প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শিশুর বিকাশ ও অধিকার রক্ষায় এখনও পিছিয়ে বাংলাদেশ

আল-আমীন আনাম: শিশুরা দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ। বিকশিত শিশুরাই বয়ে আনতে পারে জাতির কল্যাণ। জন্মগতভাবে শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টি ও সুরক্ষার অধিকার রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের সব শিশুর আর্থ-সামাজিক ও পারিবারিক অবস্থা এক না হওয়ায় সবাই সমানভাবে বিকাশের সুযোগ পাচ্ছে না।

সাত বছরের শিশু রাকিব। বাবা-মার বিচ্ছেদের পর গ্রামের বাড়ি বরিশাল থেকে এসে আশ্রয় নেয় কমলাপুর রেল স্টেশনে। সেখানে পরিচয় হয় আরো কয়েক পথশিশুর সঙ্গে। তারপর পথশিশুদের সঙ্গেই রাকিবের চলাফেরা শুরু। রাস্তায় রাত কাটানো, সারাদিন ধুলো-ময়লার সঙ্গে সময় কাটানো। এভাবে রাকিবের মতো আরো অনেক পথশিশুর দিন কাটে। ওরা জানে না ওদের ভবিষ্যৎ কি?

শিশু রনি হাসান (১৩) জানায়, বেঁচে থাকার জন্যই সে এমন ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে। তাদের কাজের কোনো সময় নেই, ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত তাদের বিভিন্ন ধরণের ঝুঁকিপূর্ণ অনেক কাজ করতে হয়। রাজধানীতে তার থাকার স্থান ফুটপাতে। খাবার, চিকিৎসা স্কুল, উন্নত ভবিষ্যৎ, এসব সুবিধা দূরে থাক, দিনশেষে একটা নির্দিষ্ট থাকার জায়গা পর্যন্ত নাই। শহরের বড় রাস্তার ফুটপাতই তাদের ঘর।

রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে ৩ সন্তান নিয়ে থাকেন রাহেলা বেগম। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে প্রতিদিন খাবার তালিকায় যে ধরণের পুষ্টিকর খাবারের প্রয়োজন তা তিনি দিতে পারছেন না।

রাহেলা বেগম বলেন, দু’বেলা খেতেই পারি না। ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া করাবো কি ভাবে? সরকার যদি আমাদের সাহায্য করতো তাহলে আমাদের ছেলে মেয়েদের সুষ্ঠু বিকাশ হত।

সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক মাহবুবা নাসরিন বলেন, শিশু অধিকার সনদে বর্ণিত অধিকারগুলোকে সাধারণভাবে চারটি গুচ্ছে ভাগ করা যায়। প্রথমত, বেঁচে থাকার অধিকার । দ্বিতীয়ত, বিকাশের অধিকার । তৃতীয়ত, সুরক্ষার অধিকার । চতুর্থত, অংশগ্রহণের অধিকার। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশের শিশুরা এ অধিকারগুলো নিয়ে বেঁচে থাকা ও বেড়ে ওঠার সুযোগ পাচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, প্রতিটি শিশুকে শিক্ষা, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক পরিম-ল ও সুরক্ষিত পরিবেশ এবং উপযুক্ত জীবনযাত্রার মান নিয়ে গড়ে ওঠার জন্য সুযোগ দিতে হবে।

ইউনিসেফের আবাসিক প্রতিনিধি এডওয়ার্ড বলেন, প্রতিনিয়তই শহরে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এতে করে শহরের সুযোগ-সুবিধা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ২০২৯ সালে যদি ঢাকা সিটিতে জনসংখ্যা আট কোটিতে উন্নীত হয়, তাহলে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, শহরে বস্তি এলাকা ও বস্তি এলাকার বাইরে শিশুদের বৈষম্য দিন দিন বাড়ছে। এ বিষয়ে নীতি কৌশলের ওপর জোর দিতে বলেন। তা না হলে শিশুর সুষ্ঠু বিকাশ হবে না।

সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক মাহবুবা নাসরিন বলেন, অপুষ্টির শিকার মা ও শিশুর সংখ্যা আগের তুলনায় কমলেও তা খুব বেশি ইতিবাচক নয়। পুষ্টির চাহিদা নিশ্চিত করা সম্ভব হলে ভাতের ওপর চাপ কমবে এবং শিশুদের মেধার বিকাশ ঘটবে।

তিনি আরও বলেন, বাবা মা যদি বাসার কাজে সহায়তাকারীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করে সেটা শিশুর মানসিকতায় ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাদের মধ্যে তথ্য লুকানো ও অপরাধপ্রবণতা বাড়তে থাকে। শিশুরা শ্রমের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার কারণে বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষা থেকে, বঞ্চিত হচ্ছে বিকাশের সুযোগ থেকে। ফলে তাদের দৈহিক ও মানসিক এবং মেধা ও বুদ্ধির বিকাশ হচ্ছে না।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আহমেদ হেলাল বলেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ৫ কোটি ৯৫ লাখ শিশু। অর্থনৈতিক কারণে ও সুরক্ষিত পরিবেশের প্রভাবে এদের ৪ ভাগের ৩ ভাগ শিশু খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং শিশু বিকাশের সুযোগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। এরা অনেকেই মৌলিক অধিকার ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রার বাইরে পড়ে আছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত