শিরোনাম

প্রকাশিত : ০৪ মে, ২০২২, ০৩:১০ দুপুর
আপডেট : ০৪ মে, ২০২২, ০৩:১০ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

টাওয়ার  হ্যামলেটস মেয়র নির্বাচন: লড়াকু লুৎফুরের হাতেই আসুক বিজয়

কাইয়ূম আবদুল্লাহ : ৫ মে, বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে বৃটেনের স্থানীয় সরকার নির্বাচন। ভরা চেরি ফোটা মৌসুমের চমৎকার আবহাওয়ায় অনুষ্ঠেয়গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচন অন্য অনেকের মতো আমার কাছেও বেশ উপভোগ্য। কিন্তু এই আরামদায়ক উপভোগ্য সময়েওনির্বাচনকে কেন্দ্র করে টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকার আবহাওয়ায় অনেক সময় শুরু হয় ভিন্নরকম নিম্নচাপ, বিরাজ করে একগোমট পরিবেশ। বারার বিপুল বাংলাদেশী অধ্যুষিত নির্বাচনপ্রিয় বাঙালিদের কাঙিক্ষত উৎসবমুখতায় পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, দ্বিধাবিভক্তির অনাকাঙিক্ষত বহিঃপ্রকাশ সংখ্যাগরিষ্ট নিঃস্বার্থ জনতাকে আহত করে। এবারের নির্বাচনী প্রচারণায়ও শুরু থেকেপ্রায় সেই অভিন্নতাই চলে আসছে। 

লণ্ডনের ৩২ বারা কাউন্সিলের মধ্যে যে ৬টিতে নির্বাহী মেয়র পদ্ধতি চলে টাওয়ার হ্যামলেটস তম্মধ্যে অন্যতম। ২০১০ সালে এইবারায় রেফারেণ্ডামের মাধ্যমে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাহী মেয়র নির্বাচনের প্রথা প্রতিষ্ঠিত হয়। মূলতঃ তারপর থেকেইটাওয়ার হ্যামলেটসের নির্বাচনী আমেজটি যেমন জমজমাট তেমনি তুমুল বিবাদপূর্ণ হলেও উৎসবমুখরতা পেয়েছে। বলা যায়, একরকম টানটান উত্তেজনায় শুরু এবং শেষ হয় এই নির্বাচন। দীর্ঘদিন লিডারশীপ সিস্টেমে চলে আসা টাওয়ার হ্যামলেটসকাউন্সিলে মেয়রশীপ তথা নির্বাহী মেয়রের অধীনে পরিচালিত হবার দাবীতে রেফারেণ্ডামের ক্যাম্পেইন শুরু করেছিলোতৎকালীন রেসপেক্ট পার্টি। টাওয়ার হ্যামলেটলসকে দীর্ঘদিন করায়ত্বে রাখা স্থানীয় লেবার পার্টি এই পদ্ধতির বিপক্ষে ছিলো এবংশুরু থেকে বিরোধীতা করে আসছে। কিন্তু বারার জনগণের অভূতপূর্ব রায়ে মেয়র পদ্ধতিরই বিজয় সূচিত হয়। এবারও স্থানীয়লেবার আবার লিডারশীপে ফিরে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে কিন্তু এযাত্রায়ও জনরায়ের কাছে তাদের কূটচাল ভণ্ডুল হয়ে যায়।একটি রেফারেণ্ডামের দশ বছর যেতে না যেতে কোনো ধরণের দৃশ্যমান অসঙ্গতি ছাড়াই পাবলিকের ট্যাক্সের অর্থ খরচ করে কেনআবার রেফারেণ্ডাম? সেটিও প্রায় সবার কাছে পরিষ্কার। আর তা হচ্ছে, সাবেক এবং প্রথম নির্বাহী মেয়র লুৎফুর রহমানকে এইপদে বা তাঁর রাজনীতিতে ফিরে আসার সব সুযোগ রুদ্ধ করা। সেই কূটচালেও তারা সূচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে। সফলহয়েছেন মেয়র পদ্ধতির পক্ষে ক্যাম্পেইনের নেতৃত্বদানকারী লুৎফুর রহমান। কোর্টের খড়গ কৃপাণে প্রায় পর্যদুস্ত, মিডিয়ারপ্রপাগাণ্ডা এবং সংঘটিত প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক বলয়ের সম্মিলিত বাধা ও নানা ষড়যন্ত্রের মুখেও লুৎফুর রহমানের নেতৃত্বে মেয়রপদ্ধতির পক্ষে রেফারেণ্ডামে গণ-আস্থার যে প্রতিফলন হয়েছে, সেটিকেই লুৎফুর রহমানের প্রাথমিক বিজয় ধরে নেওয়া যায়। শেষপর্যন্ত পরীক্ষিত এই লড়াকু নেতৃত্বের হাতে আসুক বিজয়— এমনটিই অনেকের মতো আমারও প্রত্যাশা।

