শিরোনাম

প্রকাশিত : ২৩ জুন, ২০২২, ০১:২৫ রাত
আপডেট : ২৩ জুন, ২০২২, ০১:২৫ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

আওয়ামী লীগ, জনপ্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

ফরিদুন্নাহার লাইলী

ফরিদুন্নাহার লাইলী: ঐতিহাসিক একটি সময়ে জন্ম আওয়ামী লীগের। ৭৩ বছর আগে জমিদার ও ধনিক শ্রেণির স্বার্থের বিপরীতে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে পথ চলা শুরু দলটির। আজও সে পথেই হেঁটে যাচ্ছে। সেই পথ দীর্ঘলড়াই-সংগ্রাম-আন্দোলন ও ত্যাগের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই নৌকা প্রতীকের এ দলটির প্রতি সর্বস্তরের জনগণের ব্যাপক সমর্থন ছিলো এবং আছে।

আওয়ামী লীগও জনগণের অধিকারের প্রতি আপোসহীনভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ থেকেছে। সেই ধারাবাহিকতা আজও বহমান। সঠিক পথে থেকেছে বলেই ইতিহাসের নানা বাঁকে অসাধারণ সব সাফল্য এসেছে আওয়ামী লীগের হাত ধরে। বাঙালির পরম কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা এসেছে আওয়ামী লীগ ও এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবের নেতৃত্বে। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আজকের দিনে আওয়ামী লীগ যখন প্রতিষ্ঠিত হয় তার দু’বছর আগে ১৯৪৭ সালে জন্ম হয় পাকিস্তান রাষ্ট্রের। তবে যে আশা-আকাক্সক্ষা নিয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে বাঙালিরা অংশ নিয়েছিল, ত্যাগ স্বীকার করেছিল নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর তাদের সে স্বপ্ন ভেঙে যায়। বাঙালির ওপর নেমে আসে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ বৈষম্য, নিপীড়ন। রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে বাংলাকে অগ্রাহ্য করার মধ্য দিয়ে শাসকগোষ্ঠীর চরিত্র উন্মোচিত হয়। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের পূর্ববাংলা বিদ্বেষী কর্মকাণ্ড, বাংলা ভাষা-সংস্কৃতির ওপর আক্রমণ, দেশ পরিচালনায় মুুসলিম লীগের ব্যর্থতা, রাজনৈতিক দমননীতি, সাধারণ জনজীবনের বিপর্যয়সহ নানা ঘটনা দারুণভাবে হতাশ করে। তৎকালীন সময়ের এসব অবস্থার প্রেক্ষাপটে নতুন এ রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ। সময়ের পরিক্রমায় আওয়ামী লীগ আজ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন ও বড় দল। টানা ১৪ বছর এবং সবচাইতে দীর্ঘসময় ধরে রাষ্ট্রক্ষমতায় রয়েছে জনগণের সমর্থনে। 

সাম্প্রতিক করোনা মহামারি ও বৈশ্বিক নানা সংকটের মধ্যেও বাংলাদেশে একের পর এক অভাবনীয় উন্নয়ন ঘটে চলেছে। আওয়ামী লীগ শাসনামলে যার নেতৃত্বে রয়েছেন বাঙালির আস্থা ও ভালোবাসার প্রতীক বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। পদ্ম্না সেতু, মেট্রোরেল, যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন, ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণ, ভূমিহীনদের আশ্রয়ণ প্রকল্প ইত্যাদি হাজারও উন্নয়নে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। শুরু থেকে দীর্ঘ এ সময়ে সমান্তরালভাবে জনপ্রত্যাশা পূরণে আওয়ামী লীগ বরাবরই আস্থার প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রমাণ দিয়ে এসেছে। পূর্ব বাংলার সাধারণ মানুষের সমস্যাগুলোকে সামনে রেখে একের পর এক কর্মসূচি প্রণয়নের মধ্য দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে আওয়ামী লীগ। যেমন জমিদারি প্রথার বিলোপ, বড় বড় শিল্প-কারখানার জাতীয়করণ, বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, পাটের ব্যবহার নিশ্চিত এবং ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ, চিকিৎসা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ইত্যাদি কর্মসূচি ছিল সাধারণ জনগণের দাবি। 

