শিরোনাম

প্রকাশিত : ০৫ অক্টোবর, ২০২২, ০১:৫৩ রাত
আপডেট : ০৫ অক্টোবর, ২০২২, ০১:৫৩ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

দুর্গাপূজা ও বিবিধ 

মিরাজুল ইসলাম

মিরাজুল ইসলাম: কয়েক বছর আগে পূজার সময় ঢাকায় বেড়াতে আসা বন্ধু সুকল্যাণ আড্ডা প্রসঙ্গে জানালো, দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে কলকাতার এক মণ্ডপে বিশেষ কোরিওগ্রাফির প্রস্তুতি নিচ্ছে। তার সেই নির্দেশিত নৃত্যে দেবীর প্রতি আরতি অংশ থাকবে। আমি তখন জানতে আগ্রহী হলাম পুরোহিতের দেয়া এই ‘আরতি’ বলতে কী বোঝায়? সুকী সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যায় জানালো, এই জগত যে পঞ্চভূত দিয়ে তৈরি হয়েছে তার প্রত্যেকটি প্রতীকীভাবে দেবীকে নিবেদন করাই হলো, আরতি। সেই পাঁচটি জিনিস হলো- ক্ষিতি, অপঃ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম। অর্থাৎ মাটি, পানি, আগুন, বায়ু ও আকাশ। সাথে আরো জানলাম, দুর্গাপূজায় বানানো মূর্তিতে যে দশ জায়গার মাটি লাগে তার মধ্যে একটি হচ্ছে বেশ্যাবাড়ির মাটি। পূজার সর্বজনীনতা এবং পূণ্যের প্রতীকী হিসেবে সেই মাটি ছাড়া পূজা সম্পন্ন হয় না। তথ্যটি আমাকে চমৎকৃত করলো। বিষয়টি বিশদ জানতে আগ্রহী হলাম। অনেকে এটা শুনে ভুল বুঝতে পারেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আমরা এই যুগে ঘাটে-হাটে-ফ্ল্যাটে বেশ্যা বলতে যা বুঝি তা কিন্তু এক্ষেত্রে বোঝানো হয়নি। অনেকে এর অপব্যাখ্যা দিয়েছেন। বেশ্যার সংস্কৃত শব্দের অর্থ না জানার কারণে এই বিভ্রান্তি। ‘অভিষিক্তা ভবেৎ বেশ্যা ন বেশ্যা কুলটা প্রিয়ে’ মহানির্ববান তন্ত্র। পূর্ণাভিষেকো দেবেশি দশ বিদ্যাবিধোস্মৃত, অর্থাৎ- দশ মহাবিদ্যার উপাসকগণই পূর্ণাভিষেকের অধিকারী, অন্য কেউ নহে। কুলার্ণব তন্ত্র। এই ‘দীক্ষা পুরশ্চরণ: পূর্ণাভিষেক’ মন্ত্রচৈতন্য হওয়ার ফলে যিনি দেবত্বে উন্নীত হয়েছেন, এরকম অভিষিক্তাকে শাস্ত্রে বেশ্যা বলা হয়েছে। আর তাঁরা যেখানে বাস করেন সেই দ্বারের মাটিকে পতিতালয়ের মাটি বলা হয়।
বর্তমান সমাজের সাধারণ বারবনিতাদের পতিতালয়ের মাটিকে সেই হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। বরঞ্চ এই ঘৃণিত পাপকে হিন্দু শাস্ত্রে প্রায়শ্চিত্ত করতে বলেছে, বর্তমান সময়ে পুরাকালের এই সিদ্ধি-দেবী রূপী ‘বেশ্যা’ নেহায়েত পৌরাণিক অদৃশ্য চরিত্র বিধায় প্রাতিষ্ঠানিক পতিতালয়ের মাটি প্রতীকী ভাবে ব্যবহার করা হয়। নতুনতর ব্যাখ্যায় দেখতে পাই, ‘দূর্গা পুজার সময় দশ ধরনের মাটি প্রয়োজন