শিরোনাম

প্রকাশিত : ২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, ০৩:৪৮ রাত
আপডেট : ২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, ০৩:৪৮ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

সীমার মূল্য ও সীমিতকে মূল্য দেওয়া

সিরাজ ইসলাম

সিরাজ ইসলাম: বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বড় হয়ে বুড়ো হয়ে শেষে অসীমের অঞ্জলিপুটে টুটেলুটে পড়ছি জগদ্বিধানের প্রতি জন্মবন্ধ বশ্যতাবশে। বিপুল-প্রবীণ এ পৃথিবীতে তুচ্ছকীট-সমান আমাদের ক্ষীণক্ষণ-অস্তিত্ব। তাতে চিতাবহ্নির গন্ডিঘেরা আমাদের শত তুচ্ছতাময় অতিঅসম্পূর্ণতা। তবুও তারপরও কোনকিছুতেই আমাদের স্বতন্ত্র-সম্পূর্ণমূল্যের কিছুমাত্র হানি হচ্ছে না। কে বলবে, ছোট-আমাদের আপন সৃষ্টি ও দৃষ্টির ভিতর দিয়ে বিরাট-বিধাতারই সৃষ্টি ও দৃষ্টি ক্রমাগত বাঙময় হয়ে উঠছে না। ক্ষুদ্র গজফিতে যেমন চঞ্চলভাবে ঘুরতে ঘুরতে স্থির-বৃহৎকে মাপতে মাপতে এগিয়ে যায়, কে বলবে, সেভাবে আমাদেরও ছোটছোট সুখদু:খ জন্মমৃত্যুর পরিক্রমায়, সীমার এই অস্থির চলার ভিতর দিয়ে অসীমেরই পরিমাপ চলছে না। শিশিরবিন্দুতে সূর্যের রশ্মিচ্ছটার মতো প্রকাশলীলা চলছে না খন্ডের ভিতরে সমগ্রের। কে বলবে, চলন্ত ছায়ার মতো আমাদের এই যে জীবন, এই সীমা অসীমেরই ছায়া না! 

