শিরোনাম

প্রকাশিত : ২৬ জানুয়ারী, ২০২৩, ০১:১০ রাত
আপডেট : ২৬ জানুয়ারী, ২০২৩, ০১:১০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

বিজেপি বনাম এক ‘পাঠান’

আলতাফ পারভেজ

আলতাফ পারভেজ: বলিউডের ‘পাঠান’ মুভিটি প্রায় শতাধিক দেশে ২-৩ হাজার হলে একযোগে দেখানো শুরু হয়েছে। এ নিয়ে ভারতে কিছুটা উত্তেজনা আছে। যতদূর জানা যায়, গতানুগতিক অ্যাকশনধর্মী মুভি এটা। জেমস বন্ড টাইপের। তারপরও বাড়তি উত্তেজনার কারণ দুটি। বলিউড ভক্তদের আগ্রহের বড় জায়গাÑ চার বছর পর শাহরুখ খানের ফিরে আসা নিয়ে। অন্যদিকে আর-এস-এস পরিবারও উত্তেজনা ছড়িয়েছে শাহরুখ খানের কারণেই। তারা ‘পাঠান’কে বয়কটের ডাক দিয়েছে।

একই রাজনৈতিক ঘরনা কিছুদিন আগে ভারতে গণচীনের পণ্য বয়কটের ডাক দিয়েছিলো। চীনের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধে সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করতে না পেরে কেন্দ্রীয় সরকার ওই বয়কট আন্দোলনে পরোক্ষ ইন্ধনও দেয়। তবে শিল্পপতিদের জন্য সেটা বিব্রতকর অবস্থা তৈরি করেছিল। কারণ ভারতের অনেক পণ্যের কাঁচামাল আসে চীন থেকে। ২০২২ সালেও চীন থেকে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য এসেছে ভারতে। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে বয়কটের ডাক সফল হয়নি। 

আর-এস-এস কর্মীদের এরপরের নিশানা হয়ে দাঁড়ায় বলিউড এবং সেখানকার ‘খান’রাÑসালমান খান, আমির খান এবং বিশেষভাবে শাহরুখ খান। তারই অংশ হিসেবে পাঠান মুভিকে বয়কটের ডাক দেওয়া তারা। যদিও চলতি ‘বয়কট’ ডাকের মূল কারণ শাহরুখ খানের পেশাগত ব্যবসা ঠেকানো কিন্তু অজুহাত এবং আপত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয় পাঠান ছবির নায়িকা দীপিকার গেরুয়া রঙয়ের বিকিনিকে। আর-এস-এসের মতো একটা বড় এবং পুরানো দল আদর্শিকভাবে কী নাজুক অবস্থায় আছে সেটা বোঝা যায় তার এরকম হাস্যকর অজুহাত থেকে। 
পাঠানের প্রযোজকের দাবি, মুভিতে তারা ২৫০ কোটি রুপি বিনিয়োগ করেছেন। স্বভাবত তাদের দিক থেকে যেকোনো বয়কটের ডাকে নার্ভাস হওয়ার কারণ আছে। কিন্তু খবর হলো মুভিটি ব্যাপক ব্যবসা করতে যাচ্ছে। প্রথম দিনই অন্তত ৩০ কোটি রূপি আয় করবে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, আর-এস-এস পরিবারের ব-য়-ক-ট আন্দোলনগুলো মাঠে টিকছে না কেন? আবার ব-য়-ক-টের ডাকে সাড়া না দিলেও একই ভোক্তাদের বড় অংশ ভোটের সময় আর-এস-এস পরিবারকেই ভোট দিচ্ছে কেন?

এরকম প্রশ্নের পুরো উত্তর ভারতীয় সমাজ বিজ্ঞানীরাই ভালো বলতে পারবেন। তবে দূর থেকে যেটা মনে হয়, প্রতিযোগিতামূলক পুঁজিতন্ত্রের মাঝে ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের পছন্দের বিষয়টা অর্থনীতি ও জৈবিক তাড়ানা দ্বারাই প্রভাবিত হয়। যে কারণে তুলনামূলক সস্তা চীনা পণ্যকে বাজারে আটকানো যাচ্ছে না; কিংবা কয়েক রুপি খরচ করে তিন ঘণ্টার বিনোদনের সুযোগও হাতছাড়া করতে আগ্রহী নয় অনেকে। চীনা জিনিসের মতো এই বিনোদনটুকুও তার কাছে একটা দরকারী পণ্য। যা হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলমান, নাস্তিকÑ যেকোনো অভিনেতার কাছ থেকে পেলেই  চলে। 

কিন্তু রাজনীতির ময়দানে ওই একই মানুষকে আর-এস-এসের ঠুনকো পরিচয়বাদে আগ্রহী দেখা যাচ্ছে। সেখানে তাদের ভাষা, ধর্ম, আঞ্চলিকতা কিংবা ইতিহাসের কল্পিত গৌরব দ্বারা চালিত হতে দেখা যায়। তাঁদের মস্তিষ্কের রাজনৈতিক বিবেচনার ভেতর সেগুলো ঢোকে বা ঢোকানো হয় পরিবার, বিদ্যাপীঠ, নাটক, সিনেমা, গান, বইসহ বিবিধ বয়ানের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায়। যেগুলোকে বলা যায় সমাজের ভাবাদর্শিক হাতিয়ার। এসব ‘হাতিয়ারে’র নিরবিচ্ছিন্ন চেষ্টার পরও আবার নাগরিক চরিত্রে ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক বিবেচনা এবং রাজনৈতিক পছন্দের স্ববিরোধিতা একদম নাই হয়ে যায় না। এটা সমাজ বিজ্ঞানে বেশ ধাঁধাঁর মতো। 

কাল যখন পাঠান মুভি রিলিজ হবে—তখন হলগুলোর উপচে পড়া ভিড় একই ধাঁধাঁ আকারে হাজির হবে আরএসএসের কাছে। মোহন ভাগতরা তখন হয়তো দস্ববিরোধী এই নাগরিক জীবনকে আরও খাঁচায় পুরতে আরও বেশি নিয়ন্ত্রণমূলক ভাবাদর্শের কথা ভাববেন। আরও বেশি ‘শাখা’ বিস্তার করতে তৎপর হবেন। অথচ এর সহজ উত্তর রয়েছে বহুত্ববাদে। যেখানে শাহরুখ খানদের মূল্যায়ন হওয়ার কথা ‘খান’ পরিচয় দিয়ে নয়Ñ৫৭ বছর পরও ‘নায়ক’ হয়ে ফিরে আসার পরিশ্রম আর যোগ্যতা দ্বারা। 
বলা বাহুল্য, ফ্যা-সি-স্ট আইডলজিক্যাল এপারেটাসগুলো বহুত্ববাদের ওই যাত্রায় বড় চ্যালেঞ্জ আকারে হাজির আছে দক্ষিণ এশিয়ার সর্বত্র। তাদের কোলাহলে চারিদিকে অস্থির অবস্থা। এর মাঝেই শাহরুখের মতো কারো কারো ব্যক্তিগত অদম্যতা ফ্যা-সি-বা-দকে থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করেÑ অন্তত কিছু সময়ের জন্য। ‘পাঠান’-এর শাহরুখ নিশ্চয়ই এ মুহূর্তে একজন বিনোদনকারী পেশাজীবীর চেয়ে বেশি কিছু বার্তা বয়ে আনলেন রাজনৈতিক বিভেদবাদীদের জন্য। ফেসবুক থেকে 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়