প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রূপগঞ্জে অর্ধকোটি টাকার ফুল বিক্রির আশা

ডেস্ক রিপোর্ট : ‘ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না/একলা জেগে রই’- কবির এ কথার সঙ্গে তাল মিলিয়েই গত কয়েকদিন ধরে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার মাছুমাবাদ এলাকার ফুলচাষিরা। ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে উপজেলার মাসুমাবাদ গ্রামের ফুল ছড়িয়ে পড়বে রাজধানীসহ সারাদেশে। রূপগঞ্জে এবার প্রায় অর্ধকোটি টাকার ফুল বিক্রি হবে বলে চাষিরা আশাবাদী। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ফুল ব্যবসায়ীরা এখান থেকে পাইকারী দরে ফুল কিনে নিয়ে যায়।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, শিশির ভেজা ঘন কুয়াশার ঘোরে ঘুম থেকে উঠে ফুলচাষিরা পরিচর্যা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন। মাসুমাবাদ গ্রামের বাড়ি বাড়ি এখন গন্ধরাজ, কাঠ বেলি ও চেরি, আলমেন্দা, বেলি ফুলের বাগান। ভোর ৬টার মধ্যে বাগানে যেতে হয়। ১১টা পর্যন্ত চলে ফুল তোলা। এরপর ঘরে বসে সুই-সুতোর সঙ্গে ফুলের বন্ধন…। মাসুমাবাদ দিঘিরপাড় গ্রামের ফুলচাষি সাধন মল্লিক, শহিদুল্লাহ, শফিকুল ইসলাম, অতুল চন্দ্র দাস, রফিকুল ইসলাম, ভায়েলা মিয়াবাড়ীর নাঈম মিয়া, শামীম মিয়া, আউয়াল মিয়া, আমিনুল হক, মুইরাবো এলাকার জালালউদ্দিন, সোলায়মান, নজরুল ইসলাম, জলিল, লোকমান, শাহআলম, সোলাইমান, পোরাব ও আমিনউদ্দিনসহ প্রায় ৩০ জন ২০০ বিঘা জমিতে এ ফুল চাষ করেছেন। তাদের অধীনে কাজ করছে প্রায় ৩ শতাধিক পরিবারের লোকজন। প্রতিদিন বাগান থেকে ফুল তুলে মালা বানানোর জন্য লোকজন তাদের বাড়ি নিয়ে যায়। পরে বিকেলে আবার সেগুলো ফিরিয়ে দিয়ে যেতে হয় বাগান মালিকদের। যে যত বেশি মালা গাঁথতে পারে, তার আয় তত বেশি। কেউ কেউ প্রতিদিন ২০০ থেকে ২৫০টি মালা গাঁথতে পারেন। যারা সংসারে কাজ শেষে বেশি ফুরসত পান, তাদের আয়টা একটু বেশি হয়। গ্রামের এসব নারী নিজেদের আয় দিয়ে পরিবারের সদস্যদের জন্য কিনতে পারেন একটুখানি সুখ। ফুলের মিষ্টি গন্ধে ওরা ভুলে থাকে ছোট ছোট দুঃখগুলোকে। সাদা ফুলের সঙ্গে গেঁথে চলে নীল কষ্টকে। আর সুইয়ের খোঁচায় আঙুলে ফুটিয়ে তোলে বিচিত্র নকশা।