শুরু থেকেই কঠিন লড়াই করে আসছেন লুৎফুর রহমান। একসময় নিজে যে দল করতেন এবং দলটির নেতৃত্বও দিয়েআসছিলেন সেই স্বীয় দলের বৈষম্য ও কূটচালের বিরুদ্ধে বাধ্য হয়েই দাঁড়াতে হয়েছিলো তাকে এবং অসীম সাহসে তিনি সব বাধাঅতিক্রম করে ইতিহাস গড়তেও সক্ষম হয়েছিলেন। ২০১০ সালের টাওয়ার হ্যামলেটসের মেয়রাল নির্বাচনের প্রেক্ষাপট এবংপরিস্থিতি সবারই মনে থাকার কথা। ওই বছরের ২১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে লেবার পার্টির দীর্ঘদিনের ঘাটিখ্যাত টাওয়ার হ্যামলেটসে অকল্পনীয় ও ঐতিহাসিক এক বিজয় নিয়ে এসেছিলেন লুৎফুর রহমান। সেই বহুল আলোচিতনির্বাচনের পূর্বমুহূর্তে “টাওয়ার হ্যামলেটসের প্রথম মেয়র নির্বাচন: শেষ পর্যন্ত কার বিজয় হবে? স্বেচ্ছাচারী শক্তির নাবিবেকবানের?” এই শিরোনামে একটি লেখা লিখেছিলাম, যা অধুনালিপ্ত সাপ্তাহিক বাংলা টাইমস—এর উপসম্পাদকীতে ছাপাহয়েছিলো। লেখাটির শেষ প্যারায় উল্লেখ করেছিলাম, “২১ অক্টোবরের নির্বাচনে স্বেচ্ছাচারী লেবার পার্টির আর্শীবাদপুষ্ট প্রার্থীকেপরাজিত করতে সক্ষম হলে সেটা হবে তার বিজয়ের ধারাবাহিকতা মাত্র।” কারণ এর আগে পার্টির প্রার্থী মনোনয়নে লেবার পার্টিঅনেক চতুরতা করেছিলো। তখনই সাধারণ লেবার সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত মেয়র প্রার্থীকে বাদ দিয়ে দলের এনইসি কর্তৃকইম্পোজকৃত প্রার্থীকে কেন্দ্র করে দলে চরম বিভক্তি দেখা দেয়। সচেতন বিবেকবানরা তখন লেবারের ইম্পোজকে ‘বৈধ অগণতন্ত্র’ আখ্যা দিয়েছিলেন। লেবারে ঘাপটি মেরে থাকা বাঙালি বিদ্বেষী গ্রুপটি টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলে তাদের কতৃর্ত্ব ধরে রাখতেসব ধরণের অপকৌশলই করে যায়। প্রথম শর্টলিস্টেই যার নির্লজ্জ বহিঃপ্রকাশ ধরা পড়েছিলো। তখন বারার কয়েক বারেরলিডার হেলাল আব্বাস এবং তৎকালীন সময়ের সদ্য সাবেক লিডার লুৎফুর রহমানকে লিস্ট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিলো। মেয়রনির্বাচনে দলীয় প্রার্থীতার জন্য শ্বেতাঙ্গ ঝানু প্রার্থীর সাথে মুখ রক্ষার্থে নামেমাত্র ক‘জন বাঙালিকে লিস্টেট করে অবাক করেদিয়েছিলো লেবার পার্টি। কিন্তু তখনও তাদের এমন চাতুর্য্যতায় দমে যাননি এখনকার আলোচিত রাজনৈতিক লুৎফুর রহমান।