শিরোনাম

প্রকাশিত : ২৪ নভেম্বর, ২০২২, ১২:৫৮ রাত
আপডেট : ২৪ নভেম্বর, ২০২২, ১২:৫৯ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ঘৃণা নয়, ভালোবাসার জয় হোক 

অজয় দাশগুপ্ত

অজয় দাশগুপ্ত: প্রিয় দল আর্জেন্টিনা হারায় যেমন কষ্ট পেয়েছি, তেমনি মন খারাপ হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার পরাজয়ের খবরে। জয়ী দুই দেশ সৌদি আরব ও ফ্রান্সের জন্য শুভ কামনা। সৌদি আরব উদীয়মান শক্তি। আর ফ্রান্স এমনিতেই আমার সেকেন্ড চয়েজ। সকালে নিয়ম মাফিক ডাক্তারের কাছে গেলাম। পোল্যান্ড থেকে আগত ডাক্তার এডামেরও মন কিছুটা খারাপ। হাসতে হাসতে বললো, তার পিতৃভূমির সেরা খেলোয়াড়টি পেনাল্টি থেকেও গোল করতে পারেনি। কিন্তু একটি বারের জন্যও মেক্সিকোর বিরুদ্ধে বলেনি ডাক্তার। ক্যাফেতে গিয়ে ব্রেকফাস্ট করার সময়ও কানে এলো আলোচনা চলছে। নিজ দেশ ফরাসিদেশের কাছে পরাজিত হওয়ার পরও শুনলাম মুক্ত কণ্ঠে ফ্রান্স বন্দনা।

শুনলাম বিগেস্ট আপসেট ঘটানো মেসির দলের জন্য সহানুভূতি ও ভালোবাসার কথা। 
 সমর্থন আর উন্মাদনার তফাৎ আগেও বলেছি। আপনি যেকোনো দেশ বা দলকে সমর্থন করতেই পারেন। এমন না যে বাংলাদেশ বা দেশের বাইরে বসবাসরত বাঙালিরা কেবল দুটি দেশের সমর্থক। জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, চিলি, ইংল্যান্ডসহ নানা দেশের সমথর্নে বাঙালির জুড়ি মেলা ভার। এই যে বিশ্বকাপের মূল আনন্দই আসলে দেশ জাতিকে এক করা। যুক্ত করা। আপনি কোনো দেশের পতাকা বা তাদের জার্সি গায়ে দিলেই কি তাদের একজন হয়ে গেলেন? আপনি নিছক একজন সমর্থক মাত্র। বিশ^ব্যাপী ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি ভক্তের একজন। তা নিয়ে আপনি গর্ব করতে পারেন কিন্তু মারমুখি হবেন কেন? কেন হবেন আক্রমণাত্মক? এতে আপনার লাভ? ভেবে দেখুন দিন শেষে যাদের কাছে যেতে হবে যাদের সাথে সময় কাটাবেন তাদের কাউকে কাউকে সারা জীবনের জন্য দুশমন বানিয়ে ফেলছেন না তো? এতে আপনার আমার সব মিলিয়ে সমাজের লোকসান। এই মন্দকাজ না করলেই কি নয়? 

ল্যাতিন আমেরিকানরা একসময় ফুটবলের যাদুকর হিসেবে বিবেচিত হতো। এখনো তারাই এগিয়ে। কিন্তু তার মানে এই না যে কালে কালে খেলা অন্য দেশে জনপ্রিয় হয়ে এমন একটা জায়গা নেবে না যা ল্যাতিন আমেরিকাকেও একসময় ছাপিয়ে যেতে পারে। ইউরোপের ফুটবলে যে গতি তার কাছে হার মানছে সবাই। হয়তো আগামী দিনে এশিয়া আফ্রিকাও হয়ে উঠতে পারে পরাশক্তি। তার জন্য সবুর করা আর নিজেদের মানসম্মান বজায় রাখা জরুরি বৈকি। আজকাল কেন কিছু অনুবাদ করার জন্য মানুষের সাহায্যের দরকার পড়ে না। কম্পিউটার নিজেই তা করতে জানে। ভাবুন তো আমাদের অশ্লীল কদর্য ভাষার পোস্টগুলো যদি বিদেশিরা পড়ে তারা আমাদের পাগল ছাড়া আর কী ভাববে? 
আর্জন্টিনার সমর্থক হলেই ব্রাজিলবিরোধী বা আর কারো ভালো চোখে পড়বে না এটা যেমন কাজের কথা নয় তেমনি ব্রাজিল ব্রাজিল করে নিজ দেশ ও সমাজের মানুষকে আঘাত করা সবার চোখে হাসির পাত্র হবার দরকার আছে? আমরা তো খেলার মান নিয়ে কথা বলি না। কৌশল বুঝি না। জয় পরাজয়ের ধারা মানি না। আমাদের কথা শুনবে কে? ফুটবল বিশ্বকাপে খেলা দূরে থাক ধারে কাছে নাই কিন্তু দলে দলে ভাগ হয়ে লড়াইতে সবার আগে আছি। কাল থেকে যা দেখছি বা চোখে পড়ছে বিষ মাখানো হিংসা ও ঈর্ষা ছাড়া কিছুই নেই এতে।

দেখে শুনে মনে হয়, ব্রাজিল বা তাদের খেলোয়াড়েরা যতোটা তার চেয়ে বেশি বুঝি, বেশি জানি আমরা। এ জাতীয় ঘৃণা সম্ভবত ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে নিজেদের হীনমন্যতা কিংবা আক্রোশেরই বহিঃপ্রকাশ। কেউ হারে কেউ জেতে। কেউ খুশি হয় কেউ কাঁদে, কিন্তু পৃথিবীর আর কোনো সমাজে এমন ঘৃণার চর্চা চোখে পড়ে না। আপনি আমি পা ধরে টানাটানি করলেও মেসি বা আর্জেন্টিনাকে নামানো যাবে না। ফুটবলের ঈশ্বর আর্জেন্টিনা ব্রাজিল বা তাদের মতো দলকে কান ধরে উপরেই তুলতে থাকবে। আবেগপ্রবণ জাতি আমরা। মেসি নেইমারেরা আমাদের নাম জানে না। চেনেও না। অথচ তাদের জন্য আমরা হাসি কাঁদি লড়াই করি। এই অপার্থিব আনন্দটুকু থাক না যার যার জন্য। আজ আর্জেন্টিনার সমর্থকদের কাঁদতে দিন। একদিন হয়তো আপনার চোখের পানি মুছিয়ে দিতে এগিয়ে আসবে ওরা। মন খারাপ হোক ভালো হোক। ভালোবাসি আর্জেন্টিনা। তাদের জন্য শুভ কামনা। কারো জন্য নয় ঘৃণা। যার যা খুশি করুক দল। জয়তু খেলা জয় ফুটবল।

অজয় দাশগুপ্ত: লেখক ও কলামিস্ট

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়