প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

একজন শহীদ কর্নেল জামিল উদ্দিন আহমেদ

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ : কর্তব্য ও দায়িত্ববোধে উদ্ধুদ্ধ হয়ে যারা অয়োময় প্রত্যয়ে কর্তব্য পালন করেন, জীবন উৎসর্গ করেন, তেমন একজন প্রাতঃস্মরণীয় দেশিকোত্তম ব্যক্তিত্ব শহীদ কর্নেল জামিল উদ্দিন আহমেদ (১৯৩১-১৯৭৫)। যশোরের কৃতিসন্তান ১৯৫২ সালে একজন মেধাবী ক্যাডেট হিসেবে তদানীন্তন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে কোর অব সিগন্যাল এ কমিশন লাভ করেন। তিনি তার কর্মজীবনে পেশাগত প্রৎকর্ষতা ও মেধাবী মুনশিয়ানা যেমন দেখিয়েছেন তেমনি আমৃত্যু স্বার্থকতাও অর্জন করেছেন। নির্ধারিত দায়িত্ব পালনে এখতিয়ারের মধ্যে থেকেও নিজের প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের দ্বারা তিনি এমন কিছু স্মরণীয় কর্তব্য পালন করেছেন যা দেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে পরিকীর্তিত হয়ে থাকবে চিরকাল। নিজের জীবন এবং চাকরির নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা বাজি রেখেই তিনি সব সময় দায়িত্ব পালন করে গেছেন। প্রথা, রীতি-নীতি ও আইনের চৌহদ্দী, বলয় ও বিশ্বাসের মধ্যে সৃদৃঢ় অবস্থানে থেকেও দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থ সংরক্ষণ ও উন্নয়নে আরও কিছু করণীয়’র প্রতি সাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অনুসরণীয় ব্যতিক্রম।

সামরিক বিভাগে তিনি বরাবরই সিগন্যালস, আর্মি ইন্টেলিজেন্স এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশেষ স্পর্শকাতর গুরুত্বপূর্ণ শাখাগুলোতে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তার সৌভাগ্য হয়েছিল পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলমান স্বাধীকার আন্দোলন এবং আঞ্চলিক মর্যাদা ও স্বায়ত্বশাসন প্রশ্নে বাঙালিদের প্রত্যাশা ও প্রতিকার দাবির, সংগ্রামের পর্যায়ে পর্যাপ্ত সমর্থন দানের। তৎকালীন শাসক ও শাসকগোষ্ঠীর অতি কাছে থেকেও নেপথ্য সহযোগিতা, সহমর্মিতা এবং সমানুভূতি উৎসারিত প্রেরণা যারা প্রদান করেছিলেন, যাদের কাছ থেকে বাংলাদেশের স্বায়ত্বশাসন অধিকার প্রতিষ্ঠার সহযোগিতা মিলেছিল শহীদ কর্ণেল জামিল উদ্দিন আহমেদ ছিলেন তাদের অন্যতম। সৌভাগ্যক্রমে তার পোস্টিং ছিল তখন বাংলাদেশে যখন ৬ দফা আন্দোলন তুঙ্গে। বিশেষকরে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা চলার সময় তিনি এমন ঐতিহাসিক ভূমিকায় উত্তীর্ণ হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন যার ফলশ্রুতিতে অনেক তরুণ বাঙালি সেনা অফিসারদের প্রাণ রক্ষা পেয়েছিল এবং মামলাকে ভিন্নপথে নিয়ে যাওয়ার পথ সুগম হয়েছিল। এ জন্য চাকরি জীবনে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হয়েছিল। ইতিহাসের পাতায় তার সে সব অবদান হয়ত অনুল্লেখই থেকে যাবে।

তবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (১৯২০-১৯৭৫) তার সে সব সাহসী এ ভূমিকার কথা অবহিত ছিলেন। ছিলেন বলেই যখন জনাব জামিল পাকিস্তানে অবরুদ্ধ জীবন যাপন থেকে ১৯৭৩ সালের ১৭ অক্টোবর স্বপরিবারে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন তখনই তাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সিগনাল ব্যাটেলিয়ানে এবং পরে প্রধানমন্ত্রীর সিকিউরিটি কমানড্যান্ট করা হয়। বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করলে তিনি তার সামরিক সচিব হিসেবে নিয়োজিত হন। দেশি-বিদেশি গভীর ষড়যন্ত্রের জালে বোনা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ভোরে ঘটনার আকস্মিকতায় রাষ্ট্রপ্রধানের স্বপরিবারের প্রাণ সংহারের মর্মান্তিক মুহূর্তে অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষ যখন নিরব, নিশ্চুপ ও হতবিহ্বল অবস্থায় ছিলেন, তখন রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব কর্ণেল জামিল তার নিজের দায়িত্ববোধ সম্পর্কে বিন্দুমাত্র বেখেয়াল না হয়েই ত্বরিৎগতিতে প্রতিরোধের সীমাহীন ঝুঁকি সত্ত্বেও তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন এবং জীবন উৎসর্গ করেন। ইতিহাসের পাতায় সার্বিক ঘটনাবলী বা সংশ্লিষ্ট অন্যান্যের দায়িত্ব-কর্তব্য পালনের পদাবলী যেভাবেই লিখিত হোক না কেন আমৃত্যু দেশগত প্রাণ, মাথা থেকে পা পর্যন্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য সচেতন একজন নিবেদিত, নিষ্ঠাবান ব্যক্তিত্ব কর্নেল শহীদ জামিল এর নাম তার অকুতোভয় ভূমিকার জন্য আলাদাভাবে পরিকীর্তিত হবে সন্দেহ নেই। তার এ আত্মত্যাগ বাংলাদেশের দায়িত্ব পালন ইতিহাসে একটি অনির্বচনীয় অধ্যায় যা যুগযুগ ধরে মানুষের হৃদ মাঝারে সম্মান ও সমীহের সঙ্গে সংরক্ষিত থাকবে।

লেখক : সাবেক সচিব। এনবিআর-এর সাবেক চেয়ারম্যান

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