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা এবং প্রাদেশিক স্বায়ত্ত্বশাসনের জন্য ৪২-দফা এজেন্ডা গ্রহণ করে আওয়ামী লীগ। পাকিস্তান শাসনামলের প্রাথমিক পর্যায়ে আওয়ামী লীগের প্রধান দাবির অন্যতম ছিল বাংলাকে দেশের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা, এক ব্যক্তির এক ভোট, গণতন্ত্র সংবিধান প্রণয়ন, সংসদীয় পদ্ধাতির সরকার, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও তৎকালীন পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য দূরকরণ। রাষ্ট্রভাষার বাংলার দাবিতে আন্দোলনে জেল খেটেছেন আওয়ামী লীগের প্রাণপুরুষ শেখ মুজিব। রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ পূর্ব বাংলায় ১৯৫০ দশকে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও পূর্ববাংলার ন্যায্য অধিকার নিয়ে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে দারুণভাবে সফল হয়। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময় পূর্ব পাকিস্তানে নির্বাচনকালীন যুক্তফ্রন্ট গঠনে আওয়ামী মুসলিম লীগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যুক্তফ্রন্ট ২১-দফা এজেন্ডা প্রচারের মাধ্যমে নির্বাচনে জনগণকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে। এই ২১ দফার দুটি প্রধান দফা ছিল রাষ্ট্রভাষা ইস্যু এবং পূর্ব বাংলার স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবি। ৬০-এর দশকে নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করলেন-জাতীয় মুক্তি অর্জন ছাড়া বাঙালির পরিত্রাণের কোনো উপায় নাই। ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু ছয় দফা ঘোষণা করলেন। ছয় দফা ছিল পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার দাবি। এই ছয় দফার মধ্যে অন্যতম ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক মুদ্রা, একটি স্বতন্ত্র বাণিজ্যনীতি এবং পূর্ব পাকিস্তানে আধা সামরিক বা আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠন। আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে এই যে ছয় দফা দাবি তুলে ধরা হয় প্রকৃতপক্ষে সেটিই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের প্রথম পদক্ষেপ। 

এরপর ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের আপসহীন সংগ্রামী ভূমিকা দলটিকে এই অঞ্চলের একক বড় রাজনৈতিক দলে পরিণত করে। আর শেখ মুজিবর রহমান পরিণত হন দলের অবিসংবাদিত নেতায়। 

যার ফলশ্রুতিতে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয় এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন। স্বাধীনতার পর ধ্বংস্তূপ থেকে দেশকে পুনর্গঠনের কাজও শুরু হয় আওয়ামী লীগের হাত ধরেই যার নেতৃত্বে ছিলেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মাত্র ৯ মাসের মধ্যে একটি সংবিধান উপহার দিয়ে তিনি অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও শোষণমুক্ত-উন্নত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ভিত্তিভূমি নির্মাণ করে দিয়েছেন। এভাবে তিনি যখন বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন ঠিক তখন বাংলাদেশ ও আওয়ামী লীগের উপর সবচেয়ে বড আঘাতটি আসে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্য বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করে। থমকে যায় দেশের অগ্রগতি। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর কারাগারের ভেতরে চার জাতীয় নেতাকে হত্যার পর সামরিক শাসনের নির্যাতন আর নিপীড়নের মধ্যে পড়ে এতিহ্যবাহী এই দলটি। বিরাট ছন্দপতন নেমে আসে বাংলাদেশ ও আওয়ামী লীগে। 

১৯৮১ সালে জাতির পিতা শেখ মুজিবর রহমানের বেঁচে যাওয়া দুই মেয়ে দেশে ফেরেন। আস্থা ও ঐক্যের প্রতীক শেখ হাসিনা নেতৃত্ব গ্রহণ করার পর আওয়ামী লীগের এই ছন্দপতন দূর হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশে যে স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলন শুরু হয় তার অন্যতম শরীক হয় আওয়ামী লীগ। যুগপৎ আন্দোলনে স্বৈরশাসকের পতন হয়। নানা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই শেখ হাসিনা দলের নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে দেশের অগ্রগতি ত্বরান্বিত হতে থাকে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে পুনরায় সরকার গঠন করে। ২০১৪ সালে দশম এবং ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতাসীন হয় জনগণের ভোটের মাধ্যমে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পরপর তিন মেয়াদে বিশাল বিজয় অর্জন করে আওয়ামী লীগ। ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন দেশের উন্নয়নে। তাঁর নিরলস পরিশ্রমের কারণে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ গড়ার লক্ষ্য অর্জনের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে বাংলাদেশ। আর জনগণের প্রত্যাশা পূরণে আওয়ামী লীগকে শক্তহাতে দক্ষভাবে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন, বঙ্গবন্ধুকন্যা, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
লেখক: কৃষি ও সমবায় সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।  

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়