প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

চিত্রাপাড়ের অভিষেক এখন মাশরাফির যোগ্য উত্তরসূরি!

স্পোর্টস ডেস্ক : বাংলাদেশ ওয়ানডে দলের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজার নড়াইলে জন্ম হল অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপজয়ী বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের আরেক উদীয়মান নক্ষত্র ‘অভিষেক দাস’ বা নতুন মাশরাফির। তবে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের নিকট ‘অরণ্য’ নামে পরিচিত।

তার বাড়ি নড়াইলের কুড়িগ্রামে তৎকালীন জমিদারদের চিত্রা নদীর পাড়ে বাঁধানো ঘাট চত্বরে। অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে দলে ছিলেন না অভিষেক দাস। কিন্তু ফাইনালে তাকে দলে নিয়েই বাজিমাত করেছে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল। তিনিই দলকে প্রথম ব্রেক থ্রু এনে দেন। ম্যাচে নেন ৩ উইকেট।

তার দারুণ পারফরম্যান্স বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় বড় অবদান রেখেছে। এ জন্য অভিষেকের নিজ এলাকা নড়াইলে বইছে আনন্দের বন্যা। শুনুন এই ক্রিকেটারের উঠে আসার গল্প।

২০০১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর জন্ম নেয়া অভিষেক ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে এবার ‘ব্যবসায় শিক্ষা’ শাখায় উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবে। এসএসসিতে ‘এ’ গ্রেড পেয়েছিল সে। বাবার নাম অসিত দাস, মা করুণা দাস।

অভিষেকের জন্য মাশরাফির অবদান অনেক। তিনি সব সময় অভিষেকের খোঁজ নেন। চিত্রা নদীতেই সাঁতার কেটে দুরন্তপনায় বেড়ে উঠেছেন জীবিত ক্রিকেট কিংবদন্তি মাশরাফি বিন মুর্তজা তথা ‘কৌশিক’। এই চিত্রাপাড়েরই আরেক ছেলে অভিষেক দাস।

কৌশিকের মতো অরণ্যও ছোটবেলা থেকেই ভীষণ ডানপিটে ছিল। দল বেঁধে খেলাধুলা আর বাড়ির পাশে চিত্রা নদীতে সাঁতার কাটা ছিল নিত্যদিনের কাজ। তাই প্রায়ই ছোটখাটো দুর্ঘটনার মুখোমুখি হতো। এ নিয়ে পরিবারের শাসনেরও কমতি ছিল না। বাবা-মা বেশি রাগ করলে চলে যেত পাশে জ্যেঠুর (চাচা) বাড়ি। নয়তো কোনো বন্ধুর বাড়িতে। ক্রিকেটার অভিষেক দাসের শুরুটা হয়ে ছিল ব্যাডমিন্টন দিয়ে।
তিনবারের জেলা চ্যাম্পিয়ন অভিষেক দাস নড়াইলে জেলা পর্যায়ে ব্যাডমিন্টন খেলেছিলেন ২০১২ সালে। সেখান থেকেই তার ক্রিকেটার হওয়ার পথটা তৈরি হয়। ৬ ফুট দীর্ঘ অভিষেককে দেখে মুগ্ধ হন তার বাবার বন্ধু ক্রিকেট কোচ সৈয়দ মনজুর তৌহিদ তুহিন।

তিনি ওই টুর্নামেন্ট চলাকালীন অভিষেকের বাবা অসিত দাসকে বলেন, ছেলেকে ক্রিকেটে দিতে। রাজী হয়ে যান অসিত দাস। এভাবে অভিষেকের ক্রিকেট হাতেখড়ি সৈয়দ মনজুর তৌহিদ তুহিনের হাতে, যিনি স্থানীয় বেসিক ক্রিকেট একাডেমির কোচ।

