শিরোনাম

প্রকাশিত : ২৩ জুন, ২০২২, ০৭:১৩ বিকাল
আপডেট : ২৩ জুন, ২০২২, ০৭:৩৩ বিকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

একটি আবেগের নাম পদ্মা সেতু

রিয়াজুল হক

রিয়াজুল হক: ২০১০ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ বৃহস্পতিবার। মতিঝিল থেকে রিক্সায় করে সায়েদাবাদ আসলাম। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। টিকিট কেটে বাসে বসলাম। উদ্দেশ্য খুলনা যাব। যাই হোক, দুপুর আড়াইটার দিকে বাস ছাড়ল। বিকাল চারটার দিকে বাস মাওয়াঘাটে পৌঁছাল। ঘাটে এসে দেখি, বৃষ্টির মাত্রা কিছুটা বেশি। 

প্রচন্ড ঢেউয়ের কারণে স্পিডবোট, লঞ্চ সবকিছু বন্ধ হয়ে গেছে। নদী পার হওয়ার অনেকক্ষণ যাত্রীরা অপেক্ষা করছে। ঘাটে বাসের সংখ্যাও আস্তে আস্তে বাড়তে লাগলো।

এরকম পরিস্থিতিতে কয়েকটা বাসের সুপারভাইজার মিলে একটা লঞ্চ ঠিক করল। ৬/৭ টি গাড়ির যাত্রীরা সবাই সেই লঞ্চে উঠলো। সেই সময়, স্বাভাবিক অবস্থায় একটি লঞ্চে একটি গাড়ির যাত্রীরা উঠত।

অনেকেই বলতে পারেন, নদীর অবস্থা খারাপ। এরকম পরিস্থিতিতে নদী পার হবার দরকার কি? বাড়ির জন্য রওয়ানা করার পরে যাত্রাপথে যত সমস্যাই আসুক, কেউই আর পিছনে ফিরে যেতে চায় না বা পারে না। এটা আমাদের মানুষের ধর্ম। ঈদের সময় মানুষ জানে রাস্তায় জ্যাম হবে, টিকিট পেতে গেলে সারারাত স্টেশনের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে, তারপরও কিন্তু মানুষ সব কষ্ট সহ্য করে। আসলে পরিস্থিতিতে না পড়লে দূর থেকে এই অমূল্য আবেগগুলো কখনো বোঝা যায় না। 

যাই হোক, প্রবল ঢেউয়ের মধ্যেই আমাদের লঞ্চটি ছাড়লো। ঢেউয়ের উচ্চতা লঞ্চের উচ্চতাকেও যেন ছাড়িয়ে যেতে চাইছিল। লঞ্চটি ছেড়ে পঞ্চাশ মিটারও যেতে পারেনি,  লঞ্চের একপাশ থেকে পানি ঢুকে আরেকপাশ থেকে বের হচ্ছে।

মানুষজন কান্নাকাটি শুরু করে দিল। প্রায় সবাই দোয়া ইউনুস পড়া শুরু করল। লঞ্চটি এমনভাবে দুলছিল, মনে হচ্ছিল যে কোন মুহূর্তে পানির মধ্যে সবকিছু বিলীন হয়ে যাবে। এমনই ভয়ংকর অবস্থার মধ্য দিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা পর কাওড়াকান্দি ঘাটে এসে পৌছালাম। বেশ কয়েকবার এরকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি। যত সহজে ঘটনাটি ব্যাখ্যা করলাম, এত সহজ কিন্তু সেই অভিজ্ঞতাগুলো থাকে না।

এরকম অনেক হয়েছে। লঞ্চে পদ্মা পার হচ্ছি। হঠাৎ করে প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এত বেশি বিদ্যুৎ চমকাতো, মনে হতো নদীর মধ্যেই যেন বজ্রপাত পড়ছে। জীবনটা একদম গলার কাছে আটকে যেত। এমন পরিস্থিতিতে যদি কেউ পদ্মা নদী পার হয়ে থাকে, তাহলে সে বুঝতে পারবে, কি বিভীষিকাময় অবস্থা চোখের সামনে বিরাজ করে।

অনেক রাত গেছে যখন বাস রাত এগারোটার সময় কাওড়াকান্দি ঘাটে এসেছে, পদ্মা পার হবো। কিন্তু ফেরি নাই। ভোর পাঁচটা/ছয়টার সময় ফেরিতে উঠতে হয়েছে। সারারাত বাসের মধ্যে বসে থাকতে হয়েছে। অথচ নদীটি পার হতে পারলে, আর মাত্র ৪০/৫০ মিনিটের রাস্তা বাকি। এই দুর্বিসহ কষ্টের যারা মুখোমুখি হননি, তারা কখনোই বুঝতে পারবেন না, ১৫ মিনিটে পদ্মা নদী পার হতে পারলে কত সুবিধা হত।

খারাপ আবহাওয়ার কারণে ফেরি বন্ধ হয়ে গেছে। ঘন্টার পর ঘন্টা কাওড়াকান্দি ঘাটে অ্যাম্বুলেন্স অপেক্ষা করেছে।‌ দশ/বারো ঘন্টায় নদী পার হতে না পেরে, অসুস্থ মানুষটি যখন বিনা চিকিৎসায় মারা যায়, মৃত মানুষটির স্বজনরা জানে পদ্মা নদী তাদের কাছে কতটা কষ্টের কারণ।

কিছু মানুষকে বলতে শুনি, একটা সেতু নিয়ে এত আলোচনা কেন? দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার মানুষ যাদের নিয়মিত পদ্মা নদী পার হতে হয়, তাদের জন্য পদ্মা সেতু শুধুমাত্র একটি সেতু নয়, এটি তাদের দুর্বিসহ যন্ত্রনা লাঘবের নাম, তাদের চিকিৎসা সেবার নিশ্চয়তার নাম, তাদের জন্য একটি আবেগের নাম। আর ব্যবসায়িক পরিমণ্ডল বৃদ্ধির জন্য পদ্মা সেতু একটি মাইলফলক ছোঁয়ার নাম, একটি নতুন অধ্যায়ের শুরুর নাম।

লেখক: রিয়াজুল হক, যুগ্ম পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়