তিনি কোর্টে ইনজাংশন করে লেবার পার্টিকে পুনঃরায় শর্টলিস্ট করতে বাধ্য করেন। তখন লুৎফুর রহমানের স্বীয় পার্টির বিরুদ্ধেসাহসী পদক্ষেপ ইনজাংশনের কল্যাণে লেবারের সবসময়ের অনুগত রাজনীতিক হেলাল আব্বাসও শর্টলিস্টেট হবার সুযোগপেয়েছিলেন। তথাপি দলের বাধ্য—অনুগত এই ব্যক্তি মেয়রশীপের বিপক্ষে ছিলেন এবং ক্যাম্পেইন করেছেন। সেখানেও গেইমসকরায়াত্বে রাখার কৌশল করেছিলো লেবার। তাদের হয়ে অর্থাৎ সরাসরি মেয়র নির্বাচনের বিপক্ষে ক্যাম্পেইনকারী হেলালআব্বাসকেও শেষ মুহূর্তে অন্তুর্ভূক্ত করে তারা। তারপরের ঘটনা ছিলো আরো বিব্রতকর। সর্বশেষ লেবার পার্টি প্রসিদ্ধ “ডিভাইডএণ্ড রুল্ড” থিউরির অনুসরণে বাঙালির বিরুদ্ধে বাঙালিকেই দাঁড় করিয়ে দেয়। লুৎফুর রহমান লিডার থাকাকালীন পবিত্রকা‘বার ইমামের টাউন হলে আতিথেয়তাসহ কয়েকটি প্রপাগাণ্ডামূলক ডশিয়ার আমলে নিয়ে সদস্যদের ভোটে গণতান্ত্রিকউপায়ে নির্বাচিত দলীয় প্রার্থী অর্থাৎ লুৎফুর রহমানকে বাদ দিয়ে দেয় তারা। কিন্তু দমে যাননি লুৎফুর রহমান। লেবার পার্টিরমতো শক্তিশালী ও দুর্ভেদ্য একটি দলের বিরুদ্ধ স্রোতের বিপরীতে জনসমর্থন এবং ‘জনগণই ক্ষমতার উৎস’ সেই মন্ত্রে আস্থারেখে বুকটান করে দাঁড়িয়েছিলেন এক কঠিন যুদ্ধে এবং তিনি অবিশ্বাস্যভাবে সফলও হয়েছিলেন। ২০১০ সালের প্রথম নির্বাচনেযেমন স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েও বিপুল সমর্থনে জয়ী হয়েছিলেন, তেমনি ২০১৪ সালেও দ্বিতীয়বারের মতো নতুন দল গঠন করে সেইদলের ব্যানারে নির্বাচিত হয়েছিলেন লুৎফুর। স্বতন্ত্র কিংবা লোকাল দল থেকে নির্বাচিত হয়ে নির্বাহী মেয়র হিসেবে তাঁর নেতৃত্বেবারার উন্নয়নে যে কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি, সেটি তাঁর শত্রু—সমালোচক কেউই অস্বীকার করতে পারবে না। রবং নিজস্ব টাউন হলক্রয়, ফ্রি স্কুল মিল, এডুকেশন এলাউন্সসহ বেশকিছু যুগান্তরী প্রজেক্ট ও পদক্ষেপ সাধারণের প্রভুত প্রশংসা কুড়ায়।

এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, লেবার দলের হয়ে স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে বাংলাদেশী কমিউনিটির উত্থান ওসম্পৃক্ততা ব্যপকতা পেয়েছে। আর এখন শুধু লেবার নয়, রক্ষণশীল টোরি কিংবা লিবডেম পার্টিতেও বাংলাদেশীদের বিস্তৃতি ঘটেছে | 

  • সর্বশেষ