শিরোনাম
◈ কালরাত স্মরণে এক মিনিটের ‘ব্ল্যাক আউটে’ বাংলাদেশ ◈ নারায়ণগঞ্জে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর মাকে নিয়ে কটূক্তি করায় বিএনপি নেতা আটক ◈ যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপিতে টর্নেডোর আঘাতে ২৩ জনের মৃত্যু ◈ আওয়ামী লীগকে এবার ইফতার পার্টি না করার নির্দেশনা প্রধানমন্ত্রীর ◈ বাংলার সমৃদ্ধি ক্ষতিপূরণ পেল ২৩৭ কোটি টাকা ◈ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের ব্যর্থতায় ২৫ মার্চের গণহত্যা হয়েছিল: মির্জা ফখরুল ◈ দুবাইয়ে আরাভ খান আটক হওয়ার তথ্য জানা নেই: আইজিপি ◈ নারী অধিকার কর্মীদের প্রতি ‘কোমল’ মনোভাব দেখানোর জন্যে ১০ বিচারপতিকে মৃত্যুদণ্ড সৌদি সরকারের ◈ ছুটির দিনে আজ যে কারণে ব্যাংক খোলা ◈ একাত্তরের গণহত্যার জন্য পাকিস্তানের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি

প্রকাশিত : ০২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩, ০১:৪৫ রাত
আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩, ০১:৪৫ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

গালফ এয়ারের পাইলটের মৃত্যু এবং ভুল চিকিৎসার অভিযোগ প্রসঙ্গে

রুমি আহমেদ

রুমি আহমেদ: গালফ এয়ারের একজন পাইলট ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে মারা গিয়েছেন কিছুদিন আগে। পাইলটের বোনের সংবাদ সম্মেলন দেখলাম মিডিয়াতে। উনি ভুল চিকিৎসার অভিযোগ করছেন। উনি চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ করছেন। আমি ওনার অভিযোগের সাথে পুরোপুরি একমত না। ওই নারীর অভিযোগ নিয়ে আমার কিছু অবজারভেশন আপনাদের সাথে শেয়ার করতে চাই। মহিলা যে টাইমলাইন দিয়েছেন তা অনুযায়ী ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে ফ্লাই আউট করার সময় ইমিগ্রেশন করার পর পাইলটের কার্ডিয়াক এরেস্ট হয় এবং ওখানে প্রথম সিপিআর দেওয়া হয়! 

এখানেই প্রথম স্কোপ অফ ডিসকাশন এবং অপর্চুনিটি ফর ইমপ্রুভমেন্ট। বাংলাদেশের এয়ারপোর্ট গুলোতে ২৪/৭ সিপিআর ট্রেইন্ড লোক কি থাকেন? এক্ষেত্রে চিকিৎসক হতে হবে বলে কথা নেই। ট্রেইন্ড যে কেউ সিপিআর দিতে পারেন। এই দায়িত্বেওটা নিরাপত্তা বাহিনীর বা সার্বক্ষণিক মেডিকেল সেন্টারের কর্তব্যরত চিকিৎসক বা নার্স রা নিতে পারেন। এক্ষেত্রে এদের সবার ভালো সিপিআর ট্রেইনিং দরকার। শুধু বাংলাদেশ না, উপমহাদেশের কোথাও-ই ভালো সিপিআর ট্রেইন্ড লোক তেমন নেই। কয়েকদিন আগে ভারতের জলপাইগুড়ির ডুয়ার্সে প্রিটায়ার্ড ফুটবলারদের এক টুর্নামের্ন্টে বাংলাদেশি এক খেলোয়াড় হানিফ রশিদ ডাবলু মারা গেলেন। ভিডিও ফিডে দেখলাম তাকে যেই সিপিআর দেওয়া হচ্ছে তাকে কোনো অর্থেই সিপিআর বলা চলে না। বাংলাদেশে আজকাল এসিএলএস এবং বিএলএস ট্রেনিং হয়। অনেক মানুষকে ট্রেনিং দিয়ে আমাদের সব পাবলিক প্লেসেই সার্বক্ষণিক সিপিআর ট্রেইন্ড ম্যানপাওয়ার এনসিউর করতে হবে। আর ‘এ ই ডি’Ñ অটোমেটেড এক্সটার্নাল  ডিফিব্রিলেটর। হয়তোবা আছে, তবে আমি দেখিনি। এগুলো সব পাবলিক প্লেসে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। পাবলিক প্লেসে এ ই ডি এখন একটা স্ট্যান্ডার্ড হয়ে গিয়েছে। সারা পৃথিবীতেই।

যা হোক ঢাকা এয়ারপার্টে পাইলট এর যখন প্রথম কার্ডিয়াক এরেস্ট হয় তখন তাকে সিপিআর দিয়ে রিভাইভ করা হয়। এটা ভালো খবর। অন্তত সেখানে রাত চারটার সময় সিপিআর ট্রেইনড লোক ছিল। বিদেশি এয়ারলাইন্স এর ক্রুরা সবাই সাধারণত সিপিআর ট্রেইন্ড হয়। হয়তোবা ওরাও ছিল সীনে। পাইলটের বোন বলছেন, এয়ারপোর্ট থেকে ইউনাইটেড হাসপাতালে পৌঁছুতে এক ঘণ্টা সময় লেগেছে। ভোর চারটার সময় তো জ্যাম নেই তেমন, এতো সময় লাগার কথা না। আমি জানি ঢাকা এয়ারপোর্টে অনেকগুলো এম্বুলেন্স আছে। আশা করবো ঢাকা এয়ারপোর্টে ২৪/৭ এক মিনিটের নোটিসে এম্বুলেন্সগুলো অ্যাক্টিভেট করার জন্য সার্বক্ষণিক লোকবল আছে বা এখন থেকে থাকবে। তারপরের ঘটনা ইউনাইটেড হাসপাতালের ইমার্জেসি বিভাগে। পাইলটের বোনের অভিযোগ, রোগী এসেছে সকাল পাঁচটায়, কিন্তু কোনো সিনিয়র বিশেষজ্ঞ তাকে দেখেননি সকাল নয়টা পর্যন্ত। এই পর্যায়ে এসে ভদ্র মহিলার অভিযোগের কিছু অংশ  খুব একটা গ্রহণযোগ্য থাকে না। 

আমেরিকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নত দেশে ৩০  আর ৯০ মিনিটের একটা রুল আছে। ডোর তো নিডল টাইম এবং ডোর টু ক্যাথ ল্যাব টাইম। রোগী ইমার্জেন্সি ডিপার্টমেন্টের দরজা দিয়ে ঢোকার পর রোগীর যদি এক বিশেষ ধরনের হার্টএটাক ধরা পরেÑ এসটি এলিভেশন এমআই তাহলে হয় ৩০ মিনিটের মধ্যে হার্টের রক্তনালী ব্লক খোলার ইনজেকশন দিতে হবে অথবা হাসপাতালে এনজিওগ্রামের সুবিধা থাকলে ৯০ মিনিটের মধ্যে এনজিও সুইট এ নিতে হবে। আমি জানি আমেরিকার সব বড় শহরেই এই ব্যবস্থা আছে। আমার ধারণা ইউনাইটেড এনজিওগ্রামের ব্যবস্থা থাকলেও ২৪/৭ হাসপাতালে অবস্থান রত অন ডিউটি ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট নেই। ২৪ ঘণ্টা হাসপাতালে ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট রাখা অনেক খরচান্ত ব্যাপার এবং আমাদের দেশে অতো ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট নেই-ও। 

বাংলাদেশে হয়তো এনআইসিভিডিতেই এই সুবিধা থাকার কথা কারণ সেখানে জুনিয়র ও ট্রেইনি বিশেষজ্ঞরা এই কাজগুলো করতে পারে। আর গরিব রোগীরা সিনিয়র মোস্ট বিশেষজ্ঞরা দাবিও করে না এবং কনসেন্ট নিয়ে ঝামেলা করে না। রোগী যদি সকাল পাঁচটায় পৌঁছে থাকে। সবচেয়ে আইডিয়াল সিচুয়েশনে সকাল সাড়ে ছটায় তার ক্যাথ ল্যাবে যাবার কথা ছিলো। রোগী মনে হয় ক্যাথ ল্যাবে গিয়েছে সাড়ে আটটা নয়টার দিকে। ওয়ার্ল্ড স্ট্যান্ডার্ডের দু’ঘণ্টা পরে। 

