প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

adv 468x65

ইতিহাসের এঞ্জিন : শ্রেণিসংগ্রাম নয় অন্য কিছু-১

মাসুদ রানা : আমার টিন এইজের শেষ দিকে আমি ধর্মীয় ডগমা ছেড়ে একটা যুক্তিযুক্ত ও প্রমাণসিদ্ধ বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির অনুসন্ধান শুরু করি। কারণ জগত ও জীবন সম্পর্কে নানা ধর্মের প্রাপ্ত ব্যাখ্যাসমূহের কোনোটিই আমাকে তৃপ্ত করতে পারছিলো না। কারণ যেটার সত্যতা নিয়ে আমার উন্মুক্ত প্রশ্ন, সেটির সত্যতার প্রমাণ দেয়া হতো তারই দোহাই বা রেফারেন্স দিয়ে। অর্থাৎ, ধর্ম যে সত্য বলছে, তার প্রমাণ কি? ধর্মের উত্তরটা হচ্ছে : ‘কারণ ধর্মে এ কথা লেখা আছে’। এর অর্থ হলো : ‘বিশ্বাস করতে হবে… বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহু দূর!’ কিন্তু আমি তৃষ্ণার্ত ছিলাম যুক্তিযুক্ত ও প্রমাণসিদ্ধ জ্ঞানের। বিশ্বাস-চাওয়া কোনো কাহিনীর জন্য আমি তৃষ্ণার্ত ছিলাম না। ফলে, আমি জগত ও জীবনের অর্থ খুঁজতে অস্থির হয়ে পড়ি এবং যা পাই-তাই পড়তে শুরু করি এবং জ্ঞানী-প্রত্যক্ষিত মানুষের সংস্পর্শে এলেই তর্ক জুড়ি। দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়, কিন্তু কেউই আমার তৃষ্ণা মেটাতে পারেনি। হঠাৎ আমার ঊনিশ বছর বয়সে আমি হাতের কাছে পাঁচটি বই পেলাম : ‘মানুষের ঠিকানা’, ‘পৃথিবীর ঠিকানা’, ‘মহাকাশের ঠিকানা’, ‘ডায়ালেক্টিক বস্তুবাদ পরিচিতি’ ও ‘ঞযব ঙৎরমরহ ড়ভ ঃযব ঋধসরষু, চৎরাধঃব চৎড়ঢ়বৎঃু ধহফ ঃযব ঝঃধঃব’. দিন নেই, রাত নেই, ঘুম নেই, খাওয়া নেই, দাওয়া নেই আসক্ত হয়ে বইগুলো পড়লাম। এই বইগুলো পড়ার পর আমার যেন পুরানো তৃষ্ণা মিটে নতুন এক তৃষ্ণার সৃষ্টি হলো, পুরানো অস্থিরতা মিলিয়ে গিয়ে যেন এক নতুন অস্থিরতা তৈরি হলো। তবে চোখের সামনে দীর্ঘকালের কুহেলিকা ঘুচে সেখানে দিগন্তহীন একটি আলোকিত পথ দেখতে পেলাম। অসীম সে পথ। কিন্তু পথ আছে জেনে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পদক্ষেপে চলতে শুরু করলাম।

সেই চলার পথে আমার পাঠের রুচি বিস্তৃত হলো। বাংলা সাহিত্য, ইংরেজি সাহিত্য, বিশ্ব সাহিত্যের অনুবাদ, পাশ্চাত্য দর্শন, প্রাচ্য দর্শন, কোরআন, হাদিস, বাইবেল, বেদ, গীতা, মহাভারত, রামায়ণ, সুফিবাদ, ভক্তিবাদ, দ্বৈত-অদ্বৈতবাদ, মার্কসবাদ, লেনিনবাদ, মাওবাদ, শিবদাস ঘোষের চিন্তা, ওয়াহাবীবাদ, ইতিহাস, বিজ্ঞান, অর্থনীতি, রাষ্ট্রতত্ত্ব, সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, যা পাই তাই আগ্রহের সঙ্গে পড়তে শুরু করি। ইতিমধ্যে আমি নিজেকে মার্কসবাদী হিসেবে ভাবতে শুরু করি। মার্কসবাদের মৌলিক বইগুলো পড়ার জন্য বাংলার উপর নির্ভর না করে ইংরেজির উপর নির্ভর করতে শুরু করলাম। ততোক্ষণে আমি সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হই দারুণ একটি স্বপ্ন ধারণ করে। কিন্তু ইতোমধ্যে ইতিহাস সম্পর্কে মার্কসবাদের ব্যাখ্যায় আমি তৃপ্তিহীনতায় ভুগতে শুরু করলাম। লক্ষ্য করলাম, এখানেও ধর্মের মতোই একটা ডগমা, অসহিষ্ণুতা, শ্রেষ্ঠত্বের দাবি, বিজ্ঞানের বিজ্ঞান দাবি, পাঠের চিন্তার ক্ষেত্রে নির্দেশনা, চিন্তার রেজিমেন্টেশন।

আমি আবার অস্থির হয়ে উঠলাম। আমার বয়স তখন তেইশ বছর। আমি নিজেকে প্রশ্ন করলাম : ঐতিহাসিক বস্তুবাদ তথা মার্কসবাদ অনুসারে শ্রেণি সংগ্রাম যদি মানুষের ইতিহাসের এঞ্জিন হয়, মানব সমাজ যদি আদিতে শ্রেণিহীন তথা শ্রেণি সংগ্রামহীন হয় এবং বিকাশের পথে দাসতন্ত্র, সামন্ততন্ত্র, পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের পথ ধরে শেষ পর্যন্ত শ্রেণিহীন ও রাষ্ট্রহীন কমিউনিস্ট সমাজে পরিণতি লাভ করতে বাধ্য হয়, তবে শ্রেণি সংগ্রামহীন আদি সাম্যবাদী সমাজে ইতিহাস স্টার্ট হলো কোন এঞ্জিনে এবং পুনরায় শ্রেণিহীন, শ্রেণি সংগ্রামহীন, রাষ্ট্রহীন কমিউনিস্ট সমাজে ইতিহাস চলবে কোন এঞ্জিনে? আমি এখনও মার্কসবাদকে… বিশেষ করে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদকে… দারুণ একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক সম্পদ মনে করি। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমি মনে করি শ্রেণি সংগ্রাম নয়, মানব ইতিহাসে চালিকা শক্তি বা এঞ্জিন অন্য কোনো কিছু, যা মানুষের মানুষ হয়ে উঠা থেকে টিকে থাকা পর্যন্ত সমাজ-সংগঠন, জাতি-শ্রেণি, দেশ-কাল নির্বিশেষে অত্যন্ত মৌলিক ও নিত্য। এমন মৌলিক ও নিত্য কিছু মানুষের ভেতর আছে, যা মানুষের সমাজ ও সভ্যতাকে এগিয়ে নিচ্ছে। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত