প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

হ্যাশট্যাগ মি-টু : আমিও, আপনিও, আমরাও…

ফাহমিদা হক : মি-টু মানে হৃদয়ের গহিনে পুষে রাখা তীব্র যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ; মি-টু মানে চেপে রেখে দেয়া যন্ত্রণাটাকে উগড়ে দিয়ে কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস; মি-টু মানে সমাজকে বলে দেয়া তার অজানার বীভৎসতা কতদূর; মিটু মানে আগামী প্রজন্মের জন্য সুন্দর জীবনের প্রত্যাশা।

প্রচ- রকমের আত্মবিশ্বাস না থাকলে কেউ তার খারাপ লাগার কথাগুলো অকপটে বলতে পারে না। একটা ভয়ংকর অধ্যায়কে চাপা দেওয়া এতোটা সহজ না, যতোটা সহজ একটা রং মাখা গল্প লেখা। প্রাপ্তিকে শূন্যের খাতায় রেখে নিজেকে লুকিয়ে রাখাকে জীবন বলে না। এটা যারা বিশ্বাস করে তারা কখনো কোনোরকম ভয়কে পরোয়া করে না; লোভ, লালসা ক্ষমতার দম্ভের কাছে মাথা নিচু করে না। এরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চার দেয়ালে বন্দি করে মুখ বন্ধ করার কৌশলকে ঘৃণা করে। কারণ আগুনকে লুকিয়ে রেখে চাপা দিয়ে নেভানো যায় না।

মি-টু শুধুই মেয়েদের নয়, এটা পুরো সমাজের সবার। তাই এই বীভ্যৎসতার হাতকে গুড়িয়ে দেয়ার দায়িত্বও আপনার আমার সবার। শক্তিমান পুরুষকে জন্মাবার সুযোগে নারী যদি ধন্য হয় তবে সেটাকে কি আপনি ভালোবাসা বলতে নারাজ? নারীর প্রতি ভালোবাসা যদি অস্বীকার করতে না পারেন, তবে কেন তাকে তার পূর্ণ সন্মান দিতে পারবেন না? মনে রাখুন নারী-পুরুষ পরস্পরের সম্পূরক, কেউ কাউকে ছাড়া অসম্পূর্ণ। পুরুষ মানে নারীর শত্রু না। নারী মানে পণ্য না।

যে পুরুষের হাত সর্বদা ছুঁয়ে দেয়ার সুযোগ খোঁজে, তেমন দু’টো কালো হাত,  হাজারটা  নারী, শিশুর সাত পুরতে মোড়ানো শরীরকেও রক্ষা করতে পারে না, তাই মি-টু ঘটে নিজের আপন গন্ডিতে, পরিবারের আপনজনদের হাতে, সুরক্ষিত বলয়ের ভিতরে। বিশ্বাসের বুকের ভিতর থেকে। এখানে সব পুরুষকে আমি এক কাতারে ফেলতে নারাজ। কারণ চলার পথে বহু পুরুষকে নিজের ভাবনার  চেয়ে বেশি বিশ্বাসের জায়গায় রেখে  অবনত মস্তকে  শ্রদ্ধা করি, করে যাবো। সত্যি কথা বলতে খারাপ মানুষের সংখ্যাটা কম হলেও এদের দাপট বেশি বলে সবই এক মনে হয়।

একজন পুরুষের হৃদয় কখনো পিতার, কখনো অন্ধের, বা মূর্খের মতো কাজ করতে পারে না। কল্পনার জগৎ থেকে নিজেকে টেনে তুলে একবার ভাবুন, নিজের কন্যার এমন কোনো যন্ত্রণায় ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাওয়া না বলা কথাগুলো যদি কোনোদিন আপনার কানকেও নিজের কন্যার জন্য বিশ্বাস করতে হয়, যদি আপনার সৃষ্ট বন্ধ বৃত্তের মধ্যেই কন্যার শৈশব বা কৈশোরের দুঃসহ যন্ত্রণার ঘটনাটা ঘটে থাকে আপনার অতি নিকট আত্মীয়ের দ্বারা, সুরক্ষিত আপনার চার দেয়ালের এক ছাদের তলায়? তার পরেও গাল ফুলিয়ে ঘাড় ত্যাড়া করে বলবেন, এসবই নষ্ট মেয়েদের জন্য? তারপরেও বলবেন, শিশুবাচ্চার পোশাকটাই দায়ী! অবাধ মেলামেশায় এমন সম্পর্কের ঘটনা ঘটে এটা অস্বীকার করার সাধ্য আমার নেই, তবে নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে, যে সমস্ত দুর্ঘটনাগুলো ঘটে থাকে তার সত্যতা সাক্ষী দিয়ে প্রমাণ করাও যায় না। যেমন আজকেই পত্রিকায় পড়লাম নিজ সন্তান পিতা কর্তৃক ধর্ষণের খবর। অহরহই আত্মীয় কর্তৃক নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। মূল কথা শৈশব বা কৈশোরের এমন যন্ত্রণাদায়ক প্রায় ঘটনাগুলো ঘটে আপন বলয়ের ভিতর থেকে। তারপরে আপনি কি প্রমাণ করবেন, আর প্রমাণ করাটাই কি সব?