এ ক্ষেত্রে ইউনাইটেডের পক্ষেও কথা থাকতে পারে। ভদ্রমহিলা অভিযোগ করছিলেন, ওরা কেন দুর্বল ইংরেজি নিয়ে পরিবারের সাথে যোগাযোগ করছিলো কনসেন্টের জন্য। এখানে দুর্বল ইংরেজি দু’পক্ষেরই হতে পারে। আর ভদ্রোমিলা বলছিলেন, গালফ এয়ারকে না জিজ্ঞেস করে ফ্যামিলিকে কেন কল করা হচ্ছিলো। কারণ এটাই নিয়ম। মেডিকেল প্রসিডিউরের কনসেন্ট নেক্সট অফ  কিন (পরিবার) দিতে পারে, চাকরি স্থল না। আমার ধারণা এই কনসেন্টের জন্য কিছুটা সময়ক্ষেপন হয়েছে। আর এটাও ঠিক বিশেষজ্ঞরা আটটা সাড়ে আটটার আগে কাজে আসেন না। ২৪/৭ ডিউটি না থাকার ফলে এটাই স্বাভাবিক। আমি যা বুঝলাম তাহলো ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট আসার সাথে সাথেই রোগীকে ক্যাথ ল্যাবে নিয়ে গিয়েছেন আর এটাও ঠিক যে হাসপতালে এভেইলেবল ডাক্তার থাকলেও অনেক সময় রোগীর পরিবার কনসেন্ট দেওয়া নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগে ও কনসেন্ট দিতে সময়ক্ষেপন করে। পাইলটের বোন এনজিওগ্রামের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছিলেন মনে হয়। আমি হলফ করে বলতে পারি, ওই সময়ে ওই রোগীর এনজিওগ্রাম করা সম্পূর্ণভাবে প্রয়োজনীয় ছিলো। 

অনেক বছর আগে ইউনাইটেড হাসপাতালে ভোরবেলা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে গিয়েছিলেন চিত্রনায়ক মান্না। যা শুনেছি, মান্নার পরিবার সময়মতো সিদ্ধান্ত দিতে পারেনি, সময়ক্ষেপন করেছিল সিঙ্গাপুর ব্যাংকক ইত্যাদির কথা ভেবে। পাইলটের মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন হবার পর রোগীর বারবার হার্ট বন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো। এটা খুবই খারাপ লক্ষণ। বোঝা যাচ্ছিলো, খুব এক্সটেন্সিভ মায়োকার্ডিয়াক ইনফার্কশন হয়েছে। যেসব রোগীর বারবার হার্ট বন্ধ হতে থাকে, এনজিও সুটে হার্ট বন্ধ হবার সম্ভাবনা খুবই বেশি থাকে। 

ক্যাথ ল্যাব/এনজিও সুইটে এনজিওগ্রাম করার সময় হার্ট বন্ধ হয়ে যাবার ঘটনা আনকমন কোনো ঘটনা না। আমেরিকাতে আইসিইউর চিকিৎসক হিসেবে কাজ করার সুবাদে আমি অনেক অনেকবার ক্যাথ ল্যাবে ছুটে গিয়েছি কোড ব্লু এনাউন্সমেন্ট শুনে। কোড ব্লু মানে কারো হার্ট বন্ধ হয়ে গিয়েছে এবং এ ধরনের ক্ষেত্রে খুব কম রোগীকেই আমরা রিভাইভ করতে পেরেছি। যতদূর বুঝতে পারলাম, মহিলার কথা থেকে, পাইলটের লেফট মেইন অথবা এলএডি ৯৯ শতাংশ ব্লক ছিলো। লেফট মেইন অথবা এলএডি ৯৯ শতাংশ ব্লক এবং অলরেডি তিন চারবার হার্ট বন্ধ হয়ে গিয়েছে হার্টের এক্সটেন্সিভ ক্ষতি হয়ে যাবার কারণে। এই রোগীর মৃত্যুর সম্ভাবনা ৯০ শতাংশের উপরে। যেই অবস্থায় রোগীকে এনজিওগ্রাম করতে নেওয়া হয়েছিলো, তাতে মৃত্যু হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু ছিলো বলে আমার মনে হয় না। কিন্তু এনজিওগ্রাম করতেই হতো। 

পাইলটের বোনের সব অভিযোগ তাই আমলে নেওয়ার মতো না। সমস্যা যা হয়েছে, আগেই বলেছি এয়ারপোর্ট থেকে হাসপাতালে নিতে এক ঘণ্টা লেগেছে, যা লাগার কথা না। উচিত না। গ্রহণযোগ্য না। আর বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত ৯০ মিনিট ডোর তো ক্যাথ ল্যাব টাইম বাস্তবায়নের পর্যায়ে আসে নেই। দেশের সব শহরে অন্তত একটা হাসপাতালে এই ব্যবস্থা চালু করতে হলে আমাদের অনেক ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট লাগবে। তবে আমি আশাবাদী সারা দেশে না হলেই কয়েক বছরের মধ্যে দেশের বড় শহর গুলোতে অনেক হাসপাতালেই ২৪ ঘণ্টা ডিউটিরত  ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট থাকবেন এবং ৯০ মিনিটের মধ্যে ডোর তো ক্যাথ ল্যাব টাইম বাস্তবায়ন করা যাবে। লেখক: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়