুর থেকে, কাঁঠাল বোঝাই করে সেই ট্রাকে আলাদা চেম্বার বানিয়ে সাড়ে সাত শ’ বোতল ফেনসিডিলসহ একজনকে, প্রায় আড়াই শ’ গ্রাম হেরোইন ও হেরোইন বিক্রির প্রায় আড়াই লাখ নগদ টাকাসহ এক মাদক ব্যবসায়ী দম্পতি ও উনত্রিশ কেজি গাঁজাসহ দুই মাদক কারবারিকে গ্রেফতার করে র‌্যাব।

র‌্যাবের লিগ্যাল এ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক ও বাহিনীটির গোয়েন্দা শাখার প্রধান লে. কর্নেল সারওয়ার-বিন-কাশেম জানান, মাদক বিরোধী সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রাখা হয়েছে। টেকনাফ, কক্সবাজারসহ মাদক চোরাচালান প্রবণ এলাকাগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে অভিযানে লাখ লাখ ইয়াবা জব্দ হয়েছে। গ্রেফতার হচ্ছে মাদক ব্যবসায়ীরা। অথচ কিছুতেই যেন মাদক চোরাচালান থামানো যাচ্ছে না। বরং করোনা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অভিনব সব কায়দায় মাদক চোরাচালান হচ্ছে।

ইতোমধ্যেই খোদ ঢাকাতেই বনানীর কড়াইল বস্তি এলাকায় ও আগারগাঁওয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে র‌্যাবের গোলাগুলিতে একজন করে দুই কুখ্যাত মাদক ও অস্ত্র ব্যবসায়ী নিহত হয়েছে। অথচ মাদক ব্যবসায়ীরা যেন নির্বিকার। এমন পরিস্থিতি যথেষ্ট উদ্বেগের। নতুন কৌশল নিয়ে অভিযানে নামার পরিকল্পনা চলছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া বিভাগের উপকমিশনার প্রকৌশলী মোঃ ওয়ালিদ হোসেন বলেন, মাদকের বিষয়ে ডিএমপি কমিশনার মোহাঃ শফিকুল ইসলাম জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করার নির্দেশ জারি করেছেন। যেখানে মাদক, সেখানেই সাঁড়াশি অভিযান। প্রয়োজনে জঙ্গী স্টাইলে অপারেশন চালানোর ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের পরিচালক (অপারেশনস) পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) এস এম মাসুম রাব্বানী জানান, করোনাভাইরাস পরিস্থিতির মধ্যেও দেশে মাদক ঢুকছে। এরই প্রেক্ষিতে মাদক নিয়ন্ত্রণে গঠিত স্পেশাল টাস্কফোর্স সারাদেশে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান চালাচ্ছে। র‌্যাব, পুলিশের পাশাপাশি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরও অভিযান অব্যাহত রেখেছে। প্রতিদিন দেশের প্রতিটি জেলায় অভিযান চালানো হচ্ছে। টানা দশ দিন বিশেষ অভিযান চালানো হয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তরফ থেকে। আগামী মাসে আবারও বিশেষ অভিযান চালানোর প্রস্তুতি চলছে।

র‌্যাব, পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের চালানো অভিযানে গ্রেফতার হয়েছে প্রায় পাঁচ শ’ পেশাদার মাদক ব্যবসায়ী। এছাড়া ৬০ জনকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেয়া হয়েছে। উদ্ধার হয়েছে অন্তত পাঁচ লাখ পিস ইয়াবা। হেরোইন, মণে মণে গাঁজা আর ফেনসিডিল। এছাড়া বিজিবি ও কোস্টগার্ড বাহিনী মাদকবিরোধী ধারাবাহিক অভিযান চালাচ্ছে। তারপরেও থামানো যাচ্ছে না মাদক চোরাচালান।

করোনা পরিস্থিতির মধ্যে নতুন নতুন কৌশলে মাদক আসছে। করোনা পরিস্থিতি আর বস্তির ঘনবসতির সুযোগ নিয়ে এসব মাদকের চালান মজুদ করা হচ্ছে বস্তিগুলোতে। কারণ ঘনবসতি হওয়ায় বস্তিগুলোতে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে এই মুহূর্তে অভিযান চালানো ঝুঁকিপূর্ণ। সেই সুযোগটিকেই কাজে লাগাচ্ছে মাদক কারবারিরা।

মাদক নিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সব পর্যায়ে এক ধরনের মারাত্মক অস্থিরতা বিরাজ করছে। পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রই মাদকের ভয়াল থাবার মুখে পড়েছে। মাদকের কারণে দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ঘটছে মাদক সংক্রান্ত নানা অপরাধ। বিশেষ করে চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাই।

মাদকের টাকা যোগাড় করার জন্য সমাজের নিম্ন আয়ের পরিবারের মাদকসক্ত সদস্যের আর কোন বিকল্প নেই। এজন্য তারা জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধে। যা পুরো সমাজ ব্যবস্থাকে দিনকে দিন অস্থির করে তুলছে। মাদকের আগ্রাসন থেকে দেশকে রক্ষা করতে শূট এ্যাট সাইট নীতি অবলম্বন করার নির্দেশনা আছে। সর্বশেষ সেই পন্থায়ই অবলম্বন করা ছাড়া আপাতত আর কোন রাস্তা দেখা যাচ্ছে না। যা দিয়ে দেশে মাদকের আগ্রাসন বন্ধ করা যাবে।

পুলিশ মহাপরিদর্শক ড. বেনজীর আহমেদ ও র‌্যাব মহাপরিচালক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। বলেছেন, শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড। আর সেই মেরুদন্ড ভেঙ্গে দিচ্ছে মাদক। কারণ দেশের প্রায় সব উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকের আগ্রাসন বন্ধ করা যাচ্ছে না। কোন না কোনভাবে মাদক সেখানে হানা দিচ্ছে। একই সঙ্গে মাদক দেশের অর্থনৈতিক মেরুদন্ডও আস্তে আস্তে ভেঙ্গে দিচ্ছে।

প্রসঙ্গত, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের গবেষণা ও নিরোধ শাখার তথ্য মোতাবেক দেশে বর্তমানে সরকারী হিসেবে মাদকাসক্তের সংখ্যা প্রায় এক কোটি। এই এক কোটি পুরোপুরি মাদকাসক্ত। তারা পেশাদার মাদকসেবী। এদের অধিকাংশই ফেনসিডিল, হেরোইন ও ইয়াবায় আসক্ত। আর অনিয়মিত মাদকসেবীর সংখ্যা হালে কোটি ছাড়িয়েছে।

সর্বাধিক পঠিত