প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘নোবেল করোনাভাইরাস’ ছোঁয়াচে রোগ, রয়েছে ঝুঁকি

ইনকিলাব : রোগের নাম ‘নোবেল করোনাভাইরাস’। এটা কোনো খ্যাতিমান পুরস্কারের নাম নয়। এটা ছোঁয়াচে রোগ। পৃথিবীর প্রান্তের কোনো দেশে নতুন রোগের প্রাদ্যুভাব ঘটলে সে রোগের ঝুকিতে পড়ে গোটা পৃথিবীর মানুষ। অতীতে এমন অনেক নতুন নতুন রোগ পৃথিবীর এক দেশ থেকে আরেক দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এবার চীনে দেখা দিয়েছে ‘নোবেল করোনাভাইরাস’ নামের নতুন রোগ। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এ রোগ নিয়ে ইতোমধ্যেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করে দিয়েছেন। এই নতুন রোগ ‘নোবেল করোনাভাইরাস’ এর ঝুঁকিতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও রয়েছে। স¤প্রতি চীনের হোবে প্রদেশের হুওয়ান শহরে শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত (নিউমোনিয়া) এ রোগটি চিহ্নিত হয়। মার্স-করোনা ভাইরাসের মতো এ ভাইরাসের আক্রমণে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের জ্বর অনুভূত হয়। জ্বরের তীব্রতা বাড়লে শ্বাসকষ্ট হয়। এরপর নিউমোনিয়া হয় বা হতে পারে। রোগটি ছোঁয়াচে। তবে নতুন এ চীনা ভাইরাস পশু-পাখি নাকি সামুদ্রিক মাছ থেকে সংক্রমিত হচ্ছে সেটি এখনও নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়নি। চীনে এর প্রকোপ ক্রমশ বাড়ছে। ইতোমধ্যেই এ রোগে আক্রান্ত হয়ে চীনে ৩ জনের মৃত্যু ও গতকাল পর্যন্ত ১৩৯ জনসহ কমপক্ষে ২০০ জনের অসুস্থ হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে এ ভাইরাসটি সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় ছড়িয়েছে।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অতিরিক্ত মহাপরিচালক এবং পরিচালক ‘রোগ নিয়ন্ত্রণ’ প্রফেসর ডা. সানিয়া তাহমিনা বলেন, নোবেল করোনাভাইরাস’র তথ্য পেয়েছি। ইতিমধ্যে এ বিষয়ে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আইইডিসিআর’র পরিচালক ডা. সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, এ রোগের সম্পর্কে স্বাস্থ্য-কর্মীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। বিমান বন্দরে স্থাপিত হেলথ ডেস্কে এসব কর্মীদের পাঠানো হচ্ছে। যেসব ফ্লাইট চীন থেকে আসছে সেসব ফ্লাইটের যাত্রীদের স্ক্যানিং করা হচ্ছে।

এদিকে সিঙ্গাপুর ও হংকংয়ের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে তাদের দেশের ৩টি বিমানবন্দরে নজরদারি বাড়িয়েছে। দেশগুলো যাত্রীদের শরীরে ভাইরাস শনাক্তের কাজ শুরু করেছে। পূর্ব এশিয়া থেকে যাওয়া যাত্রীদের শরীরের তাপমাত্রা মাপা হচ্ছে। দেখা হচ্ছে কোনও ভাবে তাদের শরীরে সংক্রমণ আছে কি না। এর আগে একাধিক ভাইরাসের আক্রমণে মহামারি হয়েছে চীন সহ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে ইতিমধ্যে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চীন ভ্রমণ শেষে আসা দেশি-বিদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যেহেতু রোগটি সংক্রমিত হয়, তাই সবারই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। বিশেষ করে, হাঁচি-কাশির সময় রুমাল-টিস্যু-গামছা দিয়ে নাক-মুখ ঢেকে নেয়া। হাঁচি-কাশিরত ব্যক্তি থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করা। প্রয়োজনে মাস্ক ব্যবহার করা। বারবার দুই হাত সাবান-পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলা। সব ধরনের ফলমূল ভালো করে ধুয়ে খাওয়া।

গত কয়েক দিন ধরেই অজানা অসুখে ভুগছে চীনের বিভিন্ন এলাকার মানুষ। প্রাথমিক ভাবে অসুখের কারণ বের করতে পারছিলেন না বিশেষজ্ঞরা। পরে আবিষ্কার হয় নতুন একটি ভাইরাসের। তার জেরেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন মানুষ। তবে এখনও পর্যন্ত ভাইরাসটির কোনও প্রতিষেধক বের করা যায়নি। সাধারণ ওষুধ দিয়েই রোগের সঙ্গে লড়াই চালাচ্ছেন চিকিৎসকেরা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও বা হু) জানিয়েছে, ভাইরাসটি অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ পর্যন্ত ভাইরাসটিতে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা দেড় হাজার ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছে বিজ্ঞানীরা। তাদের মতে, সম্ভবত কোনও পশুর শরীর থেকেই এই সংক্রমণ মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে। কী ভাবে এর হাত থেকে বাঁচতে হবে তা নিয়ে নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, দ্রুত এই ভাইরাস ছড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, ভাইরাসটি অসম্ভব ছোঁয়াচে। অতি সহজেই তা একজনের শরীর থেকে অন্য লোকের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গত ১০ জানুয়ারি চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জন্য নতুন এ রোগের প্রকোপ থেকে রক্ষা পেতে কী কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন সে সম্পর্কে অন্তবর্তীকালীন গাইডলাইন প্রণয়ন করেছে। গাইডলাইনে কীভাবে অসুস্থ ব্যক্তিদের পর্যবেক্ষণ করতে হবে, নমুনা পরীক্ষা করা, রোগীর চিকিৎসা, স্বাস্থ্য কেন্দ্রসমূহে সংক্রমণ প্রতিরোধ, চিকিৎসাসামগ্রীর পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা ও নতুন এ ভাইরাসটি সম্পর্কে জনসচেতনতার ওপর গুরত্বারোপ করা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ চীন থেকে সরাসরি ফ্লাইটে আসা যাত্রীদেরকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছে।