উপজেলার মাছুমাবাদ, ভায়েলা, মিয়াবাড়ী এলাকায় গিয়ে জানা যায়, এখানকার নাঈম মিয়া বহু বছর ধরে ফুলচাষের সঙ্গে জড়িত। তার ১২ বিঘা ফুলের বাগানে রয়েছে কাঠ বেলি, চেরি ফুল। এ ছাড়া রয়েছে গন্ধরাজ ফুলের বিশাল বাগান। তার ফুল বাগানে ৪০ থেকে ৪৫ জন বিভিন্ন বয়সের নারী আসে ফুল তুলতে। তাদের কাজের তদারকি করা, ফুলের মালা বুঝে নিয়ে পাওনা মিটিয়ে দেয়ার দায়িত্বটি তারই। এ জন্য দু’জন লোক নিয়োগ করেছেন বাগান দেখাশোনার জন্য। এ বাগানের ফুল ও ফুলের মালা বিক্রি হয় রাজধানী শাহবাগের বিভিন্ন ফুলের দোকানে। ফুলের প্রধান মৌসুম পৌষ-চৈত্র মাস। এ সময় গন্ধরাজ ফোটে। কাঠ বেলি ফাল্গুন মাস থেকে মাঘ মাস পর্যন্ত ফোটে। ফুল বিক্রি করে প্রতি বছর তার আয় হয় প্রায় ৫ লাখ টাকার মতো। তার এ ফুলের বাগান স্বাবলম্বী করেছে তাকে। সেই সঙ্গে আয়ের পথ দেখিয়েছে অনেক অসহায় নারীকে। তিনি আরো বলেন, পৌষ মাস এলেই খুশিতে মনটা ভরে ওঠে আমাদের গ্রামের সুমা আক্তার, শেফালী, সাথী, নাজমা, ছালেহা, নাসরিন ও শারমিনদের। কেননা এটা ফুল ফোটার প্রধান মৌসুম। এ সময় কাঠ বেলী, গন্ধরাজ দেখা মেলে। অজস্ত্র সাদা, আর হলুদ ফুলে ছেয়ে যায় বাগান। তারা প্রতিদিন ২০০ থেকে ২৫০টির মতো মালা গাঁথতে পারে। অন্য সময় ফুল কম থাকায় ২০ থেকে ৩০টির বেশি মালা হয় না। তাই তারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে এ মৌসুমের জন্য। এ গ্রামেরই স্বামী পরিত্যক্ত কুলসুম বেগম একমাত্র ছেলেকে নিয়ে পড়ে আছেন বাবার ভিটায়। অন্যের বাড়িতে রান্নার কাজ করে এবং ফুলের মালা গাঁথার আয় দিয়ে ছেলেকে বড় করেছেন। ছেলে সংসারের হাল ধরেছে। আর তিনি তার উপার্জিত অর্থ দিয়ে ঋণের টাকা পরিশোধ করছেন। কুলসুম বেগম দুঃখ করে বলেন, ‘এখন আর আগের মতো কাজ করতে পারি না। শরীরে কুলায় না। সারাদিন বসে বসে মালা গাঁথতে কোমরে ব্যথা করে।’

ছালেহা বেগম দুই সন্তানের জননী। স্বামী রিকশা চালান। তার সামান্য আয় দিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। একটু ভালোভাবে থাকার জন্য তিনি এ কাজ করছেন। তার আয় দিয়ে ছেলেটাকে পড়াশোনা করাতে পারছেন। এটাই তার বড় সান্ত¡না। সুমা বলেন, ‘ভোর ৫টায় বাগানে যাই। ১১-১২টা পর্যন্ত ফুল তুলি। রোদে থাকতে থাকতে চেহারা পুড়ে ছাই হয়ে যায়। সারাদিন পরিশ্রম করার পর যখন ক’টা টাকা হাতে পাই, মনে শান্তি লাগে।’ তার একটাই স্বপ্ন, ছেলেকে পড়াশোনা শিখিয়ে মানুষ করা। ছেলেকে অভাবের কারণে ভালো স্কুলে পড়াতে পারি না। এখন ছেলেটা শিক্ষিত হলেই তার সব কষ্ট সার্থক হবে। রুমা অভাবের কারণে ক্লাস ফাইভের বেশি পড়তে পারেনি। এখন সারাদিন অফুরন্ত অবসর সময়টাকে কাজে লাগায় ফুল তুলে ও মালা গেঁথে। ফুলের মৌসুমে ভোর ৫টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ফুল নিয়েই থাকতে হয়। সে সারাদিন ২০০টির মতো মালা গাঁথতে পারে। ওর কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে পারছে, ছোট বোনটির বই-খাতা কিনতে পারছে, এ-ই বা কম কী। রুমা বলেন, ‘সারাদিন বসে মালা গাঁথতে খুব কষ্ট হয়, পিঠ ব্যথা করে। কিন্তু কী করব? কিছু তো করতে হবে? আমাদের গ্রামে তো কোনো কাজ নেই। মেয়ে হয়েছি বলে কি বাবাকে একটু সাহায্য করতে পারব না।’ রুমার দিনমজুর মা মেয়ের ওপর নির্ভর করতে পারছে।

ফুলচাষির মহাজন নাঈম মিয়া বলেন, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ফুলের কদর বাড়ে। এবার ২১ ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে রূপগঞ্জ থেকে প্রায় অর্ধকোটি টাকার ফুল যাবে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। তিনি আরো বলেন, আমরা প্রায় ৩০ ব্যক্তি এ ফুল চাষ করে আসছি। আমাদের এখানে ফুল চাষের কারণে প্রায় তিন শতাধিক পরিবার স্বাবলম্বী। সুত্র : মাবনকন্ঠ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত