শিরোনাম

প্রকাশিত : ২৩ জুন, ২০২২, ০১:০৯ রাত
আপডেট : ২৩ জুন, ২০২২, ০১:০৯ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

আনন্দ এবং বেদনার মোহনায় বাংলাদেশ

মিরাজুল ইসলাম

মিরাজুল ইসলাম: বাংলাদেশে এখন মুদ্রার দুই পিঠের চিত্র। আনন্দ এবং বেদনার মিশ্র অনুভূতিতে পুরো দেশ ভাসছে। একদিকে প্রতিক্ষীত পদ্মা সেতু উদ্বোধনে উত্তেজনা এবং আনন্দে আছেন দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনগন। একই সময়ে বৃহত্তর সিলেটজুড়ে চলছে ভয়াবহ বন্যার তাণ্ডব। পদ্মা সেতু সূত্রে নিজস্ব সক্ষমতা প্রমাণের পাশাপাশি প্রকৃতির কাছে অসহায়ত্বে বন্যা নিয়ন্ত্রণে আমাদের পরিকল্পনা গ্রহণের অদূরদর্শিতার বিষয়টিও আমরা প্রত্যক্ষ করলাম। আসাম এলাকায় অতিবৃষ্টির কারণে পাহাড়ী ঢলে সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি সর্বোচ্চ বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। যার কারণে পুরো সিলেট-সুনামগঞ্জ পানির নীচে। অন্য দিকে তিস্তা নদীতে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় উত্তরবঙ্গেও বন্যার পূর্বাভাস। অতি বর্ষণে দেশের প্রধান নদীগুলোতে প্রবাহ ক্রমশ বৃদ্ধি পেলে যমুনা, পদ্মা এবং মেঘনা নদীর অববাহিকায় বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ব্যাপার। 

এই তথ্যগুলো আতঙ্কের কারণ হতো না, যদি নদী ড্রেজিংসহ আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী বন্যা মোকাবেলায় আমরা সচেষ্ট হতাম। কিন্তু প্রকৃতির কাছে অসহায় আত্মসমর্পণের সনাতন অজুহাত দেওয়া ছাড়া দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনাগুলো কেন সফল হচ্ছে না তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট জবাবদিহিতা নেই। বছরের পর বছর আমরা দেখে আসছি বন্যা দুর্গত এলাকায় রুটিনমাফিক ত্রাণ সরবরাহ করা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিযোগিতামূলক পরিদর্শন এবং সরকারি পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার সচিত্র প্রতিবেদন। বন্যা হয়ে ওঠে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অংশ।

তারপরও কথা থেকে যায়। আমাদের প্রতিটি নদীর গতিপথ ভারতের ভূ-রাজনৈতিক কূটনীতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। বর্ষা মৌসুমে এই আন্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের কূটনৈতিক পরিস্থিতি পানি-বন্টন ইস্যুতে সবচেয়ে বেশি আঁচ করা যায়। বন্ধুত্বের সংজ্ঞাটি তখন পাল্টে যায়। বিশেষ করে ফারাক্কা বাঁধের ঊনিশটি গেট যখন একসঙ্গে খুলে দেওয়া হয় আমাদের পদ্মা হয়ে ওঠে আরও প্রমত্ত ও অশান্ত। আশঙ্কা হয় এই সপ্তাহে বৃষ্টির পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটলে তার প্রভাব পড়বে পুরো দেশজুড়ে। যাবতীয় আনন্দের উপলক্ষ্য চাপা পড়ে যেতে পারে। এমনতর বন্যা-মৌসুমে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষ্যে  দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে চলছে আনন্দ-উৎসব।
রাজনৈতিক মত-পার্থক্য থাকলেও জাতি হিসেবে অবশ্যই আমরা পদ্মা সেতু নিয়ে উৎসব আয়োজন করতে পারি। মূলত ফরিদপুর-শরিয়তপুর-মাদারীপুর-বরিশাল-পটুয়াখালী-খুলনা এলাকার কোটি মানুষের মনে পদ্মা সেতু ঘিরে বিপুল উদ্দীপনা। যমুনা নদীতে বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতু যেভাবে উত্তরবঙ্গের ভাগ্য বদলে দিয়েছে, ঠিক একই রকম আশা ও আনন্দ নিয়ে অপেক্ষায় আছেন পদ্মার অপর পারের মানুষগুলো। দেশের দুই অংশে এমন বিপরীত মানসিক পরিস্থিতি সম্ভবত এর আগে কখনো এভাবে দৃশ্যমান হয়নি। 

আগামী ২৫ জুন যখন পদ্মা সেতু উদ্বোধনে ওই অঞ্চলের কোটি মানুষ উল্লাস করবেন, ঠিক সেই মুহূর্তে উদ্বাস্তু হবেন সুনামগঞ্জ-সিলেট এলাকায় কয়েক লক্ষ মানুষ। শুধু তাই নয়, সিলেটের কুমারগাঁও গ্রিড উপকেন্দ্র থেকে সারা সিলেটে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। শেষ খবর অনুযায়ী উপকেন্দ্রের সুইচ ইয়ার্ডে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। সিলেটে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ হুমকির মুখে। অন্যদিক পদ্মা সেতুর ৪১৫টি ল্যাম্পপোস্টের আলোয় ঝলমল করবে রাতের প্রমত্ত নদী। ইচ্ছে না থাকলেও এই জাতীয় বৈপরীত্যের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বাস্তবতা হলো, সরকার পক্ষ পদ্মা সেতুর প্রকল্প সাফল্যে যতটা আন্তরিক, বন্যা ব্যবস্থাপনা ততটা গুরুত্ব পায়নি। একইভাবে পূর্ববর্তী সরকারগুলো বন্যা দুর্গত ত্রাণ ব্যবস্থাপনায় যতটা মনেযোগী ছিল, বন্যার প্রাকৃতিক নিয়ামকগুলো মোকাবিলায় কোনো নতুন চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়ন করেনি। 

বন্যা মোকাবেলায় সমন্বিত প্রচেষ্টাগুলো বিবিধ। তার মধ্য অন্যতম হলো নদী ড্রেজিং করে নাব্যতা রক্ষা এবং দখল-দূষণ থেকে নদীকে রক্ষা করা। সেই সাথে উজান থেকে নেমে আসা নদীগুলোর পানি বন্টনের কূটনৈতিক তৎপরতা তো আছেই। পদ্মা সেতুর মতো বড় আর্থিক অবকাঠামোগত প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকার যে উদ্যমে ঘরোয়া এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির চ্যালেঞ্জ গ্রহন করেছেন, বাংলাদেশের প্রাণধারা নদী রক্ষায় সেই পরিমাণ আবেগ এবং উদ্যোগ বাস্তবায়ন করলে হয়তো বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব হতো। একটি উদহারণ আপাতত যথেষ্ট।

২০১৯ সালে দেশের ১০ হাজার কিলোমিটার নৌপথের নাব্য বাড়ানোর খসড়া মহাপরিকল্পনা তৈরি করেছিলো বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। তাদের আওতায় ১৭৮টি নদী খননের সুপারিশ করার পাশাপাশি ২০২৫ সালের মধ্যে এই কর্মযজ্ঞ শেষ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। পুরো প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছিলো পঞ্চাশ হাজার কোটি টাকা। লক্ষণীয় বিষয়, খসড়া পরিকল্পনায় প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিলো সিলেটের হাওর, পার্বত্য ও দক্ষিণাঞ্চলের ৮০টি নদ-নদী। এই পরিকল্পনার আওতায় ঢাকার চারপাশের নদী বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদী দখল ও দূষণমুক্ত করে চলাচলের উপযোগী করার কাজ শুরু হলেও প্রকল্পটি যথেষ্ট ধীর গতিতে চলছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে ছয় হাজার কিলোমিটার নৌপথ শুষ্ক মৌসুমে তকমে দাঁড়ায় চার হাজার থেকে সাড়ে চার হাজার কিলোমিটারে। মাত্র ৩৫টি ড্রেজার দিয়ে নদীগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তারপরও গত ১০ বছরে দেড় হাজার কিলোমিটার নৌপথের নাব্য ফিরিয়ে আনা হয়েছে। কিন্তু আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার কিলোমিটার নৌপথ খনন করার মতো সক্ষমতা এখনো অর্জন করা সম্ভব হয়নি বাজেট অনুযায়ী ড্রেজার এবং জনবলের অপ্রতুলতার কারণে।

আমাদের দেশের নদী বিশেষজ্ঞগণ এবং বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করা সরকারি পর্যায়ের আমলারা জানেন সিলেট-সুনামগঞ্জ এলাকায় ভারী বর্ষণে কতোটুকু ক্ষয় ক্ষতি হয়ে থাকে। প্রতি বছর এপ্রিলের শুরুতে পাহাড়ী ঢল নেমে আসে উজান থেকে। এতে হাওরাঞ্চলে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়। আবার মে মাসে ঢলের পানিতে সিলেট-সুনামগঞ্জে কমবেশি বন্যা হয়। তখন বোরো ধানসহ অন্যান্য ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। সময়ের কাজ সময়ে না করলে আগামীতে এমন বন্যা পরিস্থিতি আরো ভয়াবব হবে না তা কেউ আগাম বলতে পারে না। 

পদ্মা সেতু যেমন আমাদের অর্জন, তেমন সিলেটের বন্যা পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারাটাও একধরনের ব্যর্থতা। আগাম বন্যা মোকাবোলায় কার্যকর ব্যবস্থা নিলে এমন ‘হরিষে বিষাদ’ পরিস্থিতি হয়তো দেখতে হতো না। পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী ডামাডোলে আমরা যেন বন্যার্ত দুঃখী মানুষগুলোর কথা ভুলে না যাই। পদ্মা সেতু ঘিরে রাজনৈতিক মত-বিরোধ থাকলেও বন্যা দুর্গত এলাকার মানুষগুলোর দুঃখ লাঘবের পাশাপাশি আগামীতে এমন পরিস্থিতি যেন সৃষ্টি না হয় তার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন সময়ের দাবি। 
লেখক: তথ্যচিত্র নির্মাতা, লেখক ও চিকিৎসক

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়