শিরোনাম

প্রকাশিত : ২৩ জুন, ২০২২, ০১:২২ রাত
আপডেট : ২৩ জুন, ২০২২, ০১:২২ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ইচ্ছাপূরণ গাছ বা কল্পবৃক্ষ

ড. এমদাদুল হক

ড. এমদাদুল হক: মানুষ এবং দেবতাদের আন্তঃসম্পর্কের পাশাপাশি, উপনিষদগুলি শান্তি লাভের উপায় হিসেবে গাছের সঙ্গে বসবাসের নির্দেশনা দেয়। শাস্ত্রাদিতে যেসব ঋষিদের গল্প রয়েছে তারা গাছের সঙ্গে বাস করতেন। পদ্ম পুরাণে বলা হয়েছে: ‘যারা বৃক্ষ রোপণ করে তারাই স্বর্গে সর্বোচ্চ পদ লাভ করবে’। ‘গাছ লাগালে মানুষ কখনো স্বর্গচ্যুত হয় না’। ‘পৃথিবীতে বিষ্ণুর যত রূপ আছে তার মধ্যে বৃক্ষের মতো স্পষ্ট রূপ আর নেই’। ঈশ্বর জ্ঞানে বৃক্ষের পূজাই সর্ব শ্রেষ্ঠ। শাস্ত্রে পূজার জন্য পাঁচটি গাছকে বিশেষভাবে পবিত্র বলা হয়েছে: অশ্বত্থ (পিপল), বট, বেল, আমলকী/হরতকী, নিম। এদেরকে ‘পঞ্চবতী’ বলা হয়। শাস্ত্রাদিতে সমুদ্র মন্থনের ঘটনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিষ্ণু পুরাণ, শিব পুরাণ, মহাভারত প্রভৃতিতে সমুদ্র মন্থনের ঘটনা উল্লেখিত হয়েছে। মহর্ষি দুর্বাসার অভিশাপে দেবতারা শ্রী হীন হয়ে পড়েছিলেন। মহাদেব বললেন, ‘দেবতাদের শ্রী ফিরে পাওয়ার একমাত্র উপায় সমুদ্র মন্থন’। মন্থনের ফলে ক্ষীর সাগর থেকে ভেসে উঠেছিল ইচ্ছাপূরণকারী কল্পবৃক্ষ। দেবরাজ ইন্দ্র এই কল্পবৃক্ষ স্বর্গীয় উদ্যানের মাঝখানে মেরু পর্বতের শীর্ষে রোপণ করেছিলেন। 

এই ইচ্ছাপূরণ গাছ অধিকরণের জন্য অসুররা দেবতাদের সাথে বহু যুদ্ধ করেছে, কারণ দেবতারা কল্পবৃক্ষের ফুল ও ফল থেকে শক্তিপ্রাপ্ত হতো। স্বয়ং পার্বতী কল্পবৃক্ষের কাছে তার কন্যার সুরক্ষা, প্রজ্ঞা, স্বাস্থ্য এবং সুখ চেয়েছিলেন এবং তাকে বনের সুরক্ষাকারী বনদেবী করতে ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। জৈন ধর্মতত্ত্ব অনুযায়ী ১০টি কল্পবৃক্ষ ১০ রকম ইচ্ছা পূরণ করে। মধ্যাঙ্গ গাছ থেকে পুষ্টিকর পানীয়, ভোজনাঙ্গ গাছ থেকে সুস্বাদু খাবার, জ্যোতিরাঙ্গ গাছ থেকে সূর্য ও চাঁদের চেয়ে বেশি উজ্জ্বল আলো, দোপাঙ্গ গাছ থেকে গৃহে আলো পাওয়া যায়। অন্যান্য গাছ থেকে ঘর, বাদ্যযন্ত্র, খাবার থালাবাসন, সূক্ষ্ম পোশাক, পুষ্পস্তবক ও সুবাস পাওয়া যায়। মিয়ানমারে থেরবাদ বৌদ্ধধর্ম চর্চায় কল্পবৃক্ষের সম্মানে বার্ষিক অনুষ্ঠান হয়। এর নাম কাঠিনা। কাঠিনা অনুষ্ঠানে সাধারণ মানুষ সন্ন্যাসীদের গাছের আকারে অর্থ উপহার দেয়। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন গাছকে কল্পবৃক্ষ বলা হয়। অশ্বত্থ গাছ কল্পবৃক্ষ নামেও পরিচিত। কথিত আছে, অশ্বত্থ গাছে দেবতা ও ব্রহ্মার বাস এবং অশ্বত্থ গাছের নিচেই মহর্ষি নারদ গাছের পূজা করার পদ্ধতি এবং এর উপযোগিতা সম্পর্কে ঋষিদের শিক্ষা দিয়েছিলেন। মহুয়া গাছ যেসব উপজাতির দৈনন্দিন জীবনে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে তাদের কাছে মহুয়া গাছই কল্পবৃক্ষ। শামি গাছের শিকড় ৮২ ফুট গভীরতা পর্যন্ত যায়। তাই এটি মাটির ক্ষয় রোধ করে এবং খরার পরিস্থিতিতেও সবুজ থাকে। খরার সময় যখন কোথাও ঘাস পাওয়া যায় না তখন গবাদিপশুরা শামি গাছের সবুজ পাতা খেয়ে বেঁচে থাকে। রাজস্থানের লোকেরা এই গাছটিকে কল্পবৃক্ষ হিসেবে সম্মান করে। 

হিমালয়ের ৫০০ থেকে ১০০০ মিটার উচ্চতায় বেড়ে উঠা চিউর গাছ পার্বত্য অঞ্চলের লোকদের কাছে কল্পবৃক্ষ বা স্বর্গের গাছ নামে পরিচিত। এটি তাদেরকে মধু, গুড় এবং ঘি দান করে। উত্তরাখণ্ডের যোশীমঠে একটি তুঁত গাছ কল্পবৃক্ষ হিসাবে বিখ্যাত এবং সম্মানিত। গাছটির বয়স ২৪০০ বছর। জগৎগুরু আদি শঙ্করাচার্য এটিকে শিবের অবতার মনে করতেন। কথিত আছে ঋষি দুর্বাসা এই গাছের নিচে ধ্যান করেছিলেন। আজমিরে দুটি পূজিত কল্পবৃক্ষ রয়েছে যা ৮০০ বছরেরও বেশি পুরানো। শ্রাবণ মাসের অমাবস্যার দিনে এদের পূজা করা হয়। ঝাড়খণ্ডের রাঁচিতে তিনটি কল্পবৃক্ষ রয়েছে। তামিলনাড়ুর সংস্কৃতিতে এক ধরনের তাল গাছ কল্পবৃক্ষ হিসাবে পরিচিত। এই গাছটির পাতা প্রাচীনকালে লেখার জন্য ব্যবহৃত হতো। হরিবংশ পুরাণে পারিজাত গাছকে কল্পবৃক্ষ বা ইচ্ছাপূরণ গাছ বলা হয়। 

এটি উত্তরপ্রদেশের কিন্তুর গ্রাম ছাড়া আর কোথাও দেখা যায় না। বলা হয় পাণ্ডপুত্র অর্জুন এটি স্বর্গ থেকে এনেছিলেন। তার মা কুন্তীর নামানুসারে গ্রামের নামকরণ করা হয়েছে ‘কিন্তুর’। এই গাছের ফুল দিয়ে কুন্তি শিবের উপাসনা করতেন। ভিন্নমতে ভগবান শ্রী কৃষ্ণ তার স্ত্রী সত্যভামাকে সন্তুষ্ট করতে পারিজাত গাছ স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে নিয়ে এসেছিলেন। আমাদের দেশে শেফালী বা শিউলী গাছকে অনেকে পারিজাত গাছ মনে করে যদিও কোথাও শিউলী গাছকে কল্পবৃক্ষের সম্মান দিতে দেখা যায় না। বাংলাদেশের আনাচে কানাচে রয়েছে বহু ইচ্ছাপূরণ গাছ বা কল্পবৃক্ষ। বিশ্বাসী মানুষ আশার লাল সুতা বেঁধে দেয় গাছের সঙ্গে। চট্রগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামির মাজারের গাছগুলোতে এত সুতা বাঁধা রয়েছে যে পুরো গাছ লাল হয়ে গেছে। ফেসবুক থেকে

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়