শিরোনাম

প্রকাশিত : ২৭ মে, ২০২২, ০২:৩৪ রাত
আপডেট : ২৭ মে, ২০২২, ০২:৩৪ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

কবিতার ভেতরে কবির মনস্তত্ত্ব

আহসান হাবিব

আহসান হাবিব: কবিতা যদি হয় আড়ালের শিল্প, তবে কবিরা সবচেয়ে জীবন থেকে পলাতক এক প্রাণী। তারা কবিতার বৈশিষ্ট্যের দোহাই দিয়ে আড়াল নেয় এবং বক্তব্যকে দুর্বোধ্য করে তোলে। যত দুর্বোধ্যতা, কে না জানে, তত অপাঠ্যতা, তত রাষ্ট্র কর্তৃক উপেক্ষা করা। জীবনানন্দ দাশকে কী এস্কেপিস্ট বলা যায়? যায়, কারণ তার কবিতা সময়ের বিচারে অনেক আড়াল দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল, যদিও তার কবিতায় সমাজ, ইতিহাস, দর্শন ইত্যাদিকে যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ঝরা পালকের প্রথম কবিতায় তিনি বলছেন: আমি কবি, সেই কবি আকাশে কাতর আঁখি তুলি হেরি ঝরা পালকের ছবি এই কবিতা যখন লেখা হয়, তখন পৃথিবীর রূপ ছিল ঝরা পালকের মত। কয়েক বছর আগে প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ শেষ হয়েছে, পৃথিবী মুমূর্ষু, তখন তিনি তার কবিতায় সেই সময়কে প্রতিকায়িত করলেন ঝরা পালকের সঙ্গে। কবিতা হিসেবে কেমন তা বিবেচনা না করেই বলা যায় জীবনানন্দ প্রখর সময় এবং সমাজ সচেতন ছিলেন। কিন্তু তিনি কখনো সমাজ পরিবর্তনে রাজপথে হাঁটেননি, ফলে তিনি তার এই অপারগতা যা দুর্বলতার পরিচায়ক সেই মানসিক গ্লানি থেকে নিজেকে মুক্ত করার জন্য কবিতায় আড়াল নেন এবং তার কাব্যচর্চা একই ধারায় বয়ে চলে।

তিনি রূপসী বাংলা লেখেন প্রবল দেশপ্রেম এবং জাতীয়তাবাদী বোধ থেকে যা তার গ্লানিবোধ থেকেই উৎসারিত। মনে রাখা দরকার আমি কিন্তু তার কাব্যালোচনা করছি না, করছি সামাজিক মানুষ হিসেবে তার মনস্তত্ত্ব নিয়ে যা কবিতায় ধৃত। ঠিক তার সমসাময়িক কবি নজরুল কিন্তু তার কবিতায় কোন আড়াল নেননি। তিনি তাঁর কথা সরাসরি বলেছেন এবং তার ব্যক্তিজীবনও তার কবিতার মতই সংগ্রামমুখর। তিনি বলছেন: বল বীর- চির উন্নত মম শির! শির নেহারি আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রীর! এই কবিতায় তিনি যা বলছেন, বাস্তবে তিনি তা করছেন। তিনি রাস্তায় নামছেন, ব্রিটিশ শাসকের বিরুদ্ধে তার দৈহিক উপস্থিতিসহ কবিতায় তার প্রকাশ ঘটিয়ে চলেছেন। তার প্রতিটি কবিতা এবং গান একই রেখায় থেকে ব্যক্তি এবং কবি সামাজিক সংগ্রামের প্রতীক হয়ে উঠছেন। তিনি জেলে যাচ্ছেন, কবিতার বই বাজেয়াপ্ত হচ্ছে পরপর কিন্তু কোনো নিপীড়নই তাকে তার ভূমিকা থেকে সরাতে পারছে না। তিনি পত্রিকা করছেন যা একই চরিত্রের- বৃটিশ এবং অত্যাচাচের বিরুদ্ধে সবখানে তিনি খড়গ নিয়ে উদ্যত। সেই সময়ের আর যারা কবি হিসেবে খ্যাতি পেয়েছেন তাদের প্রত্যেকের কবিতা এবং ব্যক্তিকে মিলিয়ে পড়লে এটা পরিষ্কার হয় যে কবিতায় যে যত আড়াল নিয়েছে, তিনি তত সামাজিক ঝড় থেকে নিজেকে লুকিয়ে রেখেছেন।

