প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

 শনিবার বন্ধ ছিলো চুড়িহাট্টার সব মার্কেট
ঢাকাইয়াদের ক্ষোভ বাড়ছে, আবারও সামনে ‘আসলি ঢাকাইয়া’ বিতর্ক

আসিফুজ্জামান পৃথিল : পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় অগ্নি দূর্ঘটনার শিকার হওয়া ওয়াহেদ ম্যানশনকে ঘিরে গণমাধ্যমের নানান সংবাদ এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে আসা মন্তব্যে ক্ষিপ্ত পুরান ঢাকার পুরোনো এবং স্থায়ী অধিবাসিরা। ওয়াহেদ ম্যানসনে কেমিক্যালের কারণেই আগুন লেগেছে কিনা এ ধরণের মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি। অনেক গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, ঢাকার এই আদি ও ঐতিহাসিক এলাকা বাসযোগ্য কিনা এই প্রশ্ন যেমন তোলা হচ্ছে, প্রশ্ন উঠছে ঢাকাইয়া সংস্কৃতি, ব্যবসা এবং জীবনযাপনের ধরণ নিয়ে। এ্টি নিয়ে ক্ষিপ্ত ঢাকার খোশ বাসি ও আদিবাসি সম্প্রদায়।

 

একদিকে যেমন শোকের পাহাড় অন্যদিকে অপ্রাপ্তির আক্ষেপ, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপবাদের ধুঁয়া। সব মিলিয়ে ঢাকাইয়ারা খানিকটা কোনঠাসাই হয়ে পড়েছেন। এদিকে বৃহস্পতি এবং শুক্রবার সরকারি ছুটি ও সাপ্তাহিক ছুটির কারণে বন্ধ ছিলো পুরান ঢাকার সব দোকানই। দুর্ঘটনাসৃষ্ঠ শোকের কারণে শনিবারও খোলা হয়নি চুড়িহাট্টা এবং আসগর লেনের কোন মার্কেট।
পুরান ঢাকাই একটি বিতর্ক খুবই চালু ছিলো। বিতর্কটি ছিলো কে সত্যকারের ঢাকাইয়া সেটি নিয়ে।

 

এই ঘটনার পর আবারও রঙ পেয়েছে ফিঁকে হয়ে আসা এই বিতর্ক। ঢাকার জনগনের মধ্যে নিজেদের আড়াল রাখার প্রবণতা ছিলো সবসময়েই। ঢাকাইয়াদের মধ্যে দুটি সম্প্রদায়কে খুব সহজেই আলাদা করা যায়। এক খোশবাসী ঢাকাইয়া, অপরটি আদিবাসী ঢাকাইয়া। এর বাইরে আরো একটি সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব রয়েছে। এরা কুট্টি বলে সুপরিচিত। মজার বিষয় হলো আদিবাসী ও খোশবাসীরা এই সম্প্রদায়কে ঢাকাইয়া বলেই স্বীকার করে না। এখান থেকেই আসলি বা আসল ঢাকাইয়া বিতর্ক শুরু হয়। ঢাকা দেশের প্রধান নগরী হওয়ায় সবসময়েই সারা দেশের বিভিন্ন স্থানের মানুষ এই শহরে এসেছে। এমনকি এখানে রয়েছে মহারাষ্ট্র থেকে আগতও একটি আলাদা সম্প্রদায়। যারা বেম্বাইয়া নামে বহুল পরিচিত।

 

ঢাকার মূল অবিাসিরা এই ভিন্ন জেলার মানুষকে আপন করে নিলেও কখনই ঢাকাইয়া বলে স্বীকৃতি দেয়নি। কারণ এই মানুষগুলো যারা মূলত এসেছে দক্ষিণবঙ্গ থেকে (বিশেষত নোয়াখালি ও বরিশাল অঞ্চল), তারা একসময় ঢাকাইয়াদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করলেও কালক্রমে পরিশ্রমের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যবসায় নেতৃত্বের পর্যায়ে চলে যায়। ঢাকাইয়ারাও হয়ে উঠে সংখ্যালঘু। পুরান ঢাকায় সত্যিকারের ঢাকাইয়ার সংখ্যা আসলে কতো সেটিই বলা দায়। ঢাকার বাতাসে কান পাতলে এখন ঢাকাইয়া ভাষা বা পরিস্কার উর্দুর চেয়ে কুট্টি উর্দু আর বরিশালের টান মেশানো ঢাকাইয়াই বেশি শোনা যায়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলা হচ্ছে, ঢাকাইয়ারা অর্থলোভি এবং জীবনের চাইতে অর্থকে বেশি মূল্য দিয়ে থাকে। এই স্থানেই আপত্তি ঢাকাইয়াদের। তাদের মতো সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্ন তোলাটাই অন্যায়। আর অপরিসর রাস্তার দায়ভার মূলত স্থানীয় সরকারের। কারণ ঢাকার পুরাতন ম্যাপে ২৫০ বছর আগে রাস্তার জন্য যে স্থান বরাদ্দ ছিলো এখনও তাইই আছে। স্থানীয় সরকার যদি রাস্তার পরিসীমা না বাড়ায় ভবন মালিকরা তো এই দায় নিতে পারেনা।

 

বিশিষ্ট খোশবাসী ঢাকাইয়া, হেকিম হাবিবুর রহমানের নাতি এবং পুরান ঢাকার ঐতিহ্য গবেষক সাদ-উর-রহমান মনে করেন, যারা জীবিকার তাগিদে বাইরে থেকে আসেন, তারা ঢাকাইয়াদের সম্পর্কে এক ধরণের ইনফিউরিটি কমপ্লেক্স এ ভোগেন। সুযোগ পেলেই তাদের কথার মধ্যে ঢাকাইয়াদের দেখে নেওয়া ধরণের সুর থাকে। এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘ঢাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতি অত্যন্ত ধনী। কিন্তু সমস্যা হলো ঢাকাইয়ারা বেশ অন্তর্মুখি। তাদের মিশুক প্রবণতা নিয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু তারা নিজেদের সংস্কৃতিকে ঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পারে না।

 

ফলে অনেকেই ভুল ইন্টারাপ্ট করে। আর ঢাকাইয়াদের অন্য এলাকার মানুষকে একটু আলাদা নজরে দেখার প্রবণতা তো ছিলোই। বাঙ্গালের মতো খানিকটা বর্ণবাদি শব্দের উৎপত্তিও সেখানে। এর পেছনে ঢাকার বাইরে থেকে ভাগ্যান্বেষণে আসা লোকেদের দায়ও কম সেটিও বলবো না। তবে ইদানিং মানষিকতা বদলাচ্ছে। ঢাকাইয়াদের সঙ্গে বাঙ্গাল তখা অঢাকাইয়াদের বিষেশাদীও হচ্ছে। কিন্তু এ ধরণের ঘটনায় যখন ঢালাও অভিযোগ করা হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই পুরাতন ক্ষোভ বিষ্ফোরিত হয়ে যায়।’

পুরান ঢাকার অনেকেরই অভিমত, নাগরিক অনিয়মের বেশিরভাগ দায়ই আসলে অঢাকাইয়াদের। এরকম একজন ৮০ বছর বয়সী জুম্মন মিয়া। বেচারাম দেউড়ির এক বনেদি পরিবারের এই সদস্য নিজের উত্তর পুরুষের মাঝে এখনও ধরে রেখেছেন পুরাতন ঐতিহ্য। তিনি মনে করেনর, ঢাকার বাইরে থেকে এসে যারা পুরান ঢাকায় স্থায়ী হয়েছেন এখানে তাঁদের শেকড়ের টান নেই। এ কারণেই ঢাকার প্রতি তাদের ন্যুনতম মায়াও নেই। তারা অর্থ আয়ের জন্য ঢাকায় আসেন। অর্থ সমাগম হলেই তাদের জন্য তা যথেষ্ট। এতে পুরান ঢাকার নাগরিকদের জীবন যাপনে কোন প্রভাব পড়লে বা জানমালের ক্ষতি হলে তাদের খুব একটা এসে যায় না। তিনি বলেন, ‘বাঙ্গালরা ঢাকায় আসে টাকা কামাই করতে। এটির জন্য তারা সবকিছুকেই রাজি। বহু প্রাচীন ভবনও হেরিটেজের তকমা পাওয়ার আগেই তাদের লোভের কারণে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

 

ইনারা থাকেন নয়া ঢাায়। সন্তানদের পড়ান ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে। এদের কাছে ঢাকাইয়ারা জিম্মি, কারণ এদের সঙ্গে আর্থিকভাবে ঢাকাইয়ারা পেরে উঠেন না। আসলি ঢাকাইয়ারা এখন আর্থিকভাবে পঙ্গুই বলা চলে। এটিই হয়ে উঠেছে প্রধান সমস্যা। সমস্যার উৎস না খুঁজে ঢাকাইয়াদের গালাগালি করার কোন মানেই নেই। কারণ এইসব ঘটনায় সবচেয়ে বেশি তো তাদের ভুগতে হয়। পুড়ে কয়লা হন তারাই।

ঢাকাইয়ারা বহুদিন আসলি ঢাকাইয়া বিতর্ক সামনে আনেননি। এবার একটি দুর্ঘটনাই তাকে সামনে নিয়ে চলে এলো। তারা এই বিতর্ক চানওনা। তাদের গণমাধ্যমের প্রতি অনুরোধ, যেনো তারা ঢালাও অভিযোগ না করে সত্যটা তুলে ধরেন। একজন স্থনীয় অধিবাসি তোতা মিয়া মনে করেন, মন্তব্য করার আগে গণমাধ্যমে ঠিকভাবে রিসার্চ না হওয়াতেই এই ধরণের বিভ্রান্তির জন্ম হয়। না হলে একজন টিভি রিপোর্টার পিভিসি দানা হাতে নিয়ে তাকে ভয়ানক কেমিক্যাল দাবি করতেন না। আর যে কোন সংস্কৃতিকে অপমাণ না করাই উত্তম। কারণ কারোর মখের গালি অপরের মুখের বুলি হতেই পারে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত