Skip to main content

‘বছরে তিনবার পরিবার নিয়ে বেড়াতে যাওয়া বাধ্যতামূলক, নাহলে জেল-জরিমানা’

ড. আকতার বানু : কিছু মানুষকে দেখে আমি হিংসায় জ্বলে-পুড়ে যাই! শুধু জ্বলে-পুড়ে বললে কম বলা হয়। জ্বলে-পুড়ে একেবারে ছারখার হয়ে যাই। কারণ এরা কী যে মজা করে এখানে-ওখানে, দেশে-বিদেশে ফুরফুরে মেজাজে ঘুরে ঘুরে বেড়ায় আর একটার পর একটা অসম্ভব সুন্দর সুন্দর ছবি আপলোডাতেই থাকে! আর আমি? বেড়ানোর কথা ভাবতে গেলেই নানান সমস্যা। ছুটি নাই, বাচ্চাদের পরীক্ষা, স্কুল, পড়া ইত্যাদি মিত্যাদি। মাঝে মাঝে মনে হয়, চাকরিটা না থাকলেও বেশ হতো! অন্তত যখন যেখানে খুশি বেড়াতে যেতে পারতাম। মাথায় টেনশন নিয়ে আসলে কিছুই ভালমতো করা যায় না। বেড়ানোও যায় না। সব কাজই হয় দায়সারা গোছের। কখনো আবার মনে হয়, ছোট মেয়েটাকে পড়ানোর চিন্তা না থাকলেও আমি অনেক কিছু করতে পারতাম। লেখালেখি, রিসার্চ, বেড়ানো...। মুশকিল হলো, মানুষ একই সময়ে দু’টো অবস্থাকে পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারে না। চাকরি না থাকলে আমার কেমন লাগবে, সেটা চাকরি থাকা অবস্থায় সঠিকভাবে অনুমান করা কঠিন। তেমনি মেয়েকে পড়াতে না হলে তখন সে সময়গুলোতে ঠিক কি কি করতে মন চাইবে, তা এখন নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। কারণ তালাকের পরই কেবল স্বামী-স্ত্রী বোঝে তার এক্সের অভাব। দূরে গেলেই বাবা মা বোঝেন সন্তানের অভাব। কেবল ছেড়ে গেলেই প্রেমিক বা প্রেমিকা বোঝে তার ভালবাসার গভীরতা। কেবল বৃদ্ধরাই বোঝেন যৌবনের গুরুত্ব। শুধু অসুস্থরাই বোঝে সুস্থতার দাম। শুধুমাত্র ক্ষুধার্তই বোঝে খাবারের অভাবের কষ্ট। এক এনজিওকর্মী এক পতিতাকে বললো, সাবধান না হলে ভবিষ্যতে আপনার এইডস হতে পার। মেয়েটিকে থামিয়ে দিয়ে পতিতাটি বলল, রাখেন আপনার ভবিষ্যত! রাতে আমার বাচ্চাকে খাওয়াবো কি, তার ঠিক নাই, আর ভবিষ্যত! কাশ্মীরের এক গ্রামে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অভিযানে বেশকিছু মানুষ খুন ও গ্রেফতার হবার ক’দিন পর কিছু ছোট ছোট ছেলেমেয়ে স্কুলে যাচ্ছিল। এক সাংবাদিক ছয়-সাত বছরের এক শিশুকে প্রশ্ন করল, বড় হয়ে তুমি কী হতে চাও? শিশুটি বলল, আমি বেঁচে থাকতে চাই। কী করুণ আকুতি! সারাবিশ্বের ক্ষুধার্ত, যুদ্ধবিদ্ধস্ত এলাকার অনাহারী শিশু ও মানুষদেরও একই আকুতি! বেঁচে থাকতে চাই! আর আমার আকুতি? বেড়াতে যেতে চাই। মানুষ আসলে আত্মকেন্দ্রিক। অন্য মানুষের কষ্ট মানুষকে খুব বেশি সময় আচ্ছন্ন করে রাখতে পারে না। কিন্তু অন্য মানুষের আনন্দ, সৌন্দর্য, বিত্ত, প্রাকৃতিক মনোরম দৃশ্য ইত্যাদি মানুষকে আচ্ছন্ন করে রাখে দীর্ঘ সময়। তবে সময় একটা বিরাট নিয়ামক। এখন যা ইচ্ছে করছে, কিছুদিন পর হয়তো সে ইচ্ছেগুলো আর নাও থাকতে পারে। হয়তো মন চাইবে না। হয়তো মন চাইলেও শরীর জার্নির ধকল সইতে পারবে না। আমার এক সহকর্মী বলে, প্রফেসর হবার পর বুড়ো বয়সে একগাদা টাকা বেতন দেয়ার কোন মানে হয় না। তখন আসলে টাকার দরকার নেই। তখন ছেলেমেয়ে বড় হয়ে যাবে, নানান অসুখ ধরবে। ফলে খাওয়া, সাজগোজ, বেড়ানো সব বন্ধ। তখন টাকা দিয়ে হবেটা কী? তারচেয়ে লেকচারারদের বেতন বেশি হওয়া দরকার। যত প্রমোশন পাবে, তত বেতন কমতে থাকবে। আমারও একই মত। সেইসাথে ‘বছরে কমপক্ষে তিনবার পরিবার নিয়ে বেড়াতে যাওয়া বাধ্যতামূলক। নাহলে জেল-জরিমানা।’Ñএরকম একটা আইন পাস করা দরকার। লেখক : প্রফেসর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

অন্যান্য সংবাদ