প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বর্তমান পরিস্থিতিতে মসজিদে আসা না আসার ব্যাপারে মুফতি আব্দুল মালেকের ফতোয়া

মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক : বাংলাদেশে বর্তমান করোনাভাইরাস পরিস্থিতি ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে সব ধরনের জমায়েত বন্ধের পাশাপাশি মসজিদগুলোয় জুমা ও জামাতে সম্মানিত মুসল্লিদের উপস্থিতি সীমিত পরিসরে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন দেশের বিজ্ঞ আলেমরা। ‘মসজিদ বন্ধ থাকবে না তবে সুরক্ষা পদ্ধতি চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত ব্যক্তিরা মসজিদে যাবে না’—অনেকেই আলেমদের এই আহ্বানের ব্যাখ্যা চাইছেন। মূলত মুসল্লিদের উপস্থিতি সীমিত রাখার উদ্দেশ্য হলো, এমন পরিস্থিতিতে যার জন্য মসজিদে আসা উচিত নয় তিনি আসবেন না। তেমনিভাবে যার জন্য না আসার অবকাশ রয়েছে তিনিও আসবেন না।
এমন পরিস্থিতিতে যাদের জন্য মসজিদে আসা উচিত নয় তাঁরা হলেন,
ক. যারা এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।
খ. যাঁরা অন্য কোনো রোগে আক্রান্ত রয়েছেন, কিন্তু আজিমত (শরিয়তের স্বাভাবিক সময়ের বিধান) অবলম্বনের জন্য মসজিদে উপস্থিত হয়ে থাকেন—তাদেরও এমন পরিস্থিতিতে মসজিদে আসা উচিত নয়।
গ. যারা সর্দি-কাশি ও ঠাণ্ডা-জ্বরে আক্রান্ত তারা সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার আগে মসজিদে কোনোভাবেই আসবেন না।
ঘ. ষাট বা তদূর্ধ্ব মুরব্বিদের মসজিদে না আসা উচিত।
ঙ. বিশেষত যেসব মুরব্বি কোনো রোগে আক্রান্ত রয়েছেন তারা একেবারেই মসজিদে আসবেন না।
চ. এ পরিস্থিতিতে নাবালেগ শিশুরা, বিশেষ করে যারা খুব ছোট তারা মসজিদে একেবারেই আসবে না।
ছ. যারা এমন কোনো অঞ্চল বা পরিবেশ থেকে এসেছেন যেখানে এই মহামারি বিস্তার লাভ করেছে, তারাও এমন পরিস্থিতিতে মসজিদে একেবারে আসবেন না।
জ. কোন বিশেষ এলাকা যেমন কোনো বাড়ি, টাওয়ার, পাড়া, মহল্লা ইত্যাদির ব্যাপারে যদি সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কারণে বিশেষ নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয় তাহলে এমন লোকেরাও মসজিদে আসবে না।
উল্লিখিত মুসল্লিরা ঘরে নামাজ আদায় করবেন। অন্তরে মসজিদে উপস্থিত হতে না পারার কারণে আক্ষেপ পোষণ করবেন। ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ তাআলা তাদের আপন শান মোতাবেক সওয়াব দান করবেন।
ঝ. কোনো কোনো মসজিদে এ প্রচলন রয়েছে—যা না হওয়া উচিত, সেখানে নারী মুসল্লিরাও উপস্থিত হয়ে থাকেন। এ প্রচলন এমনিতেই সংশোধনযোগ্য। তথাপি এ পরিস্থিতিতে মসজিদে তাদের উপস্থিত হওয়ার প্রশ্নই আসে না।
অসুস্থ না হয়েও এ অবস্থায় যাদের মসজিদে না আসার অনুমতি রয়েছে তাঁরা হলেন,
ক. যারা কারো শুশ্রূষায় আছেন।
খ. আতঙ্কের কারণে যাকে তার বাবা-মা অথবা স্ত্রী কিংবা ছেলেসন্তানরা বাইরে বের হতে বাধা দিচ্ছে।
গ. আতঙ্কের কারণে যাকে তার প্রতিবেশী, একই ভবনের বাসিন্দা বাধা দিচ্ছে।
ঘ. যিনি নিজে আক্রান্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা বোধ করার দরুন মসজিদে উপস্থিত হওয়ার হিম্মত করতে পারছেন না।