হয় । তার মধ্যে বেশ্যার দরজার মাটি অপরিহার্য। বলা হয়, বেশ্যারা নাকি পুরুষদের কাম (যৌনতা) নীলকন্ঠের মতো ধারন করে সমাজকে নির্মল রাখে বলে বেশ্যাদ্বার মৃত্তিকা অবশ্য প্রয়োজনীয়’। (তথ্যসূত্র: সানন্দা ১৮ এপ্রিল ১৯৯১ দেহোপজীবিনী সংখ্যা, শিবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘গণিকাবৃত্তি : সমাজ, সংস্কার এবং সমীক্ষা’ প্রচ্ছদ প্রতিবেদন, পৃষ্ঠা ১৯) শুধু তাই নয়, বেশ্যা’র দেবোত্তর লাভের প্রমাণ মিলে কালিদাসের রচনাতেও। কালীদাস রচিত শকুন্তলায় আছে-  বিশ্বামিত্র ইন্দ্রত্ব লাভের আশায় তপস্যা করছিলেন। তখন ইন্দ্র ভীত হয়ে মেনকাকে পাঠান বিশ্বামিত্রের তপস্যা ভঙ্গ করার জন্য। মেনকা সম্পূর্ণ বিবস্ত্রা হয়ে বিশ্বামিত্রের সামনে উপস্থিত হন। ফলে বিশ্বামিত্র তপস্যা ভুলে মেনকার সাথে মিলিত হলে শকুন্তলার জন্ম হয়। অর্থাৎ একমাত্র পতিতারাই পারেন দেবতার ধ্যান ভাঙ্গিয়ে দিতে। এক্ষেত্রে পতিতাদের ক্ষমতা দেবতাদের থেকেও বেশি। আরেকটু ঘাঁটতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের ‘পতিতা’ নামের কবিতাটি খুঁজে পাই : ‘ধন্য তোমারে হে রাজমন্ত্রী, চরণপদ্মে নমস্কার। লও ফিরে তব স্বর্ণমুদ্রা, লও ফিরে তব পুরস্কার।  ঋষ্যশৃঙ্গ ঋষিরে ভুলাতে পাঠাইলে বনে যে কয়জনা সাজায়ে যতনে ভূষণে রতনে, আমি তারি এক বারাঙ্গনা। দেবতা ঘুমালে আমাদের দিন, দেবতা জাগিলে মোদের রাতি ধরার নরক-সিংহদুয়ারে জ্বালাই আমরা সন্ধ্যাবাতি’। 
ইতিহাসের পাঠক মাত্রই জানেন, শত বছর আগেও সমাজে পতিতা বা বেশ্যাদের নির্দিষ্ট মর্যাদা ছিলো। আধুনিক পাঠকেরা সুনীলের ‘সেই সময়’ উপন্যাসে তার কিছুটা আন্দাজ পেতে পারেন। এবার অন্য প্রসঙ্গ। ১৯৬২ সালে সতীশচন্দ্র চক্রবর্তী সম্পাদিত, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মজীবনীতে জানা যায় শুধু মাত্র দ্বারকানাথ ঠাকুর (রবীণ্দ্রনাথের দাদা) কলকাতার একটি এলাকাতেই তেতাল্লিশটি বেশ্যালয়ের মালিক ছিলেন। রাজা রামমোহন রায়ের এক সন্তান জন্মেছিলো পতিতার গর্ভে। এমনকি রবীন্দ্রনাথের কথিত সিফিলিস রোগে আক্রান্ত হবার অন্যতম কারনও ছিলো নিয়মিত বেশ্যা বাড়িতে গমন। (তথ্যসুত্র: অবিদ্যার অন্তঃপুরে, নিষিদ্ধ পল্লীর অন্তরঙ্গ কথকতা, ড. আবুল আহসান চৌধুরী : শোভা প্রকাশ)। যদিও এই তথ্য নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক আছে। সে যাই হোক। এই অবিদ্যার ধারণাটিকে সর্ববিদ্যার মাধ্যমে ধারণ করতে না পারলে মনীষীরা তখন জিজ্ঞাসা করেন, পথিক তুমি কি পথ হারাইয়াছো? লেখক ও চিকিৎসক

  • সর্বশেষ