এ পর্যায়ে অভিষেকের আসার পেছনে সঞ্জীব বিশ্বাস সাজুর অনেক অবদান, তিনি নড়াইল জেলা দলের কোচ এবং মাশরাফির হাতে গড়া ‘নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশনের’ সহকারী কোচও। তিনি মাশরাফিরও খুব ভালো বন্ধু। তার অধীনে অনুশীলন করেই অভিষেকের এতদূর আসা।

জেলার আরেক ক্রিকেট কোচ ইমরুল কায়েস, তুহিনের হাতে হাতেখড়ির পর প্রাথমিক ঘষামাজার কাজটা করেছেন সাজু ও ইমরুল।
২০১২ সালে নড়াইল জেলার হয়ে অনূর্ধ্ব-১৪ দলে খেলা শুরু এই তরুণের। এরপর বয়সভিত্তিক যত খেলা হয় সবগুলোই খেলেছেন তিনি। অভিষেকের ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট হচ্ছে অনূর্ধ্ব-১৫ দলে খুলনা জেলার হয়ে খেলা। ওখানে ভালো খেলে অনূর্ধ্ব-১৭ দলে সুযোগ পেয়ে যান। অবশ্য অনূর্ধ্ব-১৭ দলে ভালো কাটেনি তার। তারপরও সুযোগ হয় অনূর্ধ্ব-১৮ নড়াইল জেলা দলে। ওখান থেকে অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে চ্যালেঞ্জ সিরিজে ডাক পান তিনি।

ডাক পেয়ে ভীষণ বিপদে পড়ে যান তিনি। কারণ তখন তার এসএসসি পরীক্ষা চলছিল। তবে ভাগ্য ভালো, পরীক্ষার সঙ্গে মিলিয়ে খেলতে পেরেছিলেন। চ্যালেঞ্জ সিরিজের ওই ম্যাচের প্রথম ইনিংসে ৩ উইকেট পান তিনি। ওখানে ভালো করেই অভিষেক দাস অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ক্যাম্পে সুযোগ পান।

অনূর্ধ্ব-১৯ পুরো বিশ্বকাপে ফাইনালের আগে ম্যাচ খেলেছেন মাত্র একটি, তাও আবার গ্রুপ পর্বে পাকিস্তানের বিপক্ষে বৃষ্টিতে পরিত্যক্ত হওয়া ম্যাচে হাতে নিতে পারেননি বল। এরপর কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল না খেলা অভিষেক দাস বাড়তি পেসার ভাবনায় বাঁহাতি স্পিনার হাসান মুরাদের জায়গায় সুযোগ পান ফাইনালে।

শরিফুল-সাকিবরা গতির ঝড়ে ভারতীয় দুই ওপেনারকে যখন নাকাল করে ফেলেছে তার সুবিধা নিয়ে প্রথম ব্রেক থ্রুটা এনে দেন অভিষেকই। ফাইনালে ৯ ওভারে ৪০ রান খরচায় দলের পক্ষে সর্বোচ্চ ৩ উইকেট শিকার মাশরাফির উত্তরসূরি নড়াইলের এই ডানহাতি মিডিয়াম পেসারের।

বিশ্বচ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ দলের এই গুরুত্বপূর্ণ সদস্য দেশে ফিরে পায় বিসিবির উষ্ণ অভ্যর্থনা, ভক্ত-সমর্থকদের ভালোবাসা। নিজ বাড়ি ফিরে সিক্ত হন এলাকাবাসীর ভালোবাসায়।

অভিষেক ক্রিকেট খেলার জন্য পরিবারের বাধা পাননি, বরং সমর্থনই পেয়েছেন সব সময়। ভারতের হার্দিক পান্ডিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার শেন ওয়াটসনকে ভালো লাগে তার। তবে মাশরাফিই অভিষেকের আসল অনুপ্রেরণা। মাশরাফির মতোই বড় ক্রিকেটার হয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে দীর্ঘদিন খেলতে চান দেশের হয়ে।

