প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

করোনা ও প্রবাসী শ্রমিকের দীর্ঘশ্বাস

রাজেকুজ্জামান রতন : করোনা কতো বিষয়কে যে আমাদের সামনে নতুন করে তুলে ধরলো তার ইয়ত্তা নেই। আমরা অনেক কাজ করি, অনেক কিছু দেখি যার কার্যকারণ খেয়াল করি না। যেমন : সিডনি বিশ্ববিদ্যালয় ২৬ জন হবু ডাক্তারের উপর ভিডিও জরিপ চালিয়ে দেখেছে যে গড়ে প্রতি ঘণ্টায় ২৩ বার মানুষ মুখম-লে হাত দেয়। অভ্যাসে এবং অজান্তেই যে মানুষ এ কাজ করে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। করোনা সংক্রমণের ক্ষেত্রে এই মুখে হাত দেওয়ার অভ্যাস মানুষকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে ফলে সতর্কতা বেড়েছে মানুষের। তেমনি মানুষ দিনে কতোবার মুখ দেখে তা নিয়ে জরিপ চালালেও কিছু চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে আসবে। অথচ মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে যে পায়ের উপর ভর করে সেই পা ঘণ্টায় তো দূরের কথা দিনেও কতোবার দেখে তা বলা মুশকিল। মুখের দিকে যতো তাকাই, মুখের যত যতœ নেই পায়ের প্রতি ঠিক ততোটাই যেন অবহেলা। কিন্তু যদি পা ভাঙে বা মচকায় তাহলে বুঝতে অসুবিধা হয় না এর গুরুত্ব কতোখানি। মানুষের ক্ষেত্রে যেমন, রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও এটা তেমনি ব্যাপার। উন্নয়নের গল্পে এবং জৌলুসে যতোখানি মুগ্ধ হই, উন্নয়নটা দাঁড়িয়ে আছে কীসের উপর ভর করে তা খেয়াল করি না এবং কখনো তার মুল্য দিতেও চাই না। কিন্তু যখন উন্নয়নের পা খোঁড়া হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে তখন সম্বিৎ ফিরে আসে।
গত বছরও তারা বৈধ পথেই ১৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন তারা দেশে। হুন্ডি এবং অন্যান্য পথে পাঠানো টাকাকে হিসাবে ধরলে এর পরিমাণ আরও ৪/৫ বিলিয়ন ডলার বেড়ে যাবে। গার্মেন্টস খাতে ৩৪ বিলিয়ন রপ্তানি আয় হয়েছে গত বছর। কাঁচামাল আমদানি, যন্ত্রপাতি কেনার খরচ বাদ দিলে গার্মেন্টস খাতে যা আয় হয় তার চেয়ে দ্বিগুণ বৈদেশিক মুদ্রা আসে প্রবাসীদের মাধ্যমে। দেশে প্রতিবছর ২২ লাখ কর্ম প্রত্যাশী আসে শ্রমের বাজারে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় মাত্র দেড় লাখের মতো কর্মসংস্থান হয়। বিপুল বেকারের কিছু কর্মসংস্থান হয় বেসরকারি খাতে ও স্বকর্ম সংস্থানের মাধ্যমে এবং গড়ে ৭ লাখের মতো কাজের সন্ধানে পাড়ি জমায় দেশের বাইরে। মধ্যপ্রাচ্য এক্ষেত্রে অদক্ষ শ্রমিকদের প্রধান কাজের অঞ্চল। একক দেশ হিসেবে সৌদি আরবে সবচেয়ে বেশি প্রবাসী শ্রমিক কাজ করে। এ সংখ্যাটা প্রায় ২০ লাখ ৮৪ হাজার। সংযুক্ত আরব আমিরাতে আছেন ১৩ লাখ ৭০ হাজার, ওমান মালয়েশিয়ায় আছে ১০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি। এরপর কাতার, কুয়েত, সিঙ্গাপুর ও বাহরাইনে বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করেন। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে ইতালিতে সবচেয়ে বেশি প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজারের মতো বৈধ এবং প্রায় লাখখানেক বৈধ কাগজ ছাড়া প্রবাসী শ্রমিক আছে বলে ধারণা করা হয়। এছাড়া জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ডে বেশ ভালো সংখ্যক প্রবাসী আছেন। আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াতে যেমন প্রবাসী আছেন তেমনি আইসল্যান্ড, সাইপ্রাস বা মালদ্বীপ এবং এ রকম যাওয়ার সুযোগ যেখানে আছে সেখানেই বাংলাদেশি পাওয়া যাবে। তারা দেশ ছেড়েছেন কাজের আশায় বা উন্নত জীবনের আকর্ষণে। কিন্তু যেখানেই তারা যান না কেন শিকড় তো তাদের দেশেই। তাই দেশের ভালো খবরে যেমন উল্লসিত হন খারাপ কিছুতে তাদের প্রাণটাও তেমনি কাঁদে। করোনা যখন বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বিশাল ধাক্কা দিয়েছে তখন প্রবাসীরাও প্রচ- দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কী হবে তাদের এবং তাদের পাঠানো টাকার উপর নির্ভরশীল পরিবারের?
বাংলাদেশের রেমিট্যান্স আসার ক্ষেত্রে শীর্ষ ১৫টি দেশ হলো- সৌদি আরব, আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র, কুয়েত, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, ওমান, কাতার, ইতালি, বাহরাইন, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ আফ্রিকা, ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়া, ও জর্ডান। এর মধ্যে রেমিট্যান্সের ৬০ শতাংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো থেকে ১২.৫ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা থেকে ১১ শতাংশ, এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশ অস্ট্রেলিয়া, জাপান, মালয়েসিয়া, সিঙ্গাপুর থেকে আসে ১১ শতাংশ। এ সব অঞ্চল ও দেশে করোনার প্রভাবে অর্থনীতিতে সংকটের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। যার অবধারিত প্রভাব পড়বে বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকদের জীবনে এবং দেশের অর্থনীতিতে। ইতোমধ্যে কুয়েত, বাহরাইন, মালদ্বীপসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশি কর্মী ফেরত আনার জন্য সে দেশগুলো তাগিদ দিয়েছে বলে জানা গেছে। প্রবাসী আয়ও কমছে এবং ক্রমাগত বাড়ছে আশঙ্কা। এ বছরের মার্চ মাসে প্রবাসী আয় এসেছে ১২৮.৮৬ কোটি ডলার যা গত ২০১৯ সালের মার্চ মাসে ছিলো ১৪৫ কোটি ডলার। আয় কমে যাওয়ার প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করেছে ইতোমধ্যেই। প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতিতে বিভিন্ন ধরনের ভূমিকা পালন করে এসেছে। রাষ্ট্র কাজের ব্যবস্থা করতে পারেনি, তারা কাজ জুটিয়ে নিয়ে দেশের বাইরে চলে গেছেন। বেকারত্বের চাপ কমিয়েছেন, পরিবারের দায় বহন করেছেন, তাদের উপর নির্ভরশীলদের লেখাপড়া করানোর দায়িত্ব নিয়েছেন, বৃদ্ধ বাবা-মা’র আর্থিক দায়িত্ব পালন করেছেন, কৃষিতে পুঁজি এবং প্রযুক্তির সরবরাহ করেছেন, দেশের আভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করেছেন আর আমদানি রপ্তানির ঘাটতি মোকাবিলায় বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ করে অর্থনীতিতে রক্ত সঞ্চালন করেছেন। কিন্তু আজ তারাই রক্তশূন্যতার ঝুঁকিতে পড়ে গিয়েছেন। ঈষৎ সংক্ষেপিত। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত