শিরোনাম
◈ হত্যাচেষ্টার অভিযোগ: থানায় জিডি করলেন চিত্রনায়িকা বুবলি ◈ যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে দেশের পথে প্রধানমন্ত্রী  ◈ সেপ্টেম্বরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪৭৬, নিহতদের এক-পঞ্চমাংশের বেশি পথচারী ◈ ‘অর্থনীতিসহ সার্বিক পরিস্থিতি নাজুক হওয়ায় দেশ এখন দেউলিয়ার পথে’ ◈ বঙ্গোপসাগরে চলতি মাসে ২-১টি লঘুচাপ সৃষ্টি হয়ে ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে: আবহাওয়া অধিদপ্তর ◈ প্রেস ক্লাবে তোয়াব খানের দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত ◈ নেতাকর্মীদের পুলিশের সামনে ঠেলে দিয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চায় বিএনপি: তথ্যমন্ত্রী ◈ সব আন্দোলনে নেতৃত্ব দিবেন বেগম খালেদা জিয়া: মির্জা ফখরুল ◈ দুর্গাপূজায় জঙ্গি হামলার কোনো হুমকি নেই: র‍্যাব ডিজি ◈ তোয়াব খানের প্রথম জানাজা সম্পন্ন

প্রকাশিত : ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২২, ১২:৪৭ রাত
আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২২, ০৭:৪০ বিকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

মেট্রোরেল আসছে

মো. হাবিবুল আলম

মো. হাবিবুল আলম: ২০১৫ সালে চীনের বেইজিংয়ে গিয়েছিলেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শাহিন-উর রশিদ। লক্ষ্যÑপিকিং বিশ^বিদ্যালয়ে একটি সেমিনারে যোগ দেওয়া। হোটেল থেকে বের হয়ে ক্যাব নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। স্থানীয় সময় সকাল ৮টা। দেশের রাস্তায় সাধারণত এই সময়ে প্রচণ্ড যানজট থাকে। কিন্তু ৪৫ মিনিটের যাত্রায় এক জায়গায় ক্যাবটি দাঁড়িয়েছিল সর্বোচ্চ ২ মিনিট। কোনো ধরনের যানজট ছাড়াই বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছান তিনি। সেমিনার শেষ করে ফেরার জন্য এবার পাতাল রেল বেছে নেন তিনি। ফেরার সময়ও কোনো ঝামেলা ছাড়াই দ্রুত নিজ গন্তব্য হোটেলে পৌঁছান। সেমিনার শেষ করে যখন দেশে ফিরছিলেন, তখন ভাবছিলেন, নিজ দেশে যদি যোগাযোগের আধুনিক এমন সুবিধা পাওয়া যেত, তাহলে কতই না ভালো হতো! 

বন্ধুর জন্মদিনের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ফার্মগেট থেকে পাবলিক বাসে উঠে বসেন নাসির। রাজধানীতে থাকছেন আজ প্রায় ২০ বছর। নগরীর অলিগলি সবকিছুই তার চেনা। তাই যানজট এড়াতে মিরপুর-১ হয়ে মিরপুর-১০ যাবেন বলে মনস্থির করলেন। যাওয়ার সময় যানজট পেলেন না খুব বেশি। তবে বিপত্তি বাধল ফেরার সময়। রাত তখন ১১টা। এই সময় কোনো যানজট থাকবে না ভেবে মিরপুর-১০ থেকে বাসে উঠলেন ফার্মগেটের উদ্দেশে। শ্যাওড়াপাড়া পৌঁছাতেই বাস আর চলছে না! কী হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছিলেন না নাসির। পাশে বসা যাত্রীকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলেন, রাস্তায় খুঁড়াখুঁড়ির কাজ চলছে। সেজন্য রাস্তার একপাশ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অবশেষে প্রায় ৪৫ মিনিট পরে বাসটি ছাড়ে। 

শাহিনের আক্ষেপ আর নাসিরের মতো হাজার হাজার যাত্রীর প্রতিদিনের ভোগান্তির অবসান ঘটছে শীঘ্রই। তীব্র যানজটে নাকাল হওয়া রাজধানীবাসী এখন মুখিয়ে আছেন মেট্রোরেলের জন্য। পদ্মার সেতুর পর চলতি বছরের ডিসেম্বরে উত্তরা-আগারগাঁও অংশ খুলে দেওয়া হবে বলে নিশ্চিত করেছেন সেতু ও যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়েদুল কাদের। সবার আশা, পদ্মা সেতুর মতোই ঢাকাবাসীর জন্য আশীর্বাদ হবে মেট্রোরেল। 

প্রথম ধাপে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরত্বে চলবে ১০ সেট ট্রেন। মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের মতে, এটি ভ্রমণের সময় এবং যানবাহন পরিচালনার খরচের পরিপ্রেক্ষিতে বছরে প্রায় ৩৫০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে সরকারের। মেট্রোরেল চালু হলে অনেক সুবিধা পাওয়া যাবে। এর একটি, বেশি যাত্রী ধারণক্ষমতা। জানা যায়, প্রতি ঘণ্টায় ৬০ হাজার যাত্রী বহন করবে মেট্রোরেল। ফলে গণপরিবহণে যাত্রীদের ভোগান্তি কমবে। উত্তরা-মতিঝিল পর্যন্ত ভ্রমণের সময় এক ঘণ্টারও কম হবে। স্বাভাবিক সময়ে এই দূরত্ব যেতে এখন প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে। 

একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন সাবিয়া ইয়াসমিন। সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের প্রশংসা করে সাবিনা বলেন, ‘পদ্মা সেতু চালুর মধ্য দিয়ে বড়ো একটি সাফল্য অর্জিত হয়েছে। এর সুফল ইতোমধ্যেই পেতে শুরু করেছেন দেশবাসী। যানজটে নাকাল হওয়া যাত্রীরা এখন কোনো ধরনের ঝামেলা ছাড়াই গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন দ্রুত। নৌপথের ভাড়া কমেছে, কমেছে আকাশপথের ভাড়াও। পদ্মা সেতুর পর এবার পালা মেট্রোরেলের। এই সুবিধা চালু হলে সহজে আরও দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে, যাত্রা হবে আরামদায়ক। বিদেশে গণপরিবহণের যেমন সুবিধা পাওয়া যায়, এমন সুবিধা এখন দেশেই পাওয়া যাবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন সামিয়া। থাকেন উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরে। নানাবাড়ি মিরপুর-১০-এ। মাঝেমধ্যে এখানে বেড়াতে আসেন তিনি। এতদিন বাসে করে নানাবাড়িতে আসতেন। এখন ভাবছেন মেট্রোরেলে উত্তরা থেকে মিরপুর আসবেন। বললেন, ‘নারীদের জন্য আলাদা বগি থাকলে বাড়তি সুবিধা পাওয়া যাবে। বিশেষ করে যৌন হয়রানি কমে যাবে। কমলাপুর পর্যন্ত যাতায়াত শুরু হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা আমার জন্য আরও সুবিধা হবে।’

দেশে রেলসেবার মান নিয়ে বেশ উদ্বেগ আছে, আছে ক্ষোভও। অনেকেই মনে করেন, ট্রেনের টিকিট পাওয়া যায় না। আবার দাবি করা হয়, রেলসেবা লাভজনক নয়। দেশের সাধারণ জনগণ চায়, মেট্রোরেল যেন গুণগত সেবা দিয়েই যাত্রীদের মন জয় করে। বাংলাদেশ রেলওয়ের মতো মেট্রোরেল যেন অলাভজনক না হয়।

মেট্রোরেলে ঢাকাবাসীর বিশেষত উত্তরা ও মিরপুরবাসী উপকৃত হবেনÑএমন প্রত্যাশা নিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া মিথুন বলেন, ‘বাবার কর্মসূত্রে আমি উন্নত বিভিন্ন দেশে গিয়েছি। সেখানে গণপরিবহণ সেবা উন্নত মানের। আমার বিশ্বাস, নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলে এমন সেবা দেশেও পাওয়া যাবে। একজন ছাত্র হিসাবে আমার দাবি, যদি সম্ভব হয় শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ কার্ড চালু করা হোক।’

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের প্রফেসর ড. শামসুল হক বলেন, মেট্রোরেল পুরো অংশ চালু হলে নগরবাসী বেশি সুবিধা পেত। এখন যেহেতু আংশিক চালু হচ্ছে, সেক্ষেত্রে নগরীর কিছু এলাকার মানুষ এর সুবিধা পাবেন। একটি নগরীর জনগোষ্ঠীর খণ্ডিত একটি অংশ এই সুবিধা ভোগ করবে। রাজধানীর মিরপুর হলো বসবাসের এলাকা আর মতিঝিল হলো অফিসপাড়া, এক্ষেত্রে মেট্রোরেলের পুরো অংশ চালু না হওয়ায় আগারগাঁও এলাকায় আবারও লোকজনের জটলা লেগে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। 

এদিকে উত্তরা ও আগারগাঁওয়ের মধ্যে মেট্রোরেল চালু হওয়ার দিন থেকে যাত্রীদের জন্য একটি শাটল বাস সার্ভিস চালু করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ করপোরেশন (বিআরটিসি)। ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএন সিদ্দিক বলেন, বিআরটিসিকে মেট্রোরেল রুটের উভয়প্রান্তে শাটল সার্ভিসের জন্য কমপক্ষে ৪০টি বাস পরিচালনা করতে বলবে ডিএমটিসিএল। তিনি আরও বলেন, ‘২০২৩ সালের ডিসেম্বরে উত্তরা থেকে আগারগাঁও হয়ে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল পরিষেবা সম্পূর্ণরূপে চালু না হওয়া পর্যন্ত বাস পরিষেবা চলবে।’

বিআরটিসি সূত্র জানায়, শাটল সার্ভিসের জন্য বছরের শেষ নাগাদ ৪০-৫০টি নতুন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস চালু হবে। বাসগুলো আগারগাঁও থেকে ফার্মগেট হয়ে মতিঝিলসহ বিভিন্ন রুটে চলবে। শাটল সার্ভিসটি উত্তরা নর্থ স্টেশন থেকে উত্তরার জসীমউদ্দীন এলাকা হয়ে ঢাকা বিমানবন্দরে যাত্রী নিয়ে যাবে।

ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএন সিদ্দিক বলেন, শীঘ্রই ইন্টিগ্রেটেড টেস্ট রান হবে। মাসজুড়ে এই পরীক্ষা চালানো হবে। এরপর শুরু হবে বাণিজ্যিক যাত্রা।’ স্টেশনগুলোর নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘স্টেশনের এবং প্রয়োজনীয় স্থাপনার নিরাপত্তায় নিয়োগ দেওয়া হবে বিশেষ ও স্বতন্ত্র পুলিশবাহিনী, যা বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। নতুন এই সেবা লোডশেডিংয়ের আওতামুক্ত থাকবে বলে জানান।

জুনে চালু হয়েছে স্বপ্নের পদ্মা সেতু। এর সুফল ইতোমধ্যেই পেতে শুরু করেছেন দেশবাসী। পদ্মা সেতুর পর এবার পালা মেট্রোরেলের। মেট্রোরেল চালু হলে যানজটে নাকাল হওয়া শহরবাসীর জীবন অনেকটাই সহজ হবে। বাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা কিংবা ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর চাপ কমবে। ফলে গণপরিবহণে ডিজেলের ব্যবহার কমবে, কমবে কার্বন নিঃসরণ। সেই আশায় বুঁদ হয়ে আছেন এখন ঢাকাবাসী। 

মো. হাবিবুল আলম, ফ্রীল্যান্স সাংবাদিক

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়