ক্রিকেটে আসার পেছনে আপনার বড় প্রেরণা কি মাশরাফি বিন মুর্তজাই এমন প্রশ্নের উত্তরে অভিষেক বলেন, ‘নড়াইলে জন্ম বলে মাশরাফি ভাইকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। ফলে তার জীবনযাপন, তার খেলা আমাকে মুগ্ধ করত। প্রায়ই তার সঙ্গে কথা বলি, পরামর্শ নেয়ার চেষ্টা করি। তার অভিজ্ঞতা থেকে কিছুটাও যদি নিতে পারি, সেটা আমার ক্যারিয়ারে অনেক কাজে দেবে। মাশরাফি ভাইয়ের মতো হতে পারব কিনা জানি না। তবে স্বপ্ন দেখি মাশরাফির ভাইয়ের মতো দেশসেরা পেসার হওয়ার। তার মতো ভালো মানুষও হতে চাই।’

অভিষেকের গর্বিত পিতা অসিত দাস বলেন, ‘বাংলাদেশ জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দলে সে খেলবে স্বপ্নেও ভাবিনি। খুলনা স্টেডিয়ামে যখন ট্রায়াল হয় তখনও ভাবিনি অরণ্য টিকে যাবে। ঈশ্বরের কৃপায় চূড়ান্ত পর্যায়ের অনুশীলনে যখন ঢাকায় যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে তখন মনে মনে ভাবতে শুরু করি ও একটা কিছু করে ফেলবে।’

নড়াইল জেলা প্রশাসক আনজুমান আরা বলেন, ‘মাশরাফির শহরে আরেক গুণী ক্রিকেটারের জন্ম হল।’ তিনি অভিষেকের জন্য দোয়া কামনা করেন।

এ দিকে মাশরাফির ধন্যবাদ পেলেন অভিষেককে তৈরির আড়ালে যারা। নিজ শহরের ছেলে বলে অভিষেকের প্রতি মাশরাফির দুর্বলতা একটু বেশিই হওয়ার কথা।

বিশ্ব জয় করে অভিষেকের বাড়ি ফেরার খবর জেনেছেন, তারও আগে থেকে জানেন কাদের সরাসরি অবদানে অভিষেকদের মতো ক্রিকেটারদের উঠে আসা। অভিষেকের সাফল্য মাশরাফিকে সুযোগ করে দিয়েছে তাদের সামনে আনার।

অভিষেক দাসের নড়াইল ফেরার কয়েক ঘণ্টা পর নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে মাশরাফি লিখেন, ‘অভিষেক বাড়ি ফিরেছে বাংলাদেশকে গৌরবান্বিত করে, বাড়ি ফিরেছে নড়াইলবাসীকে গৌরবান্বিত করে, ছুটে চল তোমরা অবারিত, দেশকে নিয়ে যাও অনন্য উচ্চতায়। তুহিন কাকা, সঞ্জিব বিশ্বাস সাজু, ইমরুল ধন্যবাদ আপনাদের, আপনাদের জন্য আজ এত স্বপ্ন দেখে সবাই।’

অভিষেকও নড়াইলে প্রবেশের পরই চলে যান মাশরাফির বাড়ি। সেখানে তাকে মিষ্টি খাইয়ে আনন্দ প্রকাশ করেন মাশরাফির বাবা গোলাম মর্তুজা স্বপন ও মা হামিদা বেগম বলাকা।

এ দিকে অভিষেক দাস অরণ্যকে নিয়ে নড়াইলবাসীর আনন্দের শেষ নেই। যুব বিশ্বকাপ বিজয়ের পর থেকে প্রতিদিন অভিষেকদের বাড়িতে বিভিন্ন পেশার মানুষের ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জেলা শহরসহ গ্রামাঞ্চলে সর্বত্র চলছে ’অভিষেক বন্দনা’। সবার মুখে একটিই কথা-ক্রিকেট বিশ্বের ‘জীবন্ত কিংবদন্তি মাশরাফির যোগ্য উত্তরসূরি ’আমাদের অভিষেক তথা অরণ্য’।- -যুগান্তর

সর্বাধিক পঠিত