সুকান্ত, সুভাষের কবিতা এবং ব্যক্তিগত রাজনৈতিক জীবন আলোচনা করলেও এই সত্যটি ধরা পড়ে। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে যখন জাতি প্রাণপণে লড়াই করছে তখন কোনো কবি কোন কবিতা লিখছেন? কবিতার বিষয়বস্তু দেখলেই বোঝা যায় সামাজিক ভূমিকায় তাদের অবস্থান। স্বাধীনতাত্তোর সময়েও কবিদের কবিতা পড়লে এই সত্য পরিষ্কার বোঝা যায় যে কারা কবিতায় আড়াল নিচ্ছেন কারা আড়ালকে ঝেঁটিয়ে বিদেয় করছেন। আবুল হাসান আর নির্মলেন্দু গান আলাদা কবিতা লিখছেন, তাদের সামাজিক ভূমিকাও আলাদা। একজন লিখছেন ‘পৃথক পালঙ্ক’ আর একজন লিখছেন ‘তার আগে চাই সমাজতন্ত্র’। মান্নান সৈয়দ লিখছেন ‘জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ’, মহাদেব সাহা লিখছেন ‘ফুল কই অস্ত্রের উল্লাস’। পরবর্তীতে রুদ্র, মোহন রায়হানের কবিতা এবং তাদের ব্যক্তি ভূমিকা একই রেখায় প্রবাহিত হয়েছে। বর্তমান সময়ে আধুনিক কবিদের কবিতা পড়লে বোঝা যায় এরা কতটা দুর্বোধ্য হয়ে উঠেছে। এইসব কবিদের ব্যক্তিজীবন এবং রাজনৈতিক জীবন দেখলে বোঝা যায় এরা কতটা ভীরুতা দ্বারা আক্রান্ত। কোনো আধুনিক কবি যাদের কবিতায় আস্তরের পর আস্তর, তারা বাস্তব জীবন থেকে কতটা পলায়নপর। বাস্তব জীবন বলতে আমি প্রধানত বুঝাতে চাইছি তাদের রাজনৈতিক ভূমিকার কথা। তারা ভূমিকা নেবে কি নেবে না, আমার আলোচনা সেটা নিয়ে নয়, তাদের মনস্তত্ত্ব কিভাবে কবিতায় পড়ে, তা নিয়ে বলছি। কবিতা বিষয়ে এটা খুব প্রচলিত যে যে কবিতা যত আড়ালহীন, সেই কবিতা তত স্থুল।

এটা বুদ্ধদেব বসু থেকে শুরু হয়েছে। জীবনানন্দের কবিতা বিষয়ক প্রবন্ধ পড়লেও এটা টের পাওয়া যায়। অথচ রবীন্দ্রনাথ কিন্তু তার কবিতায় যতটুকু আড়াল নিয়েছেন তা তার সামাজিক ভূমিকার সঙ্গে সঙ্গতিশীল। তিনি একজন কবি হয়েও ভারতীয় রাজনীতিতে তার ভূমিকা ঐতিহাসিক। তার জীবন দেখলেই পরিষ্কার বোঝা যায়। তিনি একাই একটি প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছেন এবং তার বিভিন্ন মতামত জানাতে সামান্য দ্বিধা করছেন না। তিনি এক ব্যতিক্রমী মানুষ হিসেবে ইতিহাসে তার স্থান পাকাপোক্ত করছেন। যে কবি কখনো রাজপথে হাঁটেননি, তার কবিতায় আড়াল প্রধান বৈশিষ্ট্য, যে কবি রাজপথে হেটেছেন, মানুষের সংগ্রাম সরাসরি অংশগ্রহণ করেছেন, তাদের কবিতার বৈশিষ্ট্য একদম ভিন্ন। কবিতার বৈশিষ্ট্য থেকে কবির সামাজিক রাজনৈতিক ভূমিকা এবং তাদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে এই পর্যবেক্ষণ আমার একান্ত ব্যক্তিগত, তা কখনোই তাদের কবিতার মূল্যায়ন নিয়ে আলোচনা নয়। 
 লেখক: ঔপন্যাসিক

  • সর্বশেষ