বাণিজ্যসহ বিভিন্ন কারণে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের নিয়মিত ফ্লাইটে যাত্রী যাতায়াত করায় নতুন ধরনের ভাইরাসজনিত এ রোগটি বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুসারে সতর্কতামূলকভাবে এখনই ‘নোবেল করোনাভাইরাস’ এর সংক্রমণরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন রোগতত্ত¡ বিশেষজ্ঞরা।

সরকারের রোগতত্ত¡, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক প্রফেসর ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, স¤প্রতি চীনের হুওয়ান শহরে দেখা দেয়া নতুন ধরনের ভাইরাসজনিত ‘নোবেল করোনাভাইরাস’ এর সংক্রমণরোধে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

তিনি বলেন, চীন ও হংকং থেকে ফ্লাইটযোগে নিয়মিত যাত্রী আসা যাওয়া করায় এ রোগে সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে। তাই এখন থেকেই চীন ও হংকংয়ের ফ্লাইটে আসা যাত্রীদেরকে বিশেষ ধরনের স্বাস্থ্যকার্ড সরবরাহ করার মাধ্যমে স্ক্রিনিং করা, শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত সমস্যাসহ নতুন এ রোগের উপসর্গ রয়েছে কি না, তা যাত্রীদের কাছ থেকে জানার উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল এবং ক্লিনিকের চিকিৎসকদেরকে নতুন এ রোগটি সম্পর্কে অবহিত করতে হবে। পাশাপাশি জনগণের মাঝেও এ রোগ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, অধিদফতরের সংক্রমণ ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ (সিডিসি) শাখার উদ্যোগে এ রোগটি সম্পর্কে গণমাধ্যমকে অবহিত করতে গতকাল হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি ওরিয়েন্টশেন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। আইইডিসিআর বলছে, তারা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করছে, কারণ চীন থেকে আসা সব বিমান এই বিমানবন্দর দিয়েই ওঠানামা করে। এছাড়া অন্যান্য বন্দরেও চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে জানাচ্ছে সংস্থাটি।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অতিরিক্ত মহাপরিচালক এবং পরিচালক ‘রোগ নিয়ন্ত্রণ’ প্রফেসর ডা. সানিয়া তাহমিনা বলেন, নোবেল করোনাভাইরাস’র তথ্য আমরা পেয়েছি। ইতিমধ্যে এ বিষয়ে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষ করে যারা চীন থেকে আসছেন- এমন পর্যটকদের হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিশেষ ‘থার্মাল স্ক্যানার’র ভেতর দিয়ে আসতে হবে। তাদের শরীরে জ্বরের অস্তিত্ব পাওয়া গেলে নিরাপত্তামূলক পরীক্ষা করা হবে।

বাংলাদেশে এখনো করোনাভাইরাসে কারো আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করে আইইডিসিআর’র পরিচালক ডা. সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, স্বাস্থ্য-কর্মীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। বিমান বন্দরে স্থাপিত হেলথ ডেস্কে এসব কর্মীদের পাঠানো হচ্ছে। যেসব ফ্লাইট চীন থেকে আসছে সেসব ফ্লাইটের যাত্রীদের স্ক্যানিং করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, যারা শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা- জ্বর, কাশি, গলাবাথ্যা এসব নিয়ে আসছেন তাদের চেক করা হচ্ছে। আইইডিসিআর চারটি হটলাইনও খুলেছে। তারা বলছে, উল্লেখিত ল²ণগুলো কারো মধ্যে দেখা গেলে এসব হটলাইনে ফোন করে জানানোর জন্য। নম্বরগুলো হচ্ছে: ০১৯৩৭১১০০১১, ০১৯৩৭০০০০১১, ০১৯২৭৭১১৭৮৪ এবং ০১৯২৭৭১১৭৮৫।

আইইডিসিআর বলছে, কারো শরীরে এর কোন লক্ষণ দেখা গেলে তারা নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করে দেখবেন। এছাড়া বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন, এয়ারলাইন্সগুলো এবং এভিয়েশনে কাজ করা সবাইকে সচেতনও করছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা।

বিমানবন্দরে যে এলইডি মনিটর রয়েছে সেখানে রোগের লক্ষণগুলো জানানো হচ্ছে এবং এবং কারো যদি এই লক্ষণগুলো থাকে তার হেলথ ডেস্কে যোগাযোগ করতে বলা হচ্ছে।

ডা. সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আমাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে এবং তারা আশঙ্কা করছে মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে পারে তবে এখনো এত বৃহৎ পরিসরে ভাবছে না সংস্থাটি। এবং ভাইরাসটা ছোঁয়াচে কিনা সে ব্যাপারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিশ্চিত করে কিছু বলেনি।

তিনি বলেন, যখন শ্বাসতন্ত্রের অসুখ হয় তখন হাঁচি, কাশি থেকে আরেক জন সংক্রমিত হতে পারে এটা ভেবে নিয়েই আমরা আমাদের প্রস্তুতি নিচ্ছি। কারণ যদি একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে ছড়ায় তাহলে অতি দ্রুত সংক্রমণের আশঙ্কা রয়েছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত