প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিএনপির লন্ডন আন্দোলন কি খালেদার মুক্তির প্রধান অন্তরায়?

সাইদুল ইসলাম, লন্ডন: দীর্ঘ দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দুর্নীতির একটি মামলায় কারান্তরীন। খালেদা জিয়াসহ মোট ছয়জনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ৩রা জুলাই ঢাকার রমনা থানায় মামলাটি করেছিলো সেনা সমর্থিত তত্বাবধায়ক সরকারের দুর্নীতি দমন কমিশন। দীর্ঘ ১০ বছরের আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের টানা দ্বিতীয় মেয়াদের শেষের দিকে আদালতের রায়ে বেগম খালেদা জিয়া ৫ বছরের কারাদন্ডে দন্ডিত হন।

এই রায়ের পর থেকে বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতারা বেগম জিয়াকে মুক্ত করার লক্ষ্যে সামান্য সভা সমাবেশ ও লোক দেখানো অনশন ব্যতিত রাজপথে উল্লেখযোগ্য কোন ভূমিকা রাখতে পারেনি।গড়ে তুলতে পারেনি কোন আন্দোলন। অবশ্য এজন্য বেগম জিয়ার অবর্তমানে নেতৃত্বের শূন্যতা ও তৃণমূল নেতাকর্মীদের সংগঠিত না করতে পারাকে দায়ী করা হয়। তার পরও বেগম জিয়ার আইনজীবীরা আইনি পথে তাঁকে কারামুক্ত করার প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু রাষ্ট্র শক্তির সাথে কোনভাবেই তারা কুলিয়ে উঠতে পারছেন না।

বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠন রাজপথে দাঁড়াতে না পারলেও দলটির যুক্তরাজ্য শাখা সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। এই পালন করতে পারার একমাত্র কারণ যুক্তরাজ্যে সকল দল মতের মানুষের মতামত প্রকাশ করার স্বাধীনতা রয়েছে। কিন্তু বিএনপির প্রবাসের একটি শাখা যত কঠোর আন্দোলনই করুক না কেন, খালেদা জিয়ার কারামুক্তিতে এর খুব একটা প্রভাব পড়বে না। তবে এই আন্দোলনে ইতিবাচক কোন প্রভাব না পড়লেও বিরুপ প্রভাব পড়েছে ঠিকই।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে বসবাসের সুবাদে যুক্তরাজ্য বিএনপি অনেকটাই চাঙ্গা। নেতার মনোরঞ্জনের জন্যই হোক বা দলীয় দায়িত্ববোধ থেকে হোক যুক্তরাজ্য বিএনপি প্রতিনিয়ত ঘরোয়া সভা সমাবেশের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লন্ডনে আসলেই তারা তাঁকে প্রতিহতের ঘোষণা দেয়। প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান স্থল হোটেল কিংবা তাঁর অনুষ্ঠান স্থল এবং তিনি যেখানেই যান না কেন সেখানে অবস্থান নেয় যুক্তরাজ্য বিএনপি। তারা প্রতিবাদী নানা বাক্যের ব্যানার প্রদর্শনের পাশাপাশি বিক্ষোভ দেখায়। সেখানে বিএনপির মোকাবেলায় পাল্টা অবস্থান নেয় যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগও। লন্ডনের মত সভ্য শহরে বাংলাদেশী রাজনীতির দু’পক্ষের মুখোমুখি অবস্থান, এক পক্ষ অপর পক্ষকে ডিম ছুড়ে মারা ও অশ্লীল বাক্য বিনিময় প্রায়ই সংঘর্ষের কাছাকাছি চলে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বেশ বেগ পোহাতে হয় লন্ডন পুলিশেকে। গণতন্ত্রের খাতিরে লন্ডন প্রশাসন এসব মারমুখী আন্দোলন কিংবা প্রতিরোধ নিষিদ্ধ না করতে পারলেও এহেন আচরণ তাদেরকে বিব্রত করে। এভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যতদিন লন্ডনে থাকেন প্রতিদিনই বিএনপি বিক্ষোভ প্রদর্শন করে আর আওয়ামী লীগ তা মোকাবেলায় রাস্তায় থাকে। এই চিত্র গত ১১ বছরের।

কিন্তু গতবছরের ১লা মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চোখের চিকিৎসার জন্য লন্ডন আসলে যুক্তরাজ্য বিএনপি হিথ্রো বিমানবন্দর এলাকায় বিক্ষোভ করার পাশাপাশি হোটেলে আসার পথে রাস্তায় প্রধানমন্ত্রীর গাড়ী বহর গতিরোধ করার চেষ্টা করে। এই ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী ক্ষুব্ধ হন। সেন্ট্রাল লন্ডনের ক্লারিজ হোটেলের সামনে প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য দাঁড়িয়ে থাকা যুক্তরাজ্য আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাজিদুর রহমান ফারুকের মোবাইলে ফোন দেন।

প্রধানমন্ত্রীর সেদিনের ফোনালাপ আওয়ামীলীগের নেতা কর্মীদের দ্বারাই ফাঁস হয়ে যায়। ক্ষুব্ধ স্বরে প্রধানমন্ত্রীকে সেদিন বলতে শোনা যায় “আর ঐ বিএপিরে জানাই দিয়েন যে তারেক জিয়া যদি বেশি বাড়াবাড়ি করে আমার সাথে, তার মা জীবনেও জেল থেকে বের হবে না। কারণ শেখ হাসিনাকে চাপ দিয়ে কোন কিছু আদায় করা যায় না, তার বুঝা উচিত। তাদের এমপিরা জয়েন করছে। তাদের একটি ডিমান্ড ছিলো তার চিকিৎসার টিকিৎসার। আমরা কনসিডার করতে রাজি। আমার সাথে অনেকে দেখা করছে। কিন্তু আমি এখানে আসার পর যদি তারা বেশি বাড়াবাড়ি করে, আমি তাদের বলবো সরি। তোমাদের লোকরা আমার সাথে বেয়াদবি করছে। আমি দিবো না সরি”।

বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর সেদিনের ফোনালাপ প্রমাণ করে যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেগম জিয়ার মুক্তি ও চিকিৎসার ব্যাপারে ইতিবাচক ছিলেন। কিন্তু তারেক রহমানের ছত্রছায়ায় বিএনপির লন্ডন আন্দোলন সেখানে প্রধান অন্তরায়। একই সাথে দেশের প্রধান নির্বাহী হিসেবে বিচারাধীন বিষয়ে এমন কর্তৃত্বপরায়ন বক্তব্য প্রমাণ করে আদালত কতটা স্বাধীন? বেগম জিয়ার জামিন শুধু মাত্র যে আইনি ব্যাপার নয়, তা ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছা অনিচ্ছার উপর অনেকাংশেই নির্ভরশীল।

সর্বাধিক পঠিত