এই মুসল্লিরা ছাড়া অন্যরা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে জামাতে উপস্থিত হবেন। তারপরও যাদের মধ্যে কোনো লক্ষণও নেই এবং পূর্বোক্ত দুই শ্রেণির আওতায়ও পড়েন না উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে তাদের কেউ যদি (পরিবার ও সমাজের সুরক্ষার কথা চিন্তা করে) মসজিদে না আসেন তাহলে আশা করা যায় তাদেরও গুনাহ হবে না।
এই পরিস্থিতিতে যাদের জন্য জামাতে উপস্থিত হওয়া সংগত নয়, তারা জুমাতেও উপস্থিত হবেন না। আর যাদের জন্য জামাতে উপস্থিত না হওয়ার অনুমতি রয়েছে তাদের জন্য জুমাতেও উপস্থিত না হওয়ার অনুমতি রয়েছে। আর এই সময় এ রুখসত (ছাড়) গ্রহণ করায় সওয়াবও বেশি। হাদিসে এসেছে, ‘আল্লাহ এটাও পছন্দ করেন তার দেওয়া রুখসত বান্দা গ্রহণ করবে।’
সুতরাং তারা ঘরে জোহরের নামাজ আদায় করবে। আর জুমার দিনের অন্যান্য আমলের প্রতি মনোযোগী হবে। যেমন সুরা কাহফ তিলাওয়াত করা, বেশি বেশি দরুদ পাঠ ইত্যাদি।
উপস্থিতি সীমিত করার ব্যাখ্যায় কেউ কেউ বলেছেন, ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেম মিলে জামাত করবেন। এটি মসজিদ বন্ধ করে দেওয়ার নামান্তর। এটা সীমিত করার ভুল ব্যাখ্যা। তাই ‘সুরক্ষা নিশ্চিত না হয়ে মসজিদে গমন করবেন না’—এ কথারও অর্থ পরিষ্কার করা প্রয়োজন। এর অর্থ হলো, প্রথমে এটা জেনে নেবে এ মুহূর্তে তার জন্য জামাতে উপস্থিত হওয়া উচিত কি না? না এ মুহূর্তে তার জন্য ঘরে নামাজ আদায় করা উত্তম? যদি সে উল্লিখিত মানুষদের মধ্য থেকে না হন, তবে মসজিদে আসার আগে স্বাস্থ্য বিভাগ ও আলেমদের পক্ষ থেকে বলা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা অবশ্যই অবলম্বন করবে।
তা হলো—ক. ঘর থেকে অজু করে আসবে।
খ. সুন্নত নামাজ ঘরে পড়ে নেবে।
গ. মাস্ক ব্যবহার করবে; বরং শরীরের উপরিভাগ রুমাল ইত্যাদি দিয়ে আবৃত করে নিলে আরো ভালো।
ঘ. মসজিদের ফ্লোরে বিছানোর জন্য এমন কোনো কাপড় নিয়ে যাবে, যাতে ডাস্ট না উড়ে।
ঙ. মসজিদের সম্মুখে যদি হাত ধোয়ার কিংবা স্প্রের ব্যবস্থা থাকে তাহলে তা-ও গ্রহণ করবে।
চ. জামাত শেষ হওয়ার পর সেখানে বিলম্ব করবে না। ফরজপরবর্তী সুন্নতগুলো ও অজিফা-জিকির ঘরে এসে আদায় করবে।
ছ. বর্তমানে মুসাফা-মুয়ানাকা থেকেও বিরত থাকবে।
অন্যদিকে মসজিদ কর্তৃপক্ষের ব্যাপারে যেসব নির্দেশনা রয়েছে তারা সে ব্যাপারে যত্নবান হবেন। বিশেষত মসজিদগুলোর পরিচ্ছন্নতার প্রতি গুরুত্ব দেবেন।
জুমার ব্যাপারে মুরব্বিদের বক্তব্য হলো, খুতবাও সংক্ষিপ্ত হবে, নামাজও। জুমার আগে বাংলা বয়ান জুমার অংশই নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলা বয়ান একেবারে না করলেও কোনো সমস্যা নেই। অবশ্য চার-পাঁচ মিনিটে যদি এ বিষয়ে তাওবা, তাওয়াক্কুল এবং সতর্কতা অবলম্বনের ব্যাপারে দুই-চার কথা বলে দেওয়া হয় তাহলে ভালো।
অনেক মুসল্লি মসজিদে আসেন, তবে কাতারে ফাঁকা ফাঁকা হয়ে দাঁড়ান। কাতারে মিলে মিলে দাঁড়ানো সুন্নত। ফাঁক রেখে দাঁড়ানো মাকরুহ। কিন্তু এমন পরিস্থিতির কারণে এভাবে দাঁড়ানোর অবকাশ হতে পারে।
লেখক: শিক্ষাসচিব, মারকাযুদ্ দাওয়াহ আল ইসলামিয়া(ইসলামী রিচার্স), ঢাকা
সূত্র: মাসিক আল কাউসার, কালের কণ্ঠ,
লেখাটি মাওলানা মুফতি আব্দুল মালেকের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার থেকে গদ্যরূপ দিয়েছেন আবরার আবদুল্লাহ

সর্বাধিক পঠিত