অথবা গগণের পদপ্রান্তে চির-নমস্কারে লুটিয়ে থাকা দিগন্তের ন্যায় প্রতিমুহুর্তে ধরণীর সীমা অসীমের পদস্পর্শ করে নেই! এবং সীমা আপনাতে-আপনি ধন্য হয়ে নেই সেই পবিত্র পদধূলিতেই। অথবা নাহয় অসীম বা এজাতীয়ও কিছু না। হয়তবা অজানা কোন বহুদূর-ছায়াপথের বহুমাত্রিক গবেষণাগারের এক কিশোর-ছাত্রের কাঁচাহাতের পরীক্ষা-নল আমাদের গ্রহ। তাতে আমরা বিবর্তনশীল জীবাণু একপ্রকার। সৌখিন রাসায়নিক পরীক্ষাদির মিথষ্ক্রিয়া সঞ্জাত। কিংবা নাহয় তা-ও না, তারচেও তুচ্ছ বিশৃংখল অণুরই ঘটনাক্রমিক সংযোজনে সৃষ্ট স্রেফ অর্থহীন সংগঠন। জড়ের অন্ধবিলাস শুধু – একেবারেই উদ্দেশ্যবিহীন। কিন্তু তাতেই কি? পশমেরও যেমন ছায়া আছে আপন প্রতিবেশে, তেমনি সীমার নিজ দর্পণে হয়ত সীমারও নিজস্ব প্রতিবিম্ব আছে। সেখানে নার্সিসের মত আত্মরূপে বিভোর হয়ে স্বয়ং সীমা আপনার কাছে আপনি সার্থক হয়ে আছে।  শত তুচ্ছতায়ও,  বাইরের শত বিচারেও তার এই স্বতন্ত্র স্বকীয় মূল্যের কোন হানি হচ্ছে না। পাতার শ্যামলিমা, কুসুমের কান্তি, কচিমুখের হাসি, কামনার বহ্নি, বাসনার ব্যাকুলতা এবং দীনতম মানবমনেরও অতল গভীরতা, এসবের কলকল্লোলে সীমাই সীমার স্বগতমূল্য সৃষ্টি করে চলছে নিজের পরিসরেই নিজের মূল্য কুড়িয়ে নিয়েনিয়ে অনবরত আপনাতে আপনি পূর্ণ হয়ে আছে। মৃত্যুর অনন্ত নীরবতায় বা মহাকাশের মহানির্জনতায় তার এই সম্পূর্ণমূল্যের কোন ক্ষতি হচ্ছে না। এই দৃশ্যকল্পে অসীমের চোখে সীমার মূল্য যা-ই হোক, সীমার নিজস্ব মূল্য সর্বোপরি সীমার নিজের কাছেই। সীমার এই স্বগতমূল্যেই চুপিচুপি অর্থময় হয়ে আছে সীমার পরিমন্ডলে বিচরণ করা সীমিত-আমাদেরও জীবন।
সীমার মূল্য প্রসঙ্গটাকে আরেকভাবেও দেখা যায়। কারো কাছে একটা জিনিসের মূল্য থাকলেই একমাত্র তার মূল্য। যেদেশে লোকেরা সোনাচান্দিকে আদৌ ইজ্জত দেয় না, সেখানে সোনাচান্দির পাঁচ পয়সা দাম নেই। অন্যকথায়, মূল্য জিনিসটাই মূল্যদাতা নির্ভর। তাই খদ্দেরের কাছে যতটুকু কদর, তা-ই একটা জিনিসের দর। মূল্য দেয়ার মন থাকলে সীমা ও সামান্যেরও অনেক মূল্য আছে, তেমন মন না থাকলে অসীম ও অসামান্যেরও কোন মূল্য নেই। আমাদের আপন উদর ও ভাঁড়ার যখন ভরা, তখন ভরপুর কি মনে হয় না সমস্ত সংসার? আমাদের চারদিকে ঝলমল দিবস থাকলে কি ভূমন্ডলের অন্য সর্বত্রকেও মনে হয়না উজ্জ্বল দিবস ময়? কিংবা নিজের ললাটে হঠাৎ আশার ঝলকানিতে কি দর্শন থেকে অদর্শন হয়ে যায়না সর্বব্যাপী নিরাশাবাদ? যেভাবে নিজ গৃহকোণে বাতি জ্বলে উঠলেই মনেমনে নিমেষে ঘুঁচে যায় জগতের সব অন্ধকার? 

সীমিতকে মূল্য দেওয়ার এ ধরনের উদাহরণ আরো অনেক দেয়া যায়। এভাবে মূল্যসংক্রান্ত এই উপযোগবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে দেখা যাবে, সীমার একমাত্র প্রাসঙ্গিক মূল্য শেষমেষ আমাদের নিজের কাছেই, আমাদের মনের মাপকাঠিতেই। আমাদের প্রতিদিনকেও যদি ইচ্ছায় কর্মে শক্তিতে সম্পদে ভরে তোলা যায়, তবে মনকে আর ফাঁকাফাঁকা করে তোলে না অনাদি ও অনন্তের বা বিগত ও অনাগতের কোন অনর্থক শূন্যতা। সীমা তখন আমাদের মনের সীমাশ্রয়ের মাঝেই অশেষ মূল্য পেয়ে সার্থক হয়ে অসীমের মুখোমুখি সগৌরবে দাঁড়িয়ে থাকে। তাহলে সীমার জীব আমরা সীমাকে যেন সীমার পরিমাপেই মাপি। অসীম দেশকালের পটভূমিতে তুচ্ছ বিন্দুরূপে সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে রেখে তাকে যেন অকারণ অবহেলা না করি। ওই অসম হরলবের ভগ্নাংশ কষে তাকে একেবারে ‘শূন্য’ না করে ফেলি। সীমাকে তার নিজের পরিসরে তার নিজের আসনে রেখেই তাকে যেন তার নিজস্ব মর্যাদাটুকু দিই। ফেসবুক থেকে

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়