শিরোনাম

প্রকাশিত : ২৪ জুন, ২০২২, ০১:৪৬ রাত
আপডেট : ২৪ জুন, ২০২২, ০১:৪৬ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

টাকা একটা ‘মুলা’!

মুম রহমান

মুম রহমান: পুঁজিবাদী সভ্যতার সবচেয়ে বড় শয়তানী হলো, আমাদের নাকের সামনে এই মূলা ঝুলিয়ে দেওয়া। আমরা এগোচ্ছি, সামনে টুকটুকে লাল অথবা ধবধবে সাদা মুলা।  টাকা, রূপি, ডলার, পাউন্ড, দিনারÑ কতো মনোহর মুলার পেছনে ঘুরে আমাদের জীবন যায়। অনেকেই টাকার পেছনে ছোটাকে যৌক্তিকতা দান করেন, ভবিষ্যত প্রজন্মের দোহাই দিয়ে। ছেলে-মেয়ে আছে, কাজেই তাদের নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য টাকা বা সম্পত্তি রেখে যেতে হবে। ছেলেমেয়ে যদি মানুষ হয় তাহলে তাদের জন্য ব্যাংকে অনেক অনেক টাকা জমিয়ে রাখতে হবে কেন? আর অমানুষ সন্তানের জন্য নিজের জীবন নষ্ট করে টাকা কামাই করতেই হবে কেন?

টাকা এক আশ্চর্য গন্ধম ফল। সরলতা, সৌন্দর্য, বিচারবোধ হারিয়ে ফেলি এই টাকা কামানোর ধান্দায়। চিকিৎসা করতে টাকা লাগবে, অতএব টাকা কামাতে কামাতে অসুস্থ হয়ে যাই আমরা। শিক্ষা অর্জন করতে টাকা লাগব, অতএব টাকা কামানোর কুশিক্ষা অর্জন করি আমরা। বিদেশ ঘুরতে টাকা লাগবে, অতএব ঘর-বাহির একাকার করে ফেলি টাকা কামানোর ঘামে।

আদতে কি এমন ঘটেছে যে, বিদেশ গেলেই সুখ পাওয়া যায়? নিজের এলাকার সবগুলো গলি ঘুরেছি আমরা? আমরা কি জানি, এই বাংলাদেশে কোথায় অনেক শিমুল ফোঁটে, কোথায় অনেক শাপলা? আমরা কি জানি, নিজের এলাকায় কোন বাড়িতে হাসনাহেনা ফোঁটে, কামিনী গন্ধ ছড়ায়? কোন গাছে টুনটুনি বামা বাঁধে? না। টাকা কামাচ্ছি। পরে না হয় ফুল, পাখি দেখবো। ছাগল-ভেড়া দেখে কী লাভ? অস্ট্রেলিয়া গিয়ে ক্যাঙ্গারু দেখবো। বেশ, দেশ নয়, বিদেশেই সুখ। 

আর রোগ-অসুখ? টাকা থাকলেই সুস্থতা নিশ্চিত হয়? ব্যাংকের হাসপাতালে মানুষ মরে না? আমেরিকার চিকিৎসায় মানুষ অমর? টাকাঅলা লোকের হাত-পা কাটলে ব্যথা কম হয়, রক্ত কম ঝরে? অতুল টাকা, অত্যাধুনিক চিকিৎসাও পারেনি মানুষের সুস্থতার নিশ্চয়তা দিতে। এই করোনাকালে বহু টাকাঅলা লোক যথাযথ চিকিৎসা না পেয়ে মরে গেছে, মরে গিয়েও একটা যথাযথ শেষ কৃত্য পায়নি।

আর নিজের ঘর থাকলেই কি নিরাপদ থাকা যায়? নিজের ঘরে, এমনকি ঘর ভর্তি টাকা নিয়েও মানুষ বিমর্ষ থাকে, থাকেই।  নিজের বানানো এতোগুলা বাড়ি রেখেও কবর কিংবা চিতায় যেতে হয় মানুষকে। কিন্তু টাকার কথা মানুষ ভোলে না। কারণ ভুলতে দেয়া হয় না।

তুমি আমার কাছে আসো, বসো, আমি তোমায় গান শোনাবো, তুমি আসবে না। তুমি আমি চলো ছাদে গিয়ে চাঁদ দেখি, চলো বারান্দায বসে চা পান করি। নিজের বারান্দা-ছাদ না-থাকলে চলো পথে নামি, হাঁটি। আসবে বন্ধু? না, সময় নেই। টাকা কামাতে ব্যস্ত আছি। ভুলে আছি বাকী সব। একটা মন্ত্র, ওঁ টাকায়ে নম, নম, নম, নম। 

শয়তানের চেহারা কেমন? আমি বলি, টাকার মতো। শয়তান টাকার মতোই চকচকা, বহুরঙা। শয়তান আবিস্কার করেছে, পূঁজিবাদী সভ্যতা, যে সভ্যতায় মানুষকে মাপা হয় টাকা দিয়ে। তোমার মন কতো বড়, তা কি দিয়ে মাপবো? বিজ্ঞান তেমন যন্ত্র আবিষ্কারই করেনি। তোমার জ্ঞান, মেধা কতো গভীর তা কি দিয়ে মাপবো? ক্রিস্টালের ফুল,  প্লাস্টিকের ফুল নিয়েই ব্যস্ত আমরা। আসল ফুল আমরা চিনি না। একদিন একজনকে বলেছিলাম, "মেহেদি ফুল দেখেছো? মিষ্টি আলুর ফুল দেখেছো? ধুরু, মেন্দি গাছের আবার ফুল হয়! মিষ্টি আলু তো খায় জানি, ফুল হয় কই? মাটির নিচে না উপরে?" আমার বারান্দায় ফোঁটে মিষ্টি আলু আর মেহেদি ফুল, দেখবে? টাইম নাই। বিজি। কি নিয়ে? টাকা কামাই নিয়ে। ঠিকাছে কামাও। এদিকে জগতের কতো শিল্পীরা টাকার দাপটের কাছে নাজেহাল হলো। আহা, পূঁজিবাদী সভ্যতা ভ্যান গঁগ, রেঁবোকে চেনেনি। পথে ফোটা বুনোফুল কতো সুন্দর তা কি দিয়ে মাপবো? এ সব তো মাপা যায় না।

তবে তোমার জন্য একটা বড় গিফট কিনেছি, তোমার জন্য বই কিনেছি, তোমার জন্য ফুল কিনেছি। দামী বই মানেই ভালো বই না। কেনা ফুল মানেই অনেক সুঘ্রান না। অনেক বড় উপহার মানেই মুগ্ধতা না। অথচ, হে মাবুদ, কেনাবেচার হাটে টাকাই বড় নিয়ামক! তোমার জমিন, পাহাড়, নদী, এমনকি আসমানরেও ওরা টাকার জোরে কেনে, বেচে! কেনাবেচার হাটে বেঁচে থাকার সুখ নেই, অসুখ অনেক। 

তোমার অনেক টাকা, তুমি লাখপতি, কোটিপতি, তুমি বিলিওনিয়ার। তোমাকে মাপা যায়। তোমাকে ধনী বলি, বড়লোক বলি। ও বড়লোক, ও ধনী লোক, তুমি ভালো আছো তো? তোমার ঘুম কেমন হলো? দুঃশ্চিন্তা করো না, তোমার টাকা আছে। তুমি ছুটতে থাকো।

হা,মূলা ঝুলালে গাধার অভাব হয় না। আলহামদুলিল্লাহ,  জগতে অন্নেক শাক-সবজি আছে। আমার মূলা না খেলেও চলে।
লেখক: কবি ও কথাসাহিত্যিক

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়