এই সমাজে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রামমোহন রায় না থাকলেও ঘরে ঘরে বাবা, ভাই তো আছে। আজ সময় এসেছে নিজেদের কথা নিজেরাই বলতে হবে সাথে নিজের বাবা বা ভাইয়ের হাতে হাত রেখে মাথা উঁচু করে বাঁচার মতো বাঁচতে চাইলে ভোকাল হতে হবে, মুখ বন্ধ করে উত্তপ্ত লাভাকে চাপা দিতে না দিয়ে গলতে দিতে হবে; এই সমাজ বুঝতে শিখুক কোনো কিছু আড়াল করে, লুকিয়ে রেখে, সমস্যার সমাধান হয় না। খিস্তি খেউর করা লোকজন বদলাবে না, মুখোশ উন্মোচনের ভয়ে এরা কখনো চাইবে না সমাজের নারী বা শিশুর এই নির্যাতন বন্ধ হোক। এরা আড়ালে আবডালে চক্রান্তের জাল বিছিয়েই যাবে। এদের সংখ্যা বেশি না, তবে এরা শয়তানের মতো কর্মক্ষম বেশি।

যুগে যুগে জ্বলতে থাকা মেয়েরা বাড়িতে, কর্মস্থলে, বাসে, ট্রেনে কোথায় নিরাপদ, কোথায় নির্যাতন নেই? কতো ভাবেই না অপদস্থ হতে হয় মেয়েদের। একটা মেয়েকে কতোটা ধৈর্য, শক্তি থাকলে পরে এরকম প্রতিটি পরিস্থিতিকে সামাল দিয়ে এগিয়ে যেতে হয়, তা কয়েকটি লেখার মাধ্যমেই বোঝানো সম্ভব নয়। তা সম্পূর্ণ ভাবে বুঝতে হলে বোধ হয় মেয়ে হয়ে জন্ম নিলেই কেবল সম্ভব। শক্তি আর সহ্যশক্তি কিন্তু এক নয়। পুরুষ শক্তিমান আর  নারী সহ্যশক্তির আধার। বিজ্ঞান বলে জন্মগতভাবেই মেয়েরা অভিযোজন শক্তিসম্পন্ন। কাউকে কিছু না জানিয়ে যতোটা সম্ভব সব কষ্ট বুকে চেপে রাখার অবিশ্বাস্য শক্তি নিয়েই জন্মায় মেয়েরা। নিজের ঘর থেকে ছোট্ট বেলার পুতুল খেলার দিনগুলো থেকে শুরু হয় সেই মানিয়ে চলার লড়াই, শিক্ষা দেয়া হয় কিভাবে নিজেকে মানিয়ে নিতে হয়। এতো কিছু জেনেও যখন একটা মেয়েকে নিজের সমান যোগ্যতায় দেখে, আপনি-আপনারা, যারা আড়ালে আবড়ালে পণ্য ভেবে খিস্তিখেউর করে থাকেন, তারা বদলাবেনা কখনোই। তাদের সংখ্যা সমাজে অনেক বেশি না। কিন্তু তাদেরকে থামিয়ে দেয়ার লোকের সংখ্যা খুবই কম। কারণ এদের বুলিতে এতোই দুর্গন্ধ ছড়ায় যে ভদ্র লোকেরা এড়িয়ে চলে আর নারীরা হয় নির্যাতিত।

মি-টুকে যারা থামিয়ে দিতে চাচ্ছেন, তাদের বলি, শুধু মেয়েদেরই না, শৈশবের বা কৈশোরের না বলা যন্ত্রণার স্বীকার হতে পারে কোনো ছেলে শিশুটাও। আপনারা ইতিপূর্বে আমাদের এতিমখানা, মাদ্রাসার শিক্ষকের হাতে ছেলেশিশুর যৌন নির্যাতনের শিকারের একাধিক খবর নিশ্চয় জেনে থাকবেন। তাই বলি, কোনো অজুহাতে এমন আগ্নেয়গিরির উত্তপ্ত লাভার অগ্নুৎপাত নিভাতে যাবেন না। লাভা গলতে দিন। সময় এখনই বলার। এসব অন্যায়কে বন্ধ করতে হলে মি-টুকে স্বাগত জানান। অভিনন্দন জানান, যারা এমন দুঃসাহস নিয়ে ভয়কে পিছনে ঠেলে নিজের কষ্টগুলোকে শেয়ার করতে চাচ্ছেন তাদের। মি-টু কাউকে অপদস্ত বা অপমাণ করার জন্য নয়। এ শুধু কর্মস্থল, শিক্ষায়তন, পারিবারিক আবহে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নয়, এ হলো সমাজের সর্বত্র নারীর মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াই। সংগ্রামটা নারীর একার নয়, একটি সুস্থ সমাজে নারী-পুরুষ সবার।

লেখক: পরিচালক , সিসিএনল

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত