শিরোনাম

প্রকাশিত : ০২ অক্টোবর, ২০২২, ০২:১৪ রাত
আপডেট : ০২ অক্টোবর, ২০২২, ০২:১৪ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ব্রাজিলীয়ান রাজনীতিবিদ লুলার জন্য ভালোবাসা

মঞ্জুরে খোদা টরিক

মঞ্জুরে খোদা টরিক: লুলার রাজনৈতিক জীবন সত্যিই বিস্ময়কর। তিনি তৎকালীন সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। একটি শক্তিশালী ও বৃহত্তর ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। নিজে ওয়ার্কার্স পার্টি নামের একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে সে দলকে ক্ষমতায় এনে ১২ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। তার সবচেয়ে বড় সাফল্য সামাজিক রূপান্তরের কর্মসূচির মাধ্যমে দুই কোটির অধিক মানুষকে অতি দারিদ্র্য থেকে বেড় করে আনতে পেরেছিলেন।

লাতিন আমেরিকার ইতিহাসকে নানা ভাবে রক্তাক্ত করা হয়েছে। সেখানে যখনই গণমানুষের পক্ষের কোন নেতা ক্ষমতায় এসেছেন, মার্কিনরা হয় সেনা অভ্যুত্থান না হয় তথাকথিত বিচারিক প্রক্রিয়ায় শাসকের পরিবর্তন ঘটিয়েছে। আর তাকে বৈধতা দিতে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও মানবাধিকার রক্ষার কথা বলেছে।  একই কাজ করতে ভেনেজুয়েলা, বলিভিয়ায়- কত পথ-ফন্দিই না আটলো কিন্তু শেষ অবধি কার্যসিদ্ধ হয়নি। তাদের অপকর্মের অতীতে চিলিসহ অন্যান্য দেশের উদাহরণে আর না যাই। ব্রাজিল দক্ষিন আমেরিকার সর্ববৃহৎ দেশ। মার্কিনের সেই নকসা থেকে ব্রাজিলও বাদ যায়নি। লুলা’র দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি যখন ব্রাজিলের গরিব মানুষের জীবন বদলে দিতে শুরু করে, তখনই পশ্চিমা শক্তি তার পথও কন্টকিত করে তোলে। 

মার্কিন আধিপত্য ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে লুলা রাজনীতির শুরু থেকেই সোচ্চার ছিলেন। মার্কিনীরাও চুপ করে বসে থাকেনি তাকে দৃশ্যপট থেকে চীরতরে সরিয়ে দিতে কঠিন ছকে তাকে বেধে ফেলতে চেয়েছেন। সেই ছকে লুলাকে রাজনীতি থেকে উৎখাত করে জেলে পরা হয়েছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ব্রাজিলের প্রাকৃতিক সম্পদ নিজেদের কব্জায় নিয়ে লুলা’র বিপ্লবাত্মক জনমূখী কর্মসূচিগুলো থামিয়ে দেয়া। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা তা করতে পারেনি তিনি রাজনীতির মধ্যে মঞ্চে ফিরে এসেছেন।

ভোটের রাজনীতিতে লুলাকে হারিয়ে তার অনুগত শাসককে দিয়ে দেশ চালাবেন কিন্তু সে কাজ হবে বড়ই কঠিন। তা বুঝতে পেরেই আইন-আদালতের মারপ্যাচে লুলাকে আমৃত্যু জেলে রেখে, তাঁকে হত্যার বন্দবস্ত করে পশ্চিমা শক্তি। কিন্তু এরমধ্যেই তাঁকে ফাসিয়ে দেয়ার- ‘অপারেশন কারওয়াশ’-এর সেই ঘৃণ্য নীল নকসা প্রকাশ হয়ে যায়। প্রমান হয়ে যায় তা ছিল মিথ্যা ও সাজানো নাটক। সেই কূকীর্তির একজন প্রধান কুশীলব বিচারক সের্গিও মরো পরবর্তিতে বর্তমান শাসকের আইনমন্ত্রী হন। যে কারণে ২০১৮ সালের নির্বাচনে লুলাকে অংশগ্রহণ করতে দেয়া হয়নি। তাকে জেলে আটকে রাখা হয়।

লুলা ব্রাজিলের নিম্ন আয়ের মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থানের জন্য অভূতপূর্ব কাজ করেন। দেশের অর্থনীতিতে গতিশীলতা তৈরী করেন। প্রত্যেক দরিদ্র পরিবারের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করেন। ৩৫ ডলারের নিচে যাদের মাসিক আয় যেসব পরিবারের সন্তানেরা স্কুলে নিশ্চিত করতে ৭০ ডলার করে ভাতা প্রদান করেন। সে সব ছেলেমেয়েরা যেন অপরাধের সাথে যুক্ত না হয় সে ব্যবস্থাও করেছেন। এবং এই উদ্যেগে ব্রাজিলের সমাজ অনেকাংশে অপরাধমুক্ত হয়। শ্রমজীবী মানুষের মজুরী ১০০ ডলার থেকে বাড়িয়ে ২০০ ডলার নির্ধারণ করেন। সবচেয়ে অবাক বিষয়, সামগ্রিকভাবে নিম্নআয়ের বিপুল মানুষদের সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনতে লুলা বরাদ্দ করেছিলেন তাঁদের জাতীয় আয়ের মাত্র ৫.৫ শতাংশ অর্থ।   

নিম্নআয়ের মানুষের জন্য লুলা’র এই জনমূখী কর্মসূচী ও তাঁর ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মকান্ড তাঁর জনপ্রিয়তাকে আরো উর্ধমূখী করে। কতটা উর্ধমূখী করেছিল সেটা বোঝা যায়- তিনি যখন ২০১১ সালে অফিস ত্যাগ করেন, তখন তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল ৯০ শতাংশের উপরে। এ কারণেই লুলাকে বিশ্বের সর্বাধিক জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ ও শাসক হিসেবে অভিহিত করা হয়। এবারের নির্বাচনে লুলা’র বিজয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ব্রাজিল বিশ্বের অন্যতম বৃহত অর্থনীতি। বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী অর্থনৈতিক জোট ব্রিকসের (ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চীন, সাউথ আফ্রিকা) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক বাস করে এই অঞ্চলে। বর্তমান তুমুল উত্তেজনাপূর্ণ বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতির এই পেক্ষাপটে লুলা ডি সিলভা’র মত ক্যারিসমেটিক নেতৃত্বের অভিষেক ও তৎপরতা অপরিহার্য। ২ অক্টোবর, রবিবার ব্রাজিলে প্রথম দফার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। আশা করি নির্বাচনে তিনি তৃতীয়বারের মতো ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। ব্রাজিলের সকল জনমত জরিপ সে কথাই বলছে। লুলার জন্য শুভেচ্ছা ও ভালবাসা। লেখক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়