শিরোনাম

প্রকাশিত : ২৩ জুন, ২০২২, ০১:১৭ রাত
আপডেট : ২৩ জুন, ২০২২, ০১:১৭ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

সিলেট-সুনামগঞ্জের বন্যা: গুজবের রেকর্ড ভেঙেছে

রহমান বর্ণিল

রহমান বর্ণিল: এক ছাত্র কেবলমাত্র কুমিরের রচনাই শিখেছে। তাই ক্লাসে বাংলার শিক্ষক তাকে যে রচনাই লিখতে দেয়, সে ঘুরেফিরে কুমিরের রচনাতেই চলে আসে। যেমন তাকে বলা হলো গরুর রচনা লিখতে। সে লিখলো, ‘আমাদের একটি গরু আছে। আমাদের গরুটি একদিন নদীর ধারে ঘাস খাচ্ছিল। হঠাৎ নদী থেকে একটা কুমির উঠে গরুটিকে আক্রমণ করলো। কুমির অত্যন্ত হিংস্র প্রাণী। তার সারা শরীরে খাঁজকাটা খাঁজকাটা দাগ...’! শিক্ষক এবার অনেক ভেবেচিন্তে একটা বুদ্ধি করে ছাত্রটিকে পলাশী যুদ্ধের ওপর রচনা লিখতে বললেন। মনে মনে ভাবলো, দেখি এবার তুমি কীভাবে পলাশী যুদ্ধে কুমির ঢুকাও। ছাত্র লিখলো, ‘নবাব সিরাজুদ্দৌলা ছিলেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব। কিন্তু সিরাজুদ্দৌলা মীরজাফরকে সেনাপতি বানিয়ে খাল কেটে কুমির এনেছিলেন। কুমির অত্যন্ত হিংস্র প্রাণী। তার সারা শরীরে খাঁজকাটা খাঁজকাটা দাগ...’!

বাংলাদেশের মানুষের অবস্থা হচ্ছে এই কুমিরের রচনা শেখা ছাত্রটির মতো। দেশে যেই সংকটই দেখা দিক, এরা সবকিছুতে ভারতের দোষ দেখে। দেশে মন্দা চলছে, ভারতের কারণে। দেশে গুম-খুন হচ্ছে, ভারতের কারণে। দেশে খড়া হচ্ছে, ভারতের কারণে। দেশে বন্যা হচ্ছে, ভারতের কারণে। অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রাকৃতিক-অপ্রাকৃতিক যেকোনো দুর্যোগের জন্য এদের অভিযোগের কেবলা একটাই। ভারত। 

অনেক দায়িত্বশীল মানুষকেও দেখেছি, সিলেট বিভাগের এই ভয়াবহ বন্যার জন্য ভারতকে দায়ি করছে। ভারত নাকি ফারাক্কা, টিপাইমুখ, তিস্তা ব্যারেজের সবগুলো বাঁধ খুলে দিয়েছে। সেই বাঁধখোলা পানি ডুবিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশের সিলেট-সুনামগঞ্জ অঞ্চল। এটা অনেকেই জানেন যে, ফারাক্কা সিলেটে নয়, রাজশাহী সিমান্তে। সিলেট থেকে যার দূরত্ব ছয়শত কিলোমিটার। বন্যার জন্য ভারত দায়ি না হওয়ার সিলেট থেকে ফারাক্কার দূরত্বই একমাত্র কারণ নয়, সত্য হচ্ছে ভারত সাম্প্রতিক কোনো বাঁধই খোলেনি। সিলেট-সুনামগঞ্জে চলমান বন্যার সাথে ভারতের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এবার বন্যার জন্য একমাত্র দায় স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত। আসামের চেরাপুঞ্জিতে বিগত একশত বাইশ বছরের রেকর্ড ভেঙেছে বৃষ্টি। একইভাবে সমগ্র আসাম, মেঘালয়, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার অঞ্চলেও বিগত প্রায় অর্ধশত বৎসরের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আপনাকে জিওগ্রাফি বুঝতে হবে, ওয়াটার ম্যনেজমেন্ট বুঝতে হবে। ভৌগোলিকভাবে এই আসাম, মেঘালয়, সিলেট, সুনামগঞ্জ একই অঞ্চলে অবস্থিত। সিলেট-সুনামগঞ্জ অপেক্ষাকৃত নিচুভুমি হওয়ায় আসাম-মেঘালয়ের পানি প্রাকৃতিকভাবে আমাদের দিকেই গড়াবে।

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে আবহাওয়া-জলবায়ু বা বৃষ্টির ধরন বদলে গেছে। এবারই শেষ নয়, এখন বৃষ্টি হলেই সেটা অতিবৃষ্টিতে রুপ নেয়ার সম্ভাবনা আছে। সুতরাং বন্যার এমন প্রলয়ঙ্কারী রুপ এখন থেকে আমাদের নিয়মিত দেখতে হতে পারে। কারণ প্রকৃতির ওপর আমরা সীমাহীন অবিচার করেছি। তাই প্রকৃতি রুষ্ট হয়ে উঠেছে। যে জলাধারগুলো বৃষ্টি এবং জলোচ্ছ্বাসের জল ধরে রাখতো, অপরিকল্পিত উন্নয়ন আর নগরায়নের নামে সেইসব আমরা নির্বিচারে ভরাট করেছি। পাহাড় থেকে নেমে আসা নুড়ি পাথর এবং মাটি, সেই সাথে আপনার আমার ব্যবহারপূর্ব জিনিস যত্রতত্র ফেলে যাওয়ায় নদী তার নাব্যতা হারিয়ে ফেলেছে। তাই নদীগুলোর এখন আর আগের মতে পানি ধরে রাখতে পারে না। সাধারনের চেয়ে একটু বেশি বৃষ্টি হলেই উপকূল প্লাবিত করে। সিলেট-সুনামগঞ্জের বন্যার জন্য মোটাদাগে দায় এই নদীর নাব্যতা হ্রাস। 

সিলেট-সুনামগঞ্জের বন্যা কেবল স্মরণকালের বন্যার রেকর্ডই ভাঙেনি। গুজবের রেকর্ডও ভেঙেছে। গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব দেখতে দেখতে রীতিমতো অসহায়বোধ করেছি। তাবদ দুনিয়ার বানভাসি মানুষের ছবি চালিয়ে দেয়া হয়েছে সিলেটের বন্যার ছবি বলে। নায়াগ্রা জলপ্রপাত থেকে শুরু করে পৃথিবীর নানানপ্রান্তে নানান সময় খুলে দেয়া বাঁধের তীব্র পানির স্রোতের ভিডিও আপলোড করে বলা হচ্ছে ফারাক্কা, তিস্তা ব্যারেজ, টিপাইমুখের ভিডিও। আমজনতার কথা কী বলবো! দেশের একটি বৃহত্তর রাজনীতিক দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা পর্যন্ত বলেছে, ভারত ফারাক্কার সবগুলো বাঁধ খুলে দেয়াই এই বন্যার একমাত্র কারণ। আমি শুধু ভাবছি, তিনবার রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকা একটা দলের এতবড় একজন নেতা জানে না কোথায় ফারাক্কা! কোথায় তার দেশের সিলেট-সুনামগঞ্জ! এমনি এমনি এই দলটা উচ্ছন্নে